আল্লাহ কেন জালিমের বিচার করছেনা?
Faith and Belief · Hanafi
Question
আমার অতীত গুনাহ ছিল । আমার ঐ মানুষটার সাথে যোগাযোগ ছিল। হারাম সম্পর্ক ছিল না।ঐ মানুষটা আমার টাকা নাই দেখে খুব কষ্ট দিয়ে কথা বলেছিল আপনি অনেক টাকা খরচ করেন তাই আল্লাহ আপনাকে টাকা দেয় না আরো অনেক কথা দ্বারা কষ্ট দিয়েছিল । আমি দেখি ঐ মানুষটার কোন বিচার হচ্ছে না উল্টো ওনার অনেক মেয়েদের সাথে যোগাযোগ উল্টো অনেক টাকা অনেক সম্পদ । আমার প্রশ্ন হচ্ছে আমি কাউকে কষ্ট দিলে আল্লাহ বিচার করে দেয় কিন্তু ঐ মানুষটা এতো আঘাত দিয়েছে ওনার কোন বিচার হচ্ছে না উল্টো সব উন্নতি হচ্ছে ওনার এটার কারণে আমি নিজেই ঈমান হারা হয়ে যাচ্ছি। আল্লাহর উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি। আমার মনে হয় যে আল্লাহ খালি আমাকে কষ্টে রাখছেন আমি কোন নন মাহরাম পুরুষ সাথে কথা বলি না। ইলম অর্জন করতেছি ।সব আল্লাহর জন্য করতেছি তবু আল্লাহ আমাকে কষ্টে রাখছেন। আমি ওনার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করেছি অনেক আগেই । কিন্তু আল্লাহ উনার বিচার করতেছে না । আল্লাহ খালি আমাকে কষ্টে রাখতেছেন । আমি এত কষ্টে আছি এটা দেখে উনি বলছিল আমার নামে বিচার চাইছেন। আল্লাহ আপনাকে উল্টো বিচার ফিরিয়ে দিয়েছেন। অসুস্থ হচ্ছেন টাকার সমস্যা । আমার তো আরো উন্নতি হচ্ছে।
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আপনি যে মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা বোঝা যায়। তবে আপনার কিছু ধারণা সংশোধন করা জরুরি, কারণ এগুলো ঈমানের সাথে সম্পর্কিত।
১. আল্লাহর বিচার কখনো বন্ধ হয় না — শুধু সময় ভিন্ন
আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَلَا تَحْسَبَنَّ اللّٰهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظّٰلِمُوْنَ ۚ اِنَّمَا یُؤَخِّرُهُمْ لِیَوْمٍ تَشْخَصُ فِیْهِ الْاَبْصَارُ
"আর আপনি কখনো আল্লাহকে গাফেল মনে করবেন না জালিমরা যা করে সে সম্পর্কে। তিনি তো তাদেরকে শুধু সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দিচ্ছেন, যেদিন চোখগুলো স্থির হয়ে যাবে।" — (সূরা ইবরাহিম: ৪২)
আল্লাহ জালিমকে সাথে সাথে শাস্তি দেন না — এটা তার ইস্তিদরাজ (ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া) হতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ لَيُمْلِي لِلظَّالِمِ حَتَّى إِذَا أَخَذَهُ لَمْ يُفْلِتْهُ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমকে অবকাশ দেন, অতঃপর যখন তাকে পাকড়াও করেন, তখন তাকে রেহাই দেন না।" — (সহীহ বুখারী: ৪৬৮৬, সহীহ মুসলিম: ২৫৮৩)
অতএব, তার উন্নতি দেখে মনে করবেন না আল্লাহ বিচার করছেন না। হয়তো আল্লাহ তাকে দুনিয়ার সাময়িক সুখ দিয়ে আখিরাতের জন্য জমা করছেন, অথবা তাওবার সুযোগ দিচ্ছেন। কিন্তু আখিরাতের বিচার অবশ্যই হবে — সেখানে কোনো পলায়ন নেই।
২. আপনার কষ্ট = আপনার জন্য কাফফারা ও মর্যাদা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
