স্বামী যদি স্ত্রীকে উদ্দেশ্য না করে শুধু এমনি এমনি তালাক তালাক বলে তাহলে তালাক হবে কি
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
উত্তর (সংক্ষিপ্ত):
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته।
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় তালাক হবে না। কারণ আপনার স্বামী তালাকের নিয়ত বা ইচ্ছা করেনি; বরং ছেলের সাথে মজা/খেলার ছলে কথাটি বলেছে। হানাফি মাযহাবের সুস্পষ্ট নীতি হলো—তালাক সংঘটিত হওয়ার জন্য তালাকের নিয়ত (ইচ্ছা) অথবা এমন স্পষ্ট শব্দ হওয়া আবশ্যক, যা থেকে তালাকের ইচ্ছা প্রকাশ পায়। নিছক মজা বা খেলার ছলে বলা "তালাক" শব্দে তালাক পতিত হয় না।
বিস্তারিত:
১. তালাকের মূল ভিত্তি নিয়ত বা স্পষ্ট ইচ্ছা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى»
"নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়ত করেছে।" — সহীহ বুখারী, হাদীস ১; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯০৭
তালাকও একটি আমল; তাই তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য নিয়ত বা ইচ্ছা জরুরি। মজা-খেলা বা হাসি-ঠাট্টার ছলে বলা তালাককে শরীয়ত তালাক হিসেবে গণ্য করে না।
২. হানাফি ফিকহের স্পষ্ট বক্তব্য
আল্লামা ইবনে আবিদীন শামী (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন যে, তালাকের শব্দ যদি সরীহ (স্পষ্ট) হয়, তবে নিয়ত ছাড়াও তা পতিত হয়; কিন্তু যদি কিনায়া (অস্পষ্ট) হয়, তবে নিয়ত বা অবস্থার প্রমাণ ছাড়া তালাক হয় না। আর যদি কেউ হাসি-ঠাট্টা বা খেলার ছলে তালাক বলে, তবে তা তালাক হিসেবে গণ্য নয়—কারণ তখন তালাকের ইচ্ছা থাকে না।
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর ঐকমত্য হলো—তালাকের নিয়ত ছাড়া তালাক সংঘটিত হয় না, যদি না শব্দটি স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন হয় এবং তা তালাকের ইচ্ছা প্রকাশ করে।
৩. ফতোয়ায়ে উসমানি ও ইমদাদুল ফতোয়ার বক্তব্য
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফতোয়ায়ে উসমানি»-তে এবং মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «ইমদাদুল ফতোয়া»-তে স্পষ্ট করেছেন:
- যদি কেউ মজা, খেলা, হাসি-ঠাট্টা বা ভুলবশত তালাকের শব্দ বলে, কিন্তু তালাকের নিয়ত না থাকে, তবে তালাক পতিত হবে না।
- তবে যদি সে জেনে-বুঝে, ইচ্ছাকৃতভাবে তালাক বলে, তবে তা পতিত হবে—এমনকি রাগের অবস্থায় বললেও।
৪. আপনার ঘটনার প্রয়োগ
আপনার স্বামী যখন ছেলের সাথে মজা করছিলেন এবং ছেলে "তালা তালা" বলছিল, তখন স্বামী শুধু মজা করার জন্য "তালাক তালাক" বলেছেন। এতে তালাকের কোনো নিয়ত বা ইচ্ছা ছিল না। তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে তালাক পতিত হয়নি। আপনার বিবাহ বহাল আছে।
সতর্কতা ও পরামর্শ:
১. তালাকের শব্দ নিয়ে কখনো মজা করা উচিত নয়। এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«ثَلَاثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ، وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ: النِّكَاحُ، وَالطَّلَاقُ، وَالرَّجْعَةُ»
"তিনটি বিষয় আছে—যার গুরুত্বপূর্ণটি গুরুত্বপূর্ণ, আর ঠাট্টারূপে করলেও তা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গণ্য: বিবাহ, তালাক এবং রাজআত (ফিরিয়ে আনা)।" — সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২১৯৪; সুনানে তিরমিজি, হাদীস ১১৮৪; ইবনে মাজাহ, হাদীস ২০৩৯
তবে হানাফি ফিকহে এই হাদীসের ব্যাখ্যা হলো: এখানে "হাযল" (ঠাট্টা) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—তালাকের শব্দ উচ্চারণ করা, কিন্তু নিয়ত ছাড়া নয়; বরং যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে তালাকের শব্দ বলে, তার ঠাট্টা-মশকরা করলেও তালাক পতিত হয়। কিন্তু যে ব্যক্তি নিছক খেলা বা মজার ছলে বলে এবং তালাকের কোনো ইচ্ছাই না থাকে, তার ক্ষেত্রে হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত হলো—তালাক পতিত হয় না। ইমাম তাহাবী (রহ.) «শরহু মাআনিল আছার»-এ এবং ইবনে আবিদীন «রাদ্দুল মুহতার»-এ এই তাফসীল উল্লেখ করেছেন।
২. ভবিষ্যতে এ ধরনের শব্দ উচ্চারণ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন।
৩. যদি স্বামীর অন্তরে সামান্যতম তালাকের নিয়তও থেকে থাকে, তবে বিষয়টি ভিন্ন হবে—সেক্ষেত্রে সরাসরি কোনো নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে গিয়ে বিস্তারিতভাবে মাসআলা জেনে নিন।
والله أعلم بالصواب।