পানি পড়া ব্যবহার করা কি শিরক?

Faith and Belief · Hanafi

Question No: 5165
Questioner: Mohsena Binte Maksud
Question Asked: 08 Sep 2026, 11:54 PM
Reviewed & Published: 09 Sep 2026, 12:37 AM
Views: 35
Tokens: 4,434
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আক্রান্ত। তারা এক এক হুজুরের কাছে গেলে সে তাদের নানান রকম কিছু কাজকর্ম করতে বলেন সাথে কিছু পানি পড়া এটা সেটা পড়া ব্যবহার করতে দেয়। সেই হুজুর আমার সেই আত্মীয়কে বলে সে যেন ২১ দিন বাসা থেকে না বের হয়, এবং এগুলো করা শুরু অবস্থায় প্রথম তিনদিন বাসায় যেন রাত 12 টার পর সবাই মোবাইল ফোন বন্ধ রাখে, বারোটার পর মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষেধ করেছে তিন দিন, এগুলো মানলে শিরক হবে কিনা

Answer

শিরক হবে কিনা — বিস্তারিত বিশ্লেষণ

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

একজন "হুজুর" (পীর/আমলকারী) রোগীকে বিভিন্ন কাজকর্ম করতে বলেন, পানি পড়ে ব্যবহার করতে দেন, ২১ দিন বাসা থেকে বের না হতে বলেন এবং প্রথম তিনদিন রাত ১২টার পর মোবাইল ফোন বন্ধ রাখতে বলেন। এই নির্দেশগুলো মানলে শিরক হবে কিনা — এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে।


উত্তরের মূলনীতি

১. শিরক কী?

শিরক হলো আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা — ইবাদত, দুআ, ভয়, ভরসা, ভালোবাসা বা আনুগত্যে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না যে তাঁর সাথে শিরক করে; আর এছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।" (সূরা আন-নিসা: ৪৮)

২. তাবিজ-কবজঝাড়-ফুঁক সম্পর্কে ইসলামী বিধান

ইসলামে ঝাড়-ফুঁক (রুকইয়াহ) কুরআন ও সহীহ দুআ দ্বারা করা জায়েয। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও ঝাড়-ফুঁক করেছেন এবং সাহাবীদের অনুমতি দিয়েছেন। তবে শর্ত হলো:

১. তা কুরআন, সহীহ হাদীসে বর্ণিত দুআ বা অর্থবোধক ও শরীআতসম্মত দুআ দ্বারা হতে হবে ২. বিশ্বাস করতে হবে যে, আসল প্রভাবক আল্লাহ — পানি বা লেখা নিজে কোনো প্রভাব রাখে না ৩. এমন কিছু ব্যবহার না করা যাতে শিরকী বিশ্বাস বা অজ্ঞেয়বাদী ধারণা থাকে

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার-এ বলেন:

"তাবিজ-কবজে যদি কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম লেখা থাকে, তবে তা ব্যবহার করা জায়েয; আর যদি তাতে শিরকী কালাম বা অজ্ঞেয় বাক্য থাকে, তবে তা হারাম।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৪)


প্রশ্নের নির্দিষ্ট দিকগুলো বিশ্লেষণ

ক. "পানি পড়া ব্যবহার করতে দেওয়া" — শিরক কিনা?

পানি পড়ে ব্যবহার করানো নিজে শিরক নয়, যদি:

  • পানি পড়ার সময় কুরআনের আয়াত বা সহীহ দুআ পড়া হয়
  • ব্যবহারকারী বিশ্বাস করে যে, আল্লাহই আরোগ্য দানকারী — পানি শুধু মাধ্যম

তবে যদি বিশ্বাস থাকে যে, পানির নিজস্ব কোনো প্রভাব আছে বা হুজুরের বরকতে পানি কাজ করে, তাহলে তা শিরকের দিকে ধাবিত হতে পারে। ফাতাওয়া উসমানী-তে এসেছে:

"যদি কেউ বিশ্বাস করে যে, অমুক পীরের দেওয়া তাবিজ নিজে প্রভাব ফেলে, তবে তা শিরক। আর যদি আল্লাহর উপর ভরসা রেখে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, তবে জায়েয।"

খ. "২১ দিন বাসা থেকে বের না হওয়া" — শিরক কিনা?

এটি শিরক নয়। এটি একটি অভ্যাসগত বা মানসিক নির্দেশনা মাত্র। তবে শরীআতে এর কোনো ভিত্তি নেই। ইসলামে রোগ নিরাময়ের জন্য বৈধ পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা উচিত। এমন নির্দেশ মানা জরুরি নয়, তবে মানলে শিরক হবে না — যতক্ষণ না এর সাথে কোনো শিরকী বিশ্বাস যুক্ত থাকে।

গ. "রাত ১২টার পর মোবাইল বন্ধ রাখা" — শিরক কিনা?

এটিও শিরক নয়। এটি একটি কুসংস্কার বা ভিত্তিহীন নির্দেশনা মাত্র। ইসলামে রাত ১২টার পর মোবাইল বন্ধ রাখার কোনো ধর্মীয় তাৎপর্য নেই। তবে মানলে শিরক হবে না, কারণ শিরক হলো বিশ্বাসগত বিষয় — আর এখানে আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করার বিশ্বাস নেই।

ঘ. "এগুলো মানলে শিরক হবে কিনা" — মূল উত্তর

উপরোক্ত কাজগুলো মানলে শিরক হবে না, যদি:

  1. ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, আল্লাহই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক
  2. হুজুরকে আল্লাহর স্থানে বা সমকক্ষ মনে না করে
  3. মনে না করে যে, হুজুরের নির্দেশ নিজে কোনো প্রভাব ফেলে

তবে গুনাহ বা বিদআত হতে পারে, কারণ:

  • শরীআতে অনুমোদিত নয় এমন আমল করা
  • কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন বিশ্বাসকে প্রশ্রয় দেওয়া
  • দ্বীনের নামে নতুন রীতি প্রবর্তন করা

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

১. শিরকের সংজ্ঞা সম্পর্কে সতর্কতা

শিরক শুধু মূর্তি পূজা নয়। শিরক হলো:

  • আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে দুআ করা
  • আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে অলৌকিক সাহায্য প্রার্থনা করা
  • বিশ্বাস করা যে, অমুক ব্যক্তি বা বস্তু আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কিছু করতে পারে

২. হুজুরের আনুগত্য সম্পর্কে সতর্কতা

ইসলামে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আনুগত্য ফরজ। কিন্তু কোনো পীর বা হুজুরের আনুগত্য ইসলামী শরীআতের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যদি কোনো পীর শরীআতবিরোধী নির্দেশ দেন, তবে তা মানা জায়েয নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ "সৃষ্টিকর্তার নাফরমানীতে সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মুসনাদ আহমাদ: ১০৯৮)


ফাতাওয়া ও আলেমদের বক্তব্য

১. ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী)

"যেসব তাবিজ-কবজে কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নাম থাকে এবং ব্যবহারকারী আল্লাহর উপর ভরসা রেখে ব্যবহার করে, তা জায়েয। কিন্তু যদি বিশ্বাস করা হয় যে, তাবিজ নিজে প্রভাব ফেলে, তবে তা শিরক।"

২. ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী)

"ঝাড়-ফুঁক ও তাবিজ-কবজে মূল বিষয় হলো বিশ্বাস। যদি বিশ্বাস থাকে যে, আল্লাহই আরোগ্য দানকারী এবং এগুলো শুধু মাধ্যম, তবে জায়েয। আর যদি বিশ্বাস করা হয় যে, এগুলোর নিজস্ব প্রভাব আছে, তবে তা শিরক।"

৩. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন)

"যে তাবিজে শিরকী কালাম থাকে, তা ব্যবহার করা হারাম। আর যে তাবিজে কুরআনের আয়াত থাকে, তা জায়েয। তবে শর্ত হলো, ব্যবহারকারী আল্লাহর উপর ভরসা রাখবে, তাবিজের উপর নয়।"


ব্যবহারিক নির্দেশনা

যা করণীয়:

  1. বিশ্বাস সংশোধন করুন — মনে রাখুন, আরোগ্য দাতা একমাত্র আল্লাহ
  2. বৈধ চিকিৎসা নিন — ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
  3. কুরআন ও সহীহ দুআ দ্বারা ঝাড়-ফুঁক করুন — যেমন সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, চার কুল ইত্যাদি
  4. আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন — তাওয়াক্কুলের সাথে দুআ করুন

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.