ব্যবসায়িক লেনদেন

Business and Job · Hanafi

Question No: 5372
Questioner: JJ
Question Asked: 12 Sep 2026, 10:22 PM
Reviewed & Published: 13 Sep 2026, 03:14 AM
Views: 12
Tokens: 7,698
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমি আমার বাবার রেখে যাওয়া একটি ব্যবসা পরিচালনা করি। তিনি যখন মারা জান তখন এক প্রতিষ্ঠানে মোটামুটি অনেক টাকা ঋণ রেখে যান মাল কিনা বাবদ, অর্থাৎ মাল কেনা হয়েছিল তবে পরিশোধের আগেই মারা যান এবং কিছু বাকি তে নেওয়া ছিল। তারপরও ও তারা আমাদের কে আবার শুরু করার জন্য মাল দেন, এবং সেই থেকে এই পর্যন্ত সেই প্রতিষ্ঠান থেকেই আমরা কাঁচামাল নেই, প্রতিবার কিছু টাকা করে বেশি দেই মালের দাম এর থেকে, এভাবে প্রায় অর্ধেক দেনা শোধ হয়েছে। অর্থাৎ, তাদের থেকে আমি মাল নেই, সেই মাল থেকে ব্যবসা করে টাকা দেই, এরপর তারা আবার মাল দেন।
তবে এর মাঝে অন্যান্য কোনো প্রতিষ্ঠানে আমাদের ব্যবসা করা হয়নি একপ্রকার দায় বদ্ধতা থেকেই তাদের প্রতি। এর ফল স্বরুপ তাদের কাছেই মালের জন্য জিম্মি, বা অন্য কোথাও থেকে নিলে তারা নালিশ করে যেহেতু তারা এখনো টাকা পায় এবং তাদের থেকে নিলে ব্যবসা ও হয় তাদের। তবে এর কারণে প্রায় ই বেশি দামে তাদের থেকে মাল কিনতে হয় আমার, অন্যান্য যায়গায় কমে পেলেও নেওয়া হচ্ছে না।
এখানে আমার আসলে করনীয় কি? আমি কি ঠিক করছি? নাকি আমি মানুষের ভয়ে চলছি। আল্লাহ্ তা'আলার হুকুম এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সুন্নাহ মোতাবেক আমার আসলে করনীয় কি?
(উল্লেখ্য যে একবারে তাদের টাকা শোধ করে দিয়ে বের হয়ে যাওয়া আপাদত সম্ভব হচ্ছে না।)

Answer

ব্যবসায়িক লেনদেন ও ঋণ পরিশোধ: ইসলামী দৃষ্টিকোণ

উত্তর (সংক্ষেপে): আপনার বাবার রেখে যাওয়া ঋণ মৃতের সম্পত্তি (তরকা) থেকে পরিশোধ করা আবশ্যক — এটি ওয়াজিব, কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়। ঋণ পরিশোধের আগে ওয়ারিশদের জন্য তরকা ভোগ করা জায়েয নয়। তবে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান যদি স্বেচ্ছায় আপনাকে মাল দিয়ে ব্যবসা চালু করতে সহযোগিতা করে এবং আপনি বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে মাল কিনে সেই বাড়তি টাকাকে ঋণ পরিশোধ হিসেবে গণ্য করেন — তবে তা নিছক ব্যবসায়িক লেনদেন নয়, বরং এটি একটি কবলাহ (চুক্তি) যা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। আর শুধু "মানুষের ভয়" বা "নালিশের ভয়" দ্বারা চালিত হয়ে অন্যত্র কম দামে মাল পাওয়া সত্ত্বেও না কেনা — এটি ইসলামী দৃষ্টিতে কঠোরভাবে নিন্দনীয় নয়, তবে অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি স্বীকার করা এবং নিজেকে জিম্মি বানানো শরীয়তের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।


১. মৃতের ঋণ: প্রথমেই যা জানা আবশ্যক

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«نَفْسُ الْمُؤْمِنِ مُعَلَّقَةٌ بِدَيْنِهِ حَتَّى يُقْضَى عَنْهُ» "মুমিনের রূহ তার ঋণের সাথে ঝুলন্ত থাকে যতক্ষণ তা পরিশোধ না করা হয়।" — (সুনানে তিরমিযী: ১০৭৮, সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৪১৩; হাসান)

আল্লাহ তা'আলা বলেন:

«مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ» "ওসিয়ত পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পর..." — (সূরা নিসা: ১১)

ফিকহী বিধান (হানাফী): মৃত ব্যক্তির ঋণ তরকার উপর অগ্রাধিকার পায় — এমনকি ওসিয়ত ও মীরাসের আগেও। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, ঋণ পরিশোধ না করে তরকা বণ্টন করা জায়েয নয়। [রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল ফারায়েদ; আল-হিদায়া, কিতাবুল ওসায়া]

সুতরাং আপনার বাবার ঋণ আপনার ও আপনার পরিবারের দায় — এটি এগিয়ে দেওয়া বা ফাঁকি দেওয়া কোনোভাবেই জায়েয নয়। আলহামদুলিল্লাহ, আপনি তা পরিশোধ করছেন — এটিই সঠিক পথ।


২. "বেশি দামে মাল কেনা" — এটা কী ঋণ পরিশোধ, নাকি সুদ?

এখানে সূক্ষ্ম একটি বিষয় আছে। যদি প্রতিষ্ঠান আপনাকে বাজারমূল্যে মাল দিয়ে তার উপর অতিরিক্ত টাকা নেয় শুধু ঋণ পরিশোধের শর্তে — তবে তা সুদ (রিবা) হবে, যা হারাম। কারণ হাদীসে এসেছে:

«كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا» "প্রত্যেক এমন ঋণ যা উপকার টেনে আনে, তা সুদ।" — (সুনানে বাইহাকী, কিতাবুর রিবা; ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী হাসান বলেছেন)

তবে আপনার বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে — আপনি মাল কিনছেন এবং তার দাম দিচ্ছেন, শুধু দামটা বাজারের চেয়ে বেশি। যদি মালটি সত্যিই সেই দামে বিক্রি হয় (অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান মালের দাম বেশি ধরছে), তবে তা বৈধ ব্যবসায়িক লেনদেন — এতে সুদ নেই। কিন্তু যদি মালের প্রকৃত দাম বাজারের সমান হয়, অথচ শুধু ঋণ পরিশোধের জন্য বাড়তি টাকা নেওয়া হয় — তবে সেই বাড়তি অংশ সুদ

সমাধান:

  • প্রতিষ্ঠানের সাথে স্পষ্ট চুক্তি করুন — কত টাকা ঋণ বাকি, কত টাকা প্রতি লেনদেনে পরিশোধ হচ্ছে, এবং মালের দাম বাজারমূল্যে না বেশি।
  • যদি তারা বাজারের চেয়ে বেশি দামে মাল দেয়, তবে সেই বাড়তি দামটাই ঋণ পরিশোধ হিসেবে লিখিতভাবে গণ্য করুন — এতে সুদের সন্দেহ দূর হবে।
  • অথবা আলাদা করে ঋণ পরিশোধ করুন এবং মাল বাজারমূল্যে কিনুন।

[ফাতাওয়া উসমানী, কিতাবুর রিবা; ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩; ফাতাওয়া আলমগীরী, কিতাবুল বাই]


৩. "মানুষের ভয়ে" অন্যত্র না কেনা — এটা কি ঠিক?

ইসলামী দৃষ্টিতে ব্যবসায়িক স্বাধীনতা আপনার অধিকার। কেউ আপনাকে জোর করতে পারে না যে আপনি শুধু তার কাছ থেকেই মাল কিনবেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

«وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا» "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" — (সূরা বাকারা: ২৭৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ» "মুসলিমরা তাদের শর্তের উপর প্রতিষ্ঠিত।" — (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৯৪; সহীহ)

কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক: যদি আপনি ঋণ পরিশোধের শর্ত হিসেবে তাদের কাছ থেকে মাল কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন, তবে তা শর্তপালন করা ওয়াজিব। আর যদি এমন শর্ত না থাকে, শুধু নৈতিক দায়বদ্ধতা বা ভয় থেকে তাদের কাছ থেকে কিনছেন — তবে:

  • অন্যত্র কম দামে মাল পাওয়া সত্ত্বেও না কেনা — এটি আপনার ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর, পরিবারের জন্য ক্ষতিকর। ইসলাম অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি স্বীকার করতে বলে না।
  • তবে ঋণ পরিশোধের নিয়তে যদি আপনি তাদের কাছ থেকে কিনে থাকেন এবং তাতে ঋণ কমছে — তবে তা সঠিক পথ
  • কিন্তু যদি শুধু নালিশের ভয় বা সামাজিক চাপ — তবে এটি ভয়-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত, যা শরীয়ত সমর্থন করে না।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "ব্যবসায়িক লেনদেনে স্বাধীনতা রয়েছে; কেউ কারো উপর জবরদস্তি করতে পারে না।" [রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল বাই]


৪. আপনার করণীয় — ধাপে ধাপে

ক. ঋণ পরিশোধের স্পষ্ট হিসাব রাখুন

  • বাবার ঋণের সঠিক পরিমাণ লিখিতভাবে নির্ধারণ করুন।
  • প্রতি লেনদেনে কত টাকা ঋণ কমছে — আলাদা খাতায় লিখুন।
  • মালের দাম বাজারমূল্যে কিনছেন কি না — যাচাই করুন।

খ. সুদের সন্দেহ দূর করুন

  • যদি বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দাম নেয়, তবে বাড়তি অংশ ঋণ পরিশোধ হিসেবে গণ্য করার চুক্তি করুন।
  • অথবা আলাদা ঋণ পরিশোধ করুন, মাল বাজারমূল্যে কিনুন।

গ. ব্যবসায়িক স্বাধীনতা ব্যবহার করুন

  • অন্যত্র কম দামে মাল পেলে সেখান থেকেও কিনতে পারেন — এটি শরীয়তসম্মত।
  • তবে ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি থাকলে তা পালন করুন।
  • নালিশের ভয় বা সামাজিক চাপ — এগুলো শরীয়তের মানদণ্ড নয়।

ঘ. ঋণ পরিশোধে অগ্রাধিকার দিন

  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "ঋণ পরিশোধে অগ্রগামী হওয়া মুমিনের কর্তব্য।"
  • একবারে সম্ভব না হলে কিস্তিতে পরিশোধ করুন — ইসলাম তা অনুমোদন করে।
  • আল্লাহ তা'আলা বলেন: «وَإِنْ كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَى مَيْسَرَةٍ» — "যদি অভাবী হয়, তবে সচ্ছলতা পর্যন্ত অপেক্ষা কর।" (সূরা বাকারা: ২৮০)

ঙ. দোয়া ও তাওয়াক্কুল

  • আল্লাহর উপর ভরসা করুন, মানুষের ভয় নয়।
  • রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «لَوْ تَوَكَّلْتُمْ عَلَى اللَّهِ حَقَّ تَوَكُّلِهِ لَرَزَقَكُمْ» — "যদি তোমরা আল্লাহর উপর যথাযথ ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের রিযিক দিতেন।" (সুনানে তিরমিযী: ২৩৪৪)

৫. সারসংক্ষেপ

| বিষয় | হুকুম | |---|---| | বাবার ঋণ পরিশোধ | ওয়াজিব — তরকা থেকে অগ্রাধিকার | | বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে মাল কেনা | যদি বাড়তি অংশ ঋণ হিসেবে গণ্য হয় — জায়েয; নাহলে সুদের সন্দেহ | | অন্যত্র কম দামে মাল না কেনা | শুধু ভয় হলে — অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি, শরীয়ত সমর্থন করে না | | ঋণ পরিশোধের শর্তে মাল কেনা | শর্ত পালন ওয়াজিব | | একবারে পরিশোধ অসম্ভব | কিস্তিতে পরিশোধ করুন — জায়েয |

মূল কথা: আপনি সঠিক পথেই আছেন যদি ঋণ পরিশোধের নিয়ত থাকে এবং সুদের সন্দেহ দূর হয়। তবে মানুষের ভয়ে নিজের ব্যবসার ক্ষতি করা এবং অন্যত্র কম দামে মাল পাওয়া সত্ত্বেও না কেনা — এটি শরীয়তের উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহর উপর ভরসা করুন, ঋণ পরিশোধে অগ্রাধিকার দিন, এবং সুদের সন্দেহ দূর করুন। আল্লাহ তা'আলা আপনার ব্যবসায় বরকত দান করুন। আমীন।


রেফারেন্স:

  • সূরা নিসা: ১১; সূরা বাকারা: ২৭৫, ২৮০
  • সুনানে তিরমিযী: ১০৭৮, ২৩৪৪
  • সুনানে ইবনে মাজাহ: ২৪১৩
  • সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৯৪
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) — কিতাবুল বাই, কিতাবুল ফারায়েদ
  • আল-হিদায়া — কিতাবুল ওসায়া
  • ফাতাওয়া উসমানী — কিতাবুর রিবা
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া — খণ্ড ৩
  • ফাতাওয়া আলমগীরী — কিতাবুল বাই
  • মা'আরিফুল কুরআন — সূরা বাকারা: ২৭৫-২৮০

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.