"মুসলিমকে যে কষ্ট, রোগ, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, যন্ত্রণা বা বিষণ্নতা স্পর্শ করে — এমনকি একটি কাঁটা বিঁধলেও — আল্লাহ তা দিয়ে তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।" — (সহীহ বুখারী: ৫৬৪১, সহীহ মুসলিম: ২৫৭৩)
আপনার অতীত গুনাহ ছিল — এই কষ্টগুলো আপনার গুনাহের কাফফারা হতে পারে। এটি আল্লাহর রহমত, শাস্তি নয়।
৩. আপনার ঈমান হারানোর চিন্তা — এটি শয়তানের ধোঁকা
আপনি লিখেছেন "ঈমান হারা হয়ে যাচ্ছি", "আল্লাহর উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি" — এটা শয়তানের সবচেয়ে বড় ফাঁদ। শয়তান চায় আপনি আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করুন, যাতে আপনার আমল নষ্ট হয়।
আল্লাহ বলেন:
اِنَّ الشَّیْطٰنَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوْهُ عَدُوًّا
"নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু, সুতরাং তোমরা তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করো।" — (সূরা ফাতির: ৬)
এখনই তাওবা করুন এই চিন্তা থেকে। আল্লাহর উপর সুধারণা রাখুন। তিনি বলেন:
اَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِیْ بِیْ
"আমি আমার বান্দার ধারণার নিকটেই আছি।" — (সহীহ বুখারী: ৭৪০৫)
৪. আপনার করণীয়
| বিষয় | করণীয় | |------|--------| | অতীত গুনাহ | তাওবা করুন, আল্লাহ ক্ষমাশীল | | ঐ ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ | সম্পূর্ণ বন্ধ রাখুন (আপনি ইতিমধ্যে করেছেন — ভালো করেছেন) | | তার কথা/কষ্ট | তার কথাকে গুরুত্ব দেবেন না, সে জালিম | | আল্লাহর উপর বিশ্বাস | দৃঢ় করুন, কুরআন পড়ুন, নামাজে মনোযোগ দিন | | মানসিক কষ্ট | ধৈর্য ধরুন, এটি আপনার মর্যাদা বাড়াচ্ছে | | ইলম অর্জন | চালিয়ে যান — এটি আল্লাহর পথে জিহাদ |
৫. বিশেষ সতর্কতা
ঐ ব্যক্তি যদি আপনার নামে মিথ্যা অভিযোগ করে বা হুমকি দেয়, তবে তার সাথে কোনো যোগাযোগ করবেন না। তার কথায় বিভ্রান্ত হবেন না। সে যা বলছে তা তার নিজের জবাবদিহির অংশ — আপনার নয়।
আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَهِنُوْا وَلَا تَحْزَنُوْا وَاَنْتُمُ الْاَعْلَوْنَ اِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِیْنَ
"তোমরা হীনবল হয়ো না, দুঃখও করো না; তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা মুমিন হও।" — (সূরা আলে ইমরান: ১৩৯)
উপসংহার
প্রিয় বোন, আপনার কষ্ট সত্য, কিন্তু আপনার সিদ্ধান্ত ভুল। আল্লাহ আপনাকে পরীক্ষা করছেন — এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হোন ধৈর্য ও ইস্তেগফার দিয়ে। ঐ ব্যক্তির হিসাব আল্লাহর কাছে — আপনি তার বিচার চাওয়ার দায়িত্বে নেই। আপনার দায়িত্ব নিজের ঈমান রক্ষা করা।
আল্লাহর কাছে দুআ করুন:
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوْبَنَا بَعْدَ اِذْ هَدَیْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَّدُنْكَ رَحْمَةً اِنَّكَ اَنْتَ الْوَهَّابُ
"হে আমাদের রব! আমাদের হৃদয়কে সরল পথ থেকে বিচ্যুত করবেন না, আপনি আমাদেরকে আপনার পক্ষ থেকে রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা।" — (সূরা আলে ইমরান: ৮)
والله أعلم بالصواب