শিরকি চিন্তা ভাবনা আসা
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
শিরকি চিন্তা (ওয়াসওয়াসা) সম্পর্কে বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
এক ব্যক্তির মনে হঠাৎ করে বিভিন্ন শিরকি চিন্তা আসতে শুরু করেছে। সে যথাসম্ভব এগুলোকে মন না দেওয়ার চেষ্টা করে এবং কার্টুন/ইউটিউব দেখার সময়ও এ চিন্তা আসলে সেগুলোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে নিজের কাজ চালিয়ে যায়। জানতে চাওয়া হয়েছে—এতে কি তার ইচ্ছাকৃত শিরক হবে? তওবা করতে হবে, নাকি শুধু দোয়া করলেই যথেষ্ট?
বিস্তারিত উত্তর
১. মনে আসা শিরকি চিন্তা কি শিরক?
উত্তর: না, এতে ইচ্ছাকৃত শিরক হবে না। কারণ শিরক হলো অন্তরের বিশ্বাস ও ইচ্ছার বিষয়। শয়তানের পক্ষ থেকে মনে যে ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা) আসে, তা যদি বান্দা অপছন্দ করে এবং তা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে, তবে তা কুফর বা শিরক হিসেবে গণ্য হয় না।
দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا
"আল্লাহ কারও উপর তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي مَا وَسْوَسَتْ بِهِ صُدُورُهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ بِهِ أَوْ تَكَلَّمْ بِهِ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরে যে ওয়াসওয়াসা আসে তা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা আমলে পরিণত করে বা মুখে উচ্চারণ করে।" — (সহীহ বুখারী: ৫২৬৯; সহীহ মুসলিম: ১২৭)
অন্য হাদিসে এসেছে, সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করলেন যে, আমাদের কেউ এমন চিন্তা অনুভব করে যা সে আকাশ থেকে পড়ে যাওয়াকে বেশি পছন্দ করে, কিন্তু তা মুখে উচ্চারণ করতে চায় না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন:
ذَاكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ
"এটাই হলো ঈমানের প্রমাণ (অর্থাৎ শয়তানের কুমন্ত্রণা আসা সত্ত্বেও তা অপছন্দ করা ঈমানের দলিল)।" — (সহীহ মুসলিম: ১৩২)
২. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন:
الوسوسة لا تؤاخذ إذا لم يقترن بها اعتقاد أو قول أو فعل
"ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা) ধর্তব্য নয়, যতক্ষণ না তার সাথে বিশ্বাস, কথা বা কাজ যুক্ত হয়।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃ. ১১৪-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)
ফাতাওয়া আলমগিরিতে এসেছে:
لا يكفر المسلم بالوسوسة والخواطر التي تجري في قلبه من غير اختياره
"মুসলিম ব্যক্তি তার অনিচ্ছাকৃত অন্তরের ওয়াসওয়াসা ও খটকা দ্বারা কাফির হয় না।" — (ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল ফাতাওয়া, খণ্ড ২)
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানি»-তে বলেন:
دل میں آنے والے شیطانی وسوسے مؤاخذہ کا سبب نہیں بنتے، بشرطیکہ انہیں دل سے قبول نہ کیا جائے
"অন্তরে আসা শয়তানি কুমন্ত্রণা পাকড়াও করার কারণ হয় না, শর্ত হলো তা অন্তর থেকে কবুল না করা।" — (ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, ঈমান ও আকাইদ অধ্যায়)
৩. প্রশ্নকারীর বর্ণনা অনুযায়ী বিধান
প্রশ্নে বর্ণিত ব্যক্তির অবস্থা:
- তার মনে শিরকি চিন্তা আসে — এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা
- সে এগুলোকে মন না দেওয়ার চেষ্টা করে — এটি ঈমানের আলামত
- কার্টুন/ইউটিউব দেখার সময়ও চিন্তা আসলে মনোযোগ দেয় না — এটি সঠিক আচরণ
- সে জানে চিন্তা আসতে পারে, তারপরও কাজ চালিয়ে যায় — এতে দোষ নেই
সিদ্ধান্ত: তার উপর ইচ্ছাকৃত শিরকের কোনো বিধান আরোপিত হবে না। সে গুনাহগার নয়। তাকে তওবা করতে হবে না (যেহেতু কোনো গুনাহ সংঘটিত হয়নি)। তবে করণীয় হলো:
-
আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা — নিম্নোক্ত দোয়া পড়া:
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
"আমি আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় চাই।"
-
সূরা আন-নাস ও সূরা আল-ফালাক পড়া — বিশেষত ফজর ও মাগরিবের পর এবং ঘুমানোর আগে।
-
"আমানতু বিল্লাহি ওয়া রাসুলিহি" বলা — হাদিসে এসেছে, ওয়াসওয়াসা আসলে এ কথা বললে তা দূর হয়ে যায়।
-
চিন্তাকে গুরুত্ব না দেওয়া — প্রশ্নকারী ইতিমধ্যে এটি করছেন, যা প্রশংসনীয়।
-
নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও যিকির করা — অন্তরকে শক্তিশালী করার জন্য।
৪. তওবা প্রসঙ্গে
যেহেতু কোনো ইচ্ছাকৃত শিরক সংঘটিত হয়নি, তাই তওবা করা আবশ্যক নয়। তবে সাধারণভাবে ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া ও ইস্তিগফার করা উত্তম। যদি কখনো মন থেকে চিন্তাটিকে সমর্থন করে ফেলে (নাউজুবিল্লাহ), তখনই তওবা করতে হবে।
ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ বলেন:
دل میں گناہ کا خیال آنا گناہ نہیں، جب تک اسے دل سے قبول نہ کیا جائے
"অন্তরে গুনাহের চিন্তা আসা গুনাহ নয়, যতক্ষণ না তা অন্তর থেকে কবুল করা হয়।" — (বেহেশতী জেওর, ঈমান-আকাইদ অংশ)
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিধান | |------|-------| | মনে শিরকি চিন্তা আসা | শয়তানের ওয়াসওয়াসা — গুনাহ নয় | | মন না দেওয়ার চেষ্টা করা | ঈমানের আলামত — প্রশংসনীয় | | ইচ্ছাকৃত শিরক হবে কি? | না, হবে না | | তওবা করতে হবে কি? | না, তবে দোয়া ও ইস্তিগফার উত্তম | | করণীয় | আউজুবিল্লাহ পড়া, সূরা নাস-ফালাক পড়া, চিন্তাকে গুরুত্ব না দেওয়া |
তথ্যসূত্র:
- সহীহ বুখারী: ৫২৬৯
- সহীহ মুসলিম: ১২৭, ১৩২
- সূরা আল-বাকারা: ২৮৬
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন)
- ফাতাওয়া আলমগিরি
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
- বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী)
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)