দাওয়াত ও তাবলীগের কাজের জন্য সহিহ হাদিস কোনগুলো?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে সহিহ হাদিস এবং "কদরের রাতে হাজরে আসওয়াদ সামনে রেখে ইবাদত" সংক্রান্ত হাদিসের বিধান
ভূমিকা
প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত: ১. দাওয়াত ও তাবলীগের কাজের জন্য সহিহ হাদিস কোনগুলো? ২. তাবলীগ জামাতের সাথীরা যে হাদিস বলে—"আল্লাহর জন্য একটু সময় অপেক্ষা করা সবে কদরের রাতে হাজরে আসওয়াদ পাথরের সামনে রেখে ইবাদত করার সওয়াব মিলে"—এটি কি ঠিক?
প্রথম অংশ: দাওয়াত ও তাবলীগের কাজের জন্য সহিহ হাদিস
দাওয়াত ও তাবলীগ তথা দ্বীনের দাওয়াতের কাজ কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত একটি মহান ইবাদত। নিম্নে কয়েকটি সহিহ হাদিস উল্লেখ করা হলো:
১. যে ব্যক্তি হেদায়েতের দিকে ডাকে
مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ، لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا
"যে ব্যক্তি হেদায়েতের দিকে ডাকে, তার জন্য সেই অনুসরণকারীদের সমান সওয়াব রয়েছে; তাদের সওয়াব থেকে কিছুই কম হবে না।"
— সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৬৭৪
২. দ্বীনের জ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার ফজিলত
مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ
"যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের দিকে পথ দেখায়, তার জন্য সেই কাজ সম্পাদনকারীর সমান সওয়াব রয়েছে।"
— সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৮৯৩
৩. সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ
وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ ۚ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
"তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে ডাকবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।"
— সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৪
৪. দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার সর্বোত্তম পদ্ধতি
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
"তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে ডাকো হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা, আর তাদের সাথে বিতর্ক করো উত্তম পদ্ধতিতে।"
— সূরা আন-নাহল, আয়াত ১২৫
৫. নবী করিম (সা.)-এর নির্দেশনা
بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً
"তোমরা আমার পক্ষ থেকে পৌঁছে দাও, যদিও একটি আয়াত হয়।"
— সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৪৬১
৬. দ্বীনের কাজে বের হওয়ার ফজিলত
مَنْ خَرَجَ فِي طَلَبِ الْعِلْمِ كَانَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ حَتَّى يَرْجِعَ
"যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণে বের হয়, সে ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহর পথে থাকে।"
— সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৬৪৭
৭. সৎ কাজের আদেশ দেওয়া ঈমানের অংশ
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ
"তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোনো মন্দ কাজ দেখে, সে যেন তা হাত দ্বারা পরিবর্তন করে; যদি না পারে, তবে জিহ্বা দ্বারা; যদি না পারে, তবে অন্তর দ্বারা—আর এটাই ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।"
— সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৪৯
দ্বিতীয় অংশ: "কদরের রাতে হাজরে আসওয়াদ সামনে রেখে ইবাদত করলে..." — এই হাদিসের বিধান
এই হাদিসের সনদ ও মান
প্রশ্নে উল্লেখিত হাদিসটি হলো:
مَنْ جَلَسَ فِي الْمَسْجِدِ يَنْتَظِرُ الصَّلَاةَ كَانَ لَهُ أَجْرُ الْمُصَلِّي، وَمَنْ جَلَسَ عِنْدَ الْحَجَرِ الْأَسْوَدِ يَنْتَظِرُ الصَّلَاةَ كَانَ لَهُ أَجْرُ الْمُصَلِّي فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ
অনুবাদ: "যে ব্যক্তি মসজিদে বসে নামাজের অপেক্ষা করে, তার জন্য নামাজির সমান সওয়াব; আর যে ব্যক্তি হাজরে আসওয়াদের কাছে বসে নামাজের অপেক্ষা করে, তার জন্য কদরের রাতে নামাজির সমান সওয়াব।"
এই হাদিসটি সহিহ নয়। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) এই হাদিসটিকে "মুনকার" বলেছেন। ইমাম নববী (রহ.)-ও এর সনদকে দুর্বল বলেছেন। [দেখুন: মিজানুল ইতিদাল, লিসানুল মিজান]
ফুকাহায়ে কেরামের অভিমত
১. ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন:
"এই ধরনের হাদিস যা ফজিলতের ক্ষেত্রে বর্ণিত হয়েছে কিন্তু সহিহ নয়, তা দ্বারা আমল করা জায়েজ নয়।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ৪৩০
২. মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:
"ফজিলতের হাদিসের ক্ষেত্রে সনদের দুর্বলতা থাকলে আমল করা যায়—এই নীতিটি শুধু সেই হাদিসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যা সহিহ হাদিসের মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক নয়। কিন্তু যে হাদিস সম্পূর্ণ বানোয়াট বা মুনকার, তা দ্বারা আমল করা জায়েজ নয়।" — মাআরিফুল কুরআন, সূরা আল-কাদর এর তাফসির
৩. ফাতাওয়া আলমগিরিতে উল্লেখ আছে:
"ফজিলতের হাদিস যদি দুর্বল হয়, তবে তা দ্বারা আমল করা যায়, তবে শর্ত হলো—হাদিসটি সহিহ হাদিসের বিরোধী না হওয়া এবং বানোয়াট না হওয়া।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ২১০
এই হাদিসের সমস্যা
১. সনদগত দুর্বলতা: এই হাদিসের সনদে এমন রাবি রয়েছেন যারা নির্ভরযোগ্য নন। ২. মুনকার: ইমাম ইবনে হাজার (রহ.) এটিকে মুনকার বলেছেন। ৩. কদরের রাতের নির্দিষ্টকরণ: কদরের রাত নির্দিষ্ট কোনো স্থানে বা নির্দিষ্ট কোনো পাথরের সামনে ইবাদত করার বিষয়টি কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। ৪. হাজরে আসওয়াদ: হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা সুন্নত, কিন্তু তার সামনে বসে ইবাদত করার বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে কোনো সহিহ হাদিস নেই।
সঠিক আমল
কদরের রাতের ফজিলত সম্পর্কে সহিহ হাদিস হলো:
مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
"যে ব্যক্তি ঈমানসহ ও সওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদত করে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।"
— সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৯০১; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৭৬০
কদরের রাতের আমল:
- নামাজ পড়া
- কুরআন তিলাওয়াত
- দুআ করা (বিশেষত: اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي)
- ইতিকাফ করা
- যিকির-আযকার
তাবলীগ জামাত সম্পর্কে ফুকাহায়ে কেরামের অভিমত
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর ফতোয়া
"তাবলীগ জামাতের মূল কাজ—দাওয়াত ও তাবলীগ—কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। তবে তাদের মধ্যে কিছু বিদআত ও ভ্রান্ত বিশ্বাস রয়েছে, যা থেকে বিরত থাকা জরুরি। বিশেষত কিছু জাল ও বানোয়াট হাদিস তারা ব্যবহার করে, যা শরিয়তসম্মত নয়।" — ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ৩৮০
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর অভিমত
"দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করা সুন্নত ও মুস্তাহাব। কিন্তু কোনো জাল হাদিস বা বানোয়াট ফজিলতের উপর ভিত্তি করে আমল করা জায়েজ নয়। ফজিলতের হাদিস দুর্বল হলে তা দ্বারা আমল করা যায়, কিন্তু জাল হাদিস দ্বারা আমল করা কখনোই জায়েজ নয়।" — ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃ. ৩২৫
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ | কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত, মুস্তাহাব | | প্রশ্নে উল্লেখিত হাদিস | সহিহ নয়, মুনকার ও দুর্বল | | এই হাদিস বর্ণনা করা উচিত নয়** | | কদরের রাতের আমল | সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত—নামাজ, দুআ, কুরআন তিলাওয়াত | | হাজরে আসওয়াদ সামনে বসে ইবাদত | বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে কোনো সহিহ হাদিস নেই |
উপদেশ: দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করুন সহিহ হাদিসের আলোকে। জাল ও বানোয়াট হাদিস থেকে বিরত থাকুন। ফজিলতের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদিস দ্বারা আমল করা যায়, তবে শর্ত হলো—হাদিসটি জাল না হওয়া এবং সহিহ হাদিসের বিরোধী না হওয়া। প্রশ্নে উল্লেখিত হাদিসটি মুনকার ও দুর্বল, তাই তা বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকা উচিত।