কোর্ট ম্যারেজ বা লুকিয়ে বিয়ে ইসলামী শরীয়তে সহিহ হয় কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
মেয়ের বাড়িতে গিয়ে সাইন আনা হয় লুকিয়ে কোর্ট ম্যারেজ এর কাগজে কিন্তু সেখানে লেখা ছিলো ইজাব এর সকল কিছুই ওমুকের ছেলের সাথে ওমুকের মেয়ের প্রস্তাব লিখিত ছিলো কাগজে এবং মেয়ে সাইন করেছে আলাদা করে ছেলে সাইন করেছে আলাদা করে কাজী সাক্ষী কেউ উপস্থিত ছিলো না তারা তাদের মতো সাইন করে কাজীকে দিয়েছে কাজী আলাদা করে সাক্ষী দেরকে সাইন করিয়ে রেজিস্ট্রার করে ফেলছে এটা কি সহিহ হয়েছে বিয়ে?কাগযে সব উল্লেখ্য ছিলো মোহরানা সব কিন্তু সামনা সামনি কাজী সাক্ষী উপস্থিত পাত্র পাত্রী উপস্থিত হয়ে সাইন করেনি আলাদা করে লুকিয়ে বিয়ে কেউ জানেও না ছেলে মেয়ে ভালোবাসে তো তাই মেয়ের কাছ থেকে লুকিয়ে সাইন আনা হয়েছে ছেলের মাধ্যমে পরে কাজীর কাছে জমা দেওয়া হয়েছে
Answer
কোর্ট ম্যারেজ বা লুকিয়ে বিয়ে: শরীয়তের দৃষ্টিতে বিধান
উত্তর (সংক্ষেপে): প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে বিয়ে শরীয়তের দৃষ্টিতে সহিহ হয়নি। কারণ ইসলামী বিবাহের জন্য অপরিহার্য শর্ত হলো—ইজাব-কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) একই মজলিসে, কমপক্ষে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ সাক্ষীর উপস্থিতিতে, পাত্র-পাত্রী বা তাদের উভয় পক্ষের সম্মতিতে সম্পন্ন হওয়া। এখানে সাক্ষী, কাজী, এমনকি পাত্র-পাত্রী কেউই একই মজলিসে উপস্থিত ছিলেন না; বরং লুকিয়ে আলাদা আলাদা সাইন করানো হয়েছে। এটি শরীয়তসম্মত বিবাহ নয়।
বিস্তারিত আলোচনা
১. ইসলামী বিবাহের মূল শর্তসমূহ
কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে:
فَانكِحُوهُنَّ بِإِذْنِ أَهْلِهِنَّ
"তোমরা তাদের (নারীদের) বিবাহ করো তাদের অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে।"
— (সূরা আন-নিসা: ২৫)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
وَأَشْهِدُوا ذَوَيْ عَدْلٍ مِّنكُمْ
"তোমাদের মধ্যে দুজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখো।"
— (সূরা আত-তালাক: ২)
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَيْ عَدْلٍ
"অভিভাবক ও দুজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।"
— (সুনানে বায়হাকি, হাদিস: ১৩৭২৫; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১১০১ — হাসান)
অন্য হাদিসে আছে:
أَيُّمَا امْرَأَةٍ نَكَحَتْ بِغَيْرِ إِذْنِ وَلِيِّهَا فَنِكَاحُهَا بَاطِلٌ
"যে নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করে, তার বিবাহ বাতিল।"
— (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২০৮৩; সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১১০২)
২. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
হানাফি মাজহাবে বিবাহ সহিহ হওয়ার জন্য শর্ত:
- ইজাব ও কবুল — একই মজলিসে প্রস্তাব ও গ্রহণ।
- দুজন প্রাপ্তবয়স্ক, বুদ্ধিমান মুসলিম সাক্ষী উপস্থিত থাকা।
- পাত্র-পাত্রীর সম্মতি (বালেগা নারীর ক্ষেত্রে তার সম্মতি জরুরি)।
- অভিভাবকের অনুমতি — হানাফি মাজহাবে বালেগা নারীর নিজে বিবাহ করার অধিকার আছে, তবে অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ করা মাকরুহে তাহরিমি এবং ফাসেক; আর যদি কুফু (সমতা) না থাকে তবে বাতিল।
আল-হিদায়া গ্রন্থে আছে:
"النكاح ينعقد بالإيجاب والقبول في مجلس واحد بحضور شاهدين"
"বিবাহ ইজাব ও কবুল দ্বারা একই মজলিসে দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়।"
— (আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ)
রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন শামি) এ উল্লেখ আছে:
"يشترط لصحة النكاح حضور شاهدين حرين مكلفين مسلمين سماعين للكلام"
"বিবাহ সহিহ হওয়ার জন্য দুজন স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক, মুসলিম, কথোপকথন শ্রবণকারী সাক্ষীর উপস্থিতি শর্ত।"
— (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃ. ৯)
৩. প্রশ্নের ঘটনার বিশ্লেষণ
প্রশ্নে যা বর্ণিত হয়েছে:
- মেয়ের বাড়িতে গিয়ে লুকিয়ে সাইন আনা হয়েছে।
- কাগজে ইজাব-কবুল, মোহরানা সব লেখা ছিল।
- মেয়ে আলাদা সাইন করেছে, ছেলে আলাদা সাইন করেছে — একই মজলিসে নয়।
- কাজী, সাক্ষী কেউ উপস্থিত ছিল না সাইন করার সময়।
- পরে কাজী আলাদা করে সাক্ষীদের সাইন করিয়ে রেজিস্ট্রার করেছে।
- কেউ জানে না — অর্থাৎ প্রকাশ্যতা (ইশহার) নেই।
এই অবস্থায়:
| শর্ত | অবস্থা | |------|--------| | একই মজলিসে ইজাব-কবুল | ❌ নেই | | দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইজাব-কবুল | ❌ নেই | | পাত্র-পাত্রীর সরাসরি সম্মতি (একই মজলিসে) | ❌ নেই | | অভিভাবকের অনুমতি | ❌ নেই (লুকিয়ে করা হয়েছে) | | প্রকাশ্যতা | ❌ নেই |
সুতরাং এই বিবাহ শরীয়তসম্মত নয়। এটি কেবল কাগজে-কলমে একটি চুক্তি, যা ইসলামী বিবাহের শর্ত পূরণ করে না।
৪. ফতোয়ার সিদ্ধান্ত
ফতোয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফতোয়া-তে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
"বিবাহ সহিহ হওয়ার জন্য ইজাব-কবুল একই মজলিসে দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে হওয়া আবশ্যক। সাক্ষী উপস্থিত না থাকলে বা পরে সাইন করালে বিবাহ সহিহ হয় না।"
— (ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ২, পৃ. ১৬৫; ফতোয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃ. ২৯৭)
ফতোয়া আলমগিরি-তে আছে:
"ولو عقد بغير شهود لم ينعقد"
"যদি সাক্ষী ছাড়া বিবাহ সম্পন্ন হয়, তবে তা সম্পন্ন হয় না।"
— (ফতোয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ২৭৬)
৫. করণীয়
- এই বিবাহকে সহিহ বিবাহ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। উভয়কে আলাদা থাকতে হবে।
- সহিহ পদ্ধতিতে নতুন করে বিবাহ করতে হবে — অভিভাবকের অনুমতিতে, দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে, একই মজলিসে ইজাব-কবুলের মাধ্যমে।
- কোর্ট ম্যারেজ বা রেজিস্ট্রেশন ইসলামী বিবাহের বিকল্প নয় — এটি কেবল পার্থিব আইনি প্রক্রিয়া। শরীয়তের শর্ত পূরণ না হলে কোর্ট ম্যারেজ দ্বারা ইসলামী বিবাহ সহিহ হয় না।
- অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া লুকিয়ে বিবাহ করা — হানাফি মাজহাবে মাকরুহে তাহরিমি ও গুনাহের কাজ। তওবা করতে হবে।
- যদি উভয় পক্ষ রাজি থাকে, তবে অভিভাবকদের সম্মতিতে শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে বিবাহ সম্পন্ন করতে হবে।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|--------| | লুকিয়ে আলাদা সাইন দ্বারা বিবাহ | সহিহ নয় | | সাক্ষী উপস্থিত না থাকা | বিবাহ বাতিল | | একই মজলিসে ইজাব-কবুল না হওয়া | বিবাহ বাতিল | | অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিবাহ | মাকরুহে তাহরিমি, গুনাহ | | করণীয় | নতুন করে শরীয়তসম্মত বিবাহ |
উপসংহার: প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে বিয়ে শরীয়তসম্মত হয়নি। উভয়কে তওবা করে অভিভাবকদের সম্মতিতে শরীয়তসম্মত পদ্ধতিতে নতুন করে বিবাহ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল পথে জীবনযাপনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب