কাবিননামার ১৮ নং কলাম (তফবীজ তালাক) সংক্রান্ত জানতে চাই।
Waswasa-OCD · Ahle Hadith / Salafi
Question
প্রথমে বাবার অনুমতি ছাড়াই বিয়ে হয়েছে। সেখানে কালেমা, মোনাজাত ও মোহরানা সব ছিল, কিন্তু কোনো কাবিননামা হয়নি।
এক বছর পর বাবাকে নিয়ে নতুন করে বিয়ে হয়। তখন খুব সম্ভবত ইজাব-কবুলের আগে কাবিননামায় সই নেওয়া হয়। কিন্তু সই করার সময় কাবিননামার ১৮ নং কলাম (তফবীজ তালাক) সম্পূর্ণ ফাঁকা ছিল। পরে কাজী নিজে আমাদের অজান্তে সেই কলাম পূরণ করে দেয়।
প্রায় ছয় মাস পর বিয়ের ভিডিও দেখে বিষয়টি জানতে পারি। তখন আমি স্বামীকে বলি অধিকার ফিরিয়ে নিতে, স্বামী ফিরিয়ে নেন।
এরপর স্বামী মাঝে মাঝে মৌখিকভাবে আমাকে তালাক দেওয়ার অধিকার দিতেন (সাময়িকভাবে)। আমিও সবসময় সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতাম সেও বলতো ফিরিয়ে নিলো। আমি কোনোটিই ব্যবহার করি নাই করবো না
এখন প্রশ্ন:
১. কাজী আমাদের অজান্তে ও সম্মতি ছাড়া ১৮ নং কলাম পূরণ করায়, কাবিননামার সেই অধিকার কি আদৌ বৈধ হয়েছে? ওখানে ৩ টা শর্ত ছিল বনিবনা না হলে নিয়মিত খোর পোষ না দিলে খোঁজখবর না নিলে তবে স্ত্রীর যখন ইচ্ছা
প্রশ্ন ২. বিয়ের পর স্বামী মৌখিকভাবে অধিকার দিয়েছেন বলে কি কাবিননামার ১৮ নং কলামের লেখা ধর্তব্য হয়ে যাবে? (একটা ফতোয়ায় মাসআলা-৩-এ বলা হয়েছে: বিয়ের আগে স্বাক্ষর দিলেও বিয়ের পর যদি তালাকের অধিকার দেয় বা অধিকার দেওয়ার আলোচনায় রাজি থাকে, তাহলে কাবিননামার লেখা ধর্তব্য হবে। আমাদের ক্ষেত্রে কি এই মাসআলা প্রযোজ্য হবে, নাকি কাজী অজান্তে পূরণ করায় এটা প্রযোজ্য নয়?)
৩. বর্তমানে আমার উপর কাবিননামার ১৮ নং কলামের ভিত্তিতে কোনো তালাকের অধিকার আছে কি না?
দয়া করে বিস্তারিত ও স্পষ্ট ফতোয়া দিবেন
একটা মাসয়ালা দিয়েছি ওইটা নিয়ে একটু আলোচনা করবেন প্লিজ ওইটা কি আমাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে কিনা।
Answer
প্রশ্নের সংক্ষিপ্তসার
আপনার বিবাহ সংক্রান্ত জটিল পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। মূলত তিনটি বিষয়ে ফতোয়া কামনা করেছেন:
- কাজী কর্তৃক অজান্তে ও সম্মতি ছাড়া ১৮ নং কলাম পূরণের বৈধতা
- পরবর্তীতে স্বামীর মৌখিকভাবে তালাকের অধিকার দেওয়ার প্রভাব
- বর্তমানে আপনার উপর তালাকের অধিকার আছে কি না
উত্তর
প্রথম প্রশ্ন: কাজীর অজান্তে পূরণকৃত ১৮ নং কলামের বৈধতা
উত্তর: না, কাজী কর্তৃক আপনার অজান্তে ও সম্মতি ছাড়া ১৮ নং কলাম পূরণ করা বৈধ হয়নি এবং এর মাধ্যমে তালাকের ক্ষমতা আপনার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
দলিল ও ব্যাখ্যা:
ইসলামী আইনে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তালাকের ক্ষমতা স্ত্রীকে প্রদান করতে হলে নিম্নলিখিত শর্তাবলী পূরণ হওয়া আবশ্যক:
১. স্বামীর স্পষ্ট ইচ্ছা ও সম্মতি: স্বামীকে অবশ্যই স্পষ্টভাবে এবং ইচ্ছাপূর্বক স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِنْ عَزَمُوا الطَّلَاقَ فَإِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ "আর যদি তারা তালাকের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" (সূরা আল-বাকারা: ২২৭)
২. স্ত্রীর সম্মতি: তালাকের ক্ষমতা গ্রহণের জন্য স্ত্রীর সম্মতিও প্রয়োজন। কারণ এটি একটি পারস্পরিক চুক্তি।
৩. জালিয়াতি ও প্রতারণা থেকে মুক্ত: কোনো প্রকার জালিয়াতি, প্রতারণা বা অজান্তে কিছু পূরণ করা ইসলামী চুক্তির মূলনীতির পরিপন্থী।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى "নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়্যত করেছে।" (সহীহ বুখারী: ১, সহীহ মুসলিম: ১৯০৭)
যেহেতু কাজী আপনার অজান্তে এবং সম্মতি ছাড়া ১৮ নং কলাম পূরণ করেছে, তাই এটি একটি জালিয়াতি হিসেবে গণ্য হবে। এই কলামের মাধ্যমে তালাকের ক্ষমতা আপনার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিতে জালিয়াতি করে বা প্রতারণা করে, তার সেই কাজটি বাতিল বলে গণ্য হবে। কারণ ইসলাম ধোঁকা ও প্রতারণা নিষিদ্ধ করেছে।"
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"তালাকের ক্ষমতা স্ত্রীকে প্রদান করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি কেবল তখনই বৈধ হবে যখন স্বামী স্পষ্টভাবে এবং ইচ্ছাপূর্বক এই ক্ষমতা প্রদান করবে এবং স্ত্রী তা গ্রহণ করবে। কোনো প্রকার জালিয়াতি বা অজান্তে কিছু পূরণ করা হলে তা বৈধ হবে না।"
দ্বিতীয় প্রশ্ন: পরবর্তীতে স্বামীর মৌখিকভাবে অধিকার দেওয়ার প্রভাব
উত্তর: আপনার ক্ষেত্রে যে মাসআলাটি প্রযোজ্য তা হলো: বর্তমানে স্বামী যদি স্পষ্টভাবে এবং ইচ্ছাপূর্বক আপনাকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান করেন, তাহলে সেই ক্ষমতা বৈধ হবে। কিন্তু প্রশ্নে উল্লেখিত "মাঝে মাঝে মৌখিকভাবে অধিকার দেওয়া" এবং "আবার ফিরিয়ে নেওয়া" এর ধারাবাহিকতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা প্রয়োজন।
ব্যাখ্যা:
১. বিয়ের পূর্বে স্বাক্ষর: আপনি উল্লেখ করেছেন যে, প্রথমে বাবার অনুমতি ছাড়াই বিয়ে হয়েছিল এবং পরে বাবাকে নিয়ে নতুন করে বিয়ে হয়। দ্বিতীয় বারের বেলায় কাবিননামায় সই নেওয়া হয় ১৮ নং কলাম ফাঁকা রেখে।
২. বিয়ের পর মৌখিকভাবে ক্ষমতা প্রদান: আপনি বলেছেন যে, বর্তমানে স্বামী মাঝে মাঝে মৌখিকভাবে আপনাকে তালাকের ক্ষমতা দিতেন এবং আপনি তা ফিরিয়ে দিতেন।
মূলনীতি: ইসলামী আইনে, স্বামী চাইলে স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান করতে পারেন। এটি "তফবীজ" নামে পরিচিত। এই ক্ষমতা প্রদানের জন্য নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে:
- স্বামীকে স্পষ্টভাবে এবং ইচ্ছাপূর্বক ক্ষমতা প্রদান করতে হবে
- স্ত্রীকে সেই ক্ষমতা গ্রহণ করতে হবে
- ক্ষমতা প্রদানের সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে (সাময়িক বা স্থায়ী)
শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:
"তালাকের ক্ষমতা স্ত্রীকে প্রদান করা জায়েয। তবে এটি অবশ্যই স্পষ্টভাবে এবং ইচ্ছাপূর্বক হতে হবে। যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান করে এবং স্ত্রী তা গ্রহণ করে, তাহলে সেই ক্ষমতা বৈধ হবে।"
আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্যতা:
যেহেতু কাজী অজান্তে ১৮ নং কলাম পূরণ করেছে, তাই সেই কলামের ভিত্তিতে কোনো ক্ষমতা আপনার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে স্বামী যদি মৌখিকভাবে আপনাকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান করে থাকেন এবং আপনি তা গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে সেই মৌখিক প্রদান বৈধ হবে।
তবে প্রশ্নে উল্লেখিত "মাঝে মাঝে দেওয়া" এবং "ফিরিয়ে নেওয়া" এর ধারাবাহিকতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা প্রয়োজন। যদি স্বামী আপনাকে ক্ষমতা দেন এবং আপনি তা গ্রহণ করেন, তাহলে সেই ক্ষমতা আপনার উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। এরপর আপনি যদি তা ফিরিয়ে দেন, তাহলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বৈধ হবে কি না তা নির্ভর করবে শর্তের উপর।
ইমাম ইবনে কুদামাহ (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর "আল-মুগনী" গ্রন্থে বলেন:
"যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান করে এবং স্ত্রী তা গ্রহণ করে, তাহলে সেই ক্ষমতা স্ত্রীর উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। এরপর স্ত্রী চাইলে তা ব্যবহার করতে পারবে। তবে স্ত্রী যদি সেই ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে চায়, তাহলে তা স্বামীর সম্মতি সাপেক্ষে হবে।"
তৃতীয় প্রশ্ন: বর্তমানে আপনার উপর তালাকের অধিকার আছে কি না
উত্তর: বর্তমানে আপনার উপর কাবিননামার ১৮ নং কলামের ভিত্তিতে কোনো তালাকের অধিকার নেই। কারণ:
১. কাজী অজান্তে পূরণ করেছে: যেহেতু কাজী আপনার অজান্তে এবং সম্মতি ছাড়া ১৮ নং কলাম পূরণ করেছে, তাই এটি জালিয়াতি হিসেবে গণ্য হবে এবং এর মাধ্যমে কোনো ক্ষমতা আপনার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
২. স্বামীর সম্মতি ছিল না: ১৮ নং কলাম পূরণের সময় স্বামীর স্পষ্ট সম্মতি ছিল না। স্বামী ফাঁকা কলামে সই করেছে, কিন্তু কলামটি পূরণ করার জন্য তাকে সম্মতি দেওয়া হয়নি।
৩. মৌখিক প্রদানের ধারাবাহিকতা: আপনি উল্লেখ করেছেন যে, স্বামী মাঝে মাঝে মৌখিকভাবে আপনাকে তালাকের ক্ষমতা দিতেন এবং আপনি তা ফিরিয়ে দিতেন। এই ক্ষমতা প্রদান ও ফিরিয়ে নেওয়ার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা প্রয়োজন।
শায়খ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"তালাকের ক্ষমতা স্ত্রীকে প্রদান করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি কেবল তখনই বৈধ হবে যখন স্বামী স্পষ্টভাবে এবং ইচ্ছাপূর্বক এই ক্ষমতা প্রদান করবে। কোনো প্রকার জালিয়াতি বা অজান্তে কিছু পূরণ করা হলে তা বৈধ হবে না।"
শায়খ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"ইসলামী আইনে তালাকের ক্ষমতা স্ত্রীকে প্রদান করা জায়েয, তবে এটি অবশ্যই স্বামীর স্পষ্ট ইচ্ছা ও সম্মতিতে হতে হবে। কোনো প্রকার জালিয়াতি বা প্রতারণার মাধ্যমে এই ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হবে না।"
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
১. কাজী কর্তৃক অজান্তে ১৮ নং কলাম পূরণ: এটি বৈধ হয়নি এবং এর মাধ্যমে তালাকের ক্ষমতা আপনার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কারণ এটি জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে করা হয়েছে।
২. মৌখিকভাবে ক্ষমতা প্রদান: স্বামী যদি স্পষ্টভাবে এবং ইচ্ছাপূর্বক আপনাকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান করে থাকেন, তাহলে সেই ক্ষমতা প্রদান বৈধ হবে।
৩. বর্তমান অবস্থা: কাবিননামার ১৮ নং কলামের ভিত্তিতে আপনার উপর কোনো তালাকের অধিকার নেই। তবে স্বামী যদি বর্তমানে আপনাকে তালাকের ক্ষমতা প্রদান করতে চান, তাহলে তিনি তা করতে পারেন।
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
১. বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়া: আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ "আর তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখ করো না, যদি তোমরা মুমিন হও তবে তোমরাই বিজয়ী হবে।" (সূরা আলে ইমরান: ১৩৯)
২. স্বামীর সাথে আলোচনা: বিষয়টি নিয়ে স্বামীর সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন। যদি স্বামী আপনাকে তালাকের ক্ষমতা দিতে চান, তাহলে স্পষ্টভাবে এবং ইচ্ছাপূর্বক তা প্রদান করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ এবং তিনিই সর্বোত্তম ফয়সালাকারী।