স্ত্রীকে তালাকের স্বাধীনতা দেওয়ার পর স্ত্রী তালাক দিলে তার মাসআলা
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
এভাবে শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে স্ত্রী একদিন বলে যে, "তাহলে দিয়েই দিন তালাক। শুধু শুধু আর কত অসম্মান, অশান্তি করবেন?"
কিন্তু স্বামী প্রতিবারই শুধু বলতে থাকে - "ঠিক আছে দিয়েই দিবো, তুমি যা চাও তাই হবে।" কিন্তু স্পষ্ট করে তালাক আর দেন না।
এরকম অশান্তি প্রায় প্রতিনিয়তই হতে থাকে।
এমনকি একদিন মোবাইলে কথা বলা অবস্থায়ও স্বামী বলতে থাকেন- "তোমাকে বিয়ে করেই ভুল করেছি। ছেড়ে দেওয়াই উচিত ছিল।" তখন স্ত্রীও বলে যে, "ঠিক আছে ছেড়ে দাও। দিচ্ছি,দিবো.. এরকম ভাসা ভাসা কথা আমি আর শুনতে চাই না।" তখন স্বামী বলে উঠে- "ঠিক আছে যাও। তালাক দেওয়ার স্বাধীনতা তোমাকে দিয়ে দিলাম।" স্বামী এই কথা তিন/চারবার স্পষ্ট করেই বলে। এমনও বলে-"তালাক দেওয়ার স্বাধীনতা আমার স্ত্রীর হাতে দিয়ে দিলাম।" তার একটু পরেই স্ত্রীও বলে- "ঠিক আছে। আমি তোমাকে তালাক দিয়ে দিলাম।"
এখন প্রশ্ন হলো - এর দ্বারা কোনো তালাক পতিত হয়েছে কি?
- পতিত হলেও কেমন তালাক হয়েছে? বায়েন নাকি রজয়ী?
- এই তালাক যদি ফিরিয়ে নিতে চায়; সেক্ষেত্রে ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার কার হাতে থাকবে? স্ত্রীর নাকি স্বামীর?
- ফিরিয়ে নিতে চাইলে কিভাবে ফিরিয়ে নিবে? তার বিধান কি?
- এই তালাকের ইদ্দতের বিধান কি?
উল্লেখ্য, তালাকের এই ঘটনা স্ত্রীর হায়েজ থাকা অবস্থায় সংগঠিত হয়েছে। তখন হায়েজের শেষ দিন ছিল (সপ্তম দিন)।
Answer
প্রশ্নোক্ত বিষয়ের বিস্তারিত ফিকহি বিশ্লেষণ ও সমাধান
ভূমিকা
প্রশ্নে উল্লেখিত ছুরতে স্ত্রী তালাকের অধিকারপ্রাপ্ত হয়েছে। এমতাবস্থায় স্ত্রী যেহেতু স্বামীকে তালাক দিয়েছে, নিজে নিজের নফসের উপর তালাক গ্রহণ করেনি, তাই এক্ষেত্রে তালাক পতিত হবে না।
স্বামী যেসব বাক্য বলেছে এর মধ্যে "চলে যাও" বা এই জাতীয় বাক্য ছিল কেনায়া বাক্য। এধরনের বাক্য বলার সময় সে যদি তালাকের নিয়ত করে থাকে, তাহলে এক তালাকে বায়ান পতিত হবে।
পুনরায় ঘর সংসার করতে চাইলে নতুন করে বিবাহ পড়িয়ে নিতে হবে।
প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সূক্ষ্ম। এখানে দু'টি মূল বিষয় জড়িত: ১. স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাকের স্বাধীনতা (তালাক-ই-তাফবিজ) প্রদান ২. স্ত্রী কর্তৃক সেই স্বাধীনতা বলে তালাক প্রদান
নিচে ধাপে ধাপে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের কিতাবসমূহের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. তালাকের স্বাধীনতা প্রদান (তাফবিজুত তালাক) — শরীয়তসম্মত বিধান
কুরআনুল কারীমের দলিল
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ ۖ فَإِمْسَاكٌ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحٌ بِإِحْسَانٍ
"তালাক (রজয়ী) দুইবার। অতঃপর হয় সংগতভাবে স্ত্রীকে রেখে দেওয়া, অথবা সদ্ভাবে ছেড়ে দেওয়া।" — (সূরা আল-বাকারা: ২২৯)
আল্লাহ তা'আলা আরও ইরশাদ করেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ إِنْ كُنْتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعْكُنَّ وَأُسَرِّحْكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا
"হে নবী! আপনার স্ত্রীদেরকে বলে দিন, যদি তোমরা দুনিয়ার জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা কর, তবে এসো, আমি তোমাদেরকে ভরণপোষণ দেব এবং সৌজন্যের সাথে বিদায় করে দেব।" — (সূরা আল-আহযাব: ২৮)
হাদিসের দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
أَبْغَضُ الْحَلَالِ إِلَى اللَّهِ الطَّلَاقُ
"আল্লাহর নিকট সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল বস্তু হলো তালাক।" — (সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৮; সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০১৮)
হানাফি ফিকহের মূলনীতি
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী, স্বামী তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা (তাফবিজ) প্রদান করতে পারে। এটি শরীয়তসম্মত এবং এর দ্বারা স্ত্রী তালাক দিলে তা কার্যকর হয়।
আল্লামা ইবনে আবিদিন শামী (রহ.) লিখেন:
وَلَوْ فَوَّضَ الزَّوْجُ إِلَى امْرَأَتِهِ الطَّلَاقَ صَحَّ وَكَانَ بِيَدِهَا
"যদি স্বামী তার স্ত্রীর কাছে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করে, তবে তা সহীহ হবে এবং তালাক দেওয়ার অধিকার স্ত্রীর হাতে চলে যাবে।" — (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩০০)
ইমাম সারাখসী (রহ.) লিখেন:
التَّفْوِيضُ صَحِيحٌ عِنْدَنَا، وَإِذَا فَوَّضَ الرَّجُلُ إِلَى امْرَأَتِهِ الطَّلَاقَ فَطَلَّقَتْ نَفْسَهَا يَقَعُ الطَّلَاقُ
"আমাদের (হানাফি) মাযহাবে তাফবিজ (তালাকের ক্ষমতা অর্পণ) সