অভিভাবক ছাড়া ছেলের বিয়ে শুদ্ধ হওয়া প্রসঙ্গে

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5325
Questioner: Md. Ifat Khan
Question Asked: 11 Sep 2026, 08:56 PM
Reviewed & Published: 11 Sep 2026, 09:15 PM
Views: 52
Tokens: 4,783
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।আমি একজন প্রাপ্তবয়স্ক ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলে।আমার ইনকাম বলতে শুধু টিউশনি আছে। আমি এক মেয়েকে খুবই পছন্দ করি, সেও আমাকে অনেক পছন্দ করে। তার বাসায় আমার কথা বলাতে তার পরিবার রাজি হলেও আমার পরিবার রাজি হচ্ছে না, আগে চাকরি করে তারপর বিয়ে করতে বলছে।কিন্তু আমরা হালাল ভাবে জীবন যাপন করতে চাই তাই আমি চাচ্ছিলাম আমার পরিবারকে না জানিয়ে বিয়ে করব এবং প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সবাইকে জানাবো। আমার কি বাবা-মাকে না জানিয়ে বিয়ে করলে গুনাহ হবে? জানাবেন ইনশা আল্লাহ্ ।

Answer

উত্তর (ফতোয়া)

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের সারমর্ম: এক প্রাপ্তবয়স্ক ছাত্র টিউশনির আয়ে চলেন। তিনি এক মেয়েকে পছন্দ করেন, মেয়ের পরিবার রাজি, কিন্তু নিজের পরিবার চাকরির আগে বিয়েতে রাজি নয়। তিনি পরিবারকে না জানিয়ে বিয়ে করতে চান—এতে গুনাহ হবে কি?

সংক্ষিপ্ত উত্তর: পিতা-মাতাকে না জানিয়ে বা তাদের সন্তুষ্টি ছাড়া বিয়ে করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ (নিকাহ সহিহ হবে), তবে পিতা-মাতার অবাধ্যতা ও তাদের অসন্তুষ্টি অর্জন করা গুনাহের কাজ। বিশেষত যখন পিতা-মাতা শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া বাধা দিচ্ছেন না, বরং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা ভেবে বলছেন—এমতাবস্থায় তাদের সাথে পরামর্শ ও সম্মতি নিয়ে বিয়ে করাই কর্তব্য। গোপন বিয়ে করে পরে জানানো ইসলামী আদব ও পিতৃ-মাতৃ হকের পরিপন্থী।


বিস্তারিত:

১. পিতা-মাতার হক ও তাদের সন্তুষ্টির গুরুত্ব

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا "আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" (সূরা নিসা: ৩৬)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ، وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ "প্রভুর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে, আর প্রভুর অসন্তুষ্টি পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে।" (তিরমিজি: ১৮৯৯)

অন্য হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি জিহাদে যেতে চাইলে নবী ﷺ বললেন: "তোমার পিতা-মাতা জীবিত আছেন?" সে বলল: হ্যাঁ। তিনি বললেন:

فَفِيهِمَا فَجَاهِدْ "তাহলে তাদের খেদমতেই জিহাদ করো।" (বুখারি: ৩০০৪; মুসলিম: ২৫৪৯)

২. নিকাহর বৈধতা ও পিতা-মাতার অনুমতির সম্পর্ক

হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক (বালিগ) সুস্থ-বিবেকবান পুরুষ-নারী নিজেদের সম্মতিতে নিকাহ করতে পারেন; পিতা-মাতার অনুমতি নিকাহ সহিহ হওয়ার শর্ত নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাজহাবে বালিগা নারীর নিকাহ নিজেই করতে পারে (তবে কুফু তথা সমতা বিবেচনা করা সুন্নত)। (আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ; রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৫)

তবে শর্তহীন বৈধতা মানে এই নয় যে, পিতা-মাতাকে এড়িয়ে যাওয়া জায়েজ বা প্রশংসনীয়। ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) লিখেন, পিতা-মাতার সম্মতি ছাড়া বিয়ে করলে নিকাহ সহিহ হলেও তা পিতা-মাতার হক নষ্ট করার কারণে মাকরুহ ও গুনাহের কারণ হতে পারে, যদি না তাদের বাধা শরীয়তবিরোধী হয়। (রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৬-৫৭)

৩. শরীয়তসম্মত বাধা বনাম অপছন্দ

যদি পিতা-মাতা শরীয়তবিরোধী কারণে বাধা দেন (যেমন: কুফু থাকা সত্ত্বেও বংশগত অহংকার, বা হালাল-হারামের বিষয় ছাড়া শুধু পছন্দ না হওয়া), তাহলে সন্তান তাদের কথা না মেনে বিয়ে করতে পারে—এতে গুনাহ হবে না। কিন্তু প্রশ্নে দেখা যাচ্ছে, পিতা-মাতার বাধার কারণ শরীয়তসম্মত ও যুক্তিসঙ্গত: "আগে চাকরি করে প্রতিষ্ঠিত হও, তারপর বিয়ে করো।" এটি সন্তানের ভবিষ্যৎ ও সংসারের দায়িত্ব বহনের প্রস্তুতির কথা—শরীয়তও বিয়ের আগে সামর্থ্য অর্জনের প্রতি উৎসাহ দিয়েছে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ... وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ "হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে বিয়ে করুক... আর যার সামর্থ্য নেই, সে রোজা রাখুক।" (বুখারি: ৫০৬৫; মুসলিম: ১৪০০)

এখানে "সামর্থ্য" (বাআহ) বলতে হানাফি ফকিহগণের মতে ভরণপোষণের সামর্থ্য। (ফাতহুল বারী: ৯/১১)

৪. গোপন বিয়ে করে পরে জানানোর পরিণতি

  • পিতা-মাতার সাথে সম্পর্কের অবনতি, তাদের কষ্ট দেওয়া—যা কাবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত (আকৃতির মতে পিতা-মাতার অবাধ্যতা কাবিরা)। (আল-কাবাইর, ইমাম যাহাবি)
  • সমাজে কলঙ্ক, পারিবারিক বিভেদ, এবং উভয় পরিবারের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা।
  • মেয়ের পরিবার রাজি থাকলেও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও সম্মান রক্ষার জন্য উভয় পরিবারের সম্মতি কাম্য।
  • পরবর্তীতে "প্রতিষ্ঠিত হয়ে জানাবো" —এই পরিকল্পনা বাস্তবে প্রায়ই আরও জটিলতা তৈরি করে; তখন পিতা-মাতার ক্ষোভ দ্বিগুণ হয়।

৫. করণীয় (শরীয়তসম্মত পথ)

১. পিতা-মাতার সাথে ধৈর্য ও সম্মানের সাথে আলোচনা করুন। তাদের ভয় ও উদ্বেগ বোঝার চেষ্টা করুন—তারা সন্তানের মঙ্গলই চান।

২. তাদের শর্ত পূরণের চেষ্টা করুন: চাকরি/স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করুন। টিউশনির আয় দিয়ে সংসার চালানোর বাস্তব পরিকল্পনা তাদের সামনে উপস্থাপন করুন।

৩. মেয়ের পরিবার ও আপনার পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ করান—যেমন কোনো সম্মানিত আত্মীয়/ইমাম/মুরুব্বির মাধ্যমে। সরাসরি "গোপন বিয়ে" নয়, বরং পারিবারিক সম্মতিতে বিয়ের পথ খুঁজুন।

৪. যদি পিতা-মাতা অন্যায়ভাবে বাধা দেন (শরীয়তবিরোধী কারণে), তাহলে অভিভাবকত্বের বাইরে গিয়ে বিয়ের অনুমতি শরীয়তে আছে; তবে তা শেষ উপায় হিসেবে, এবং সম্ভব হলে কোনো ইসলামী আদালত/মুফতির পরামর্শ নিয়ে।

৫. সবরের সাথে দুআ করুন: আল্লাহর কাছে সাহায্য চান, ইস্তিখারা করুন। তিনি বলেন:

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।" (সূরা তালাক: ২)

উপসংহার:

পিতা-মাতাকে না জানিয়ে বিয়ে করলে নিকাহ সহিহ হবে, কিন্তু পিতা-মাতার অবাধ্যতা ও তাদের কষ্ট দেওয়ার কারণে গুনাহ হবে—বিশেষত যখন তাদের বাধা শরীয়তসম্মত ও যুক্তিসঙ্গত। তাই উত্তম ও নিরাপদ পথ হলো: ধৈর্য ধরে পিতা-মাতাকে রাজি করানো, তাদের শর্ত পূরণের চেষ্টা করা, এবং পারিবারিক সম্মতিতে হালাল বিয়ে সম্পন্ন করা। আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম ব্যবস্থা করে দিন। আমিন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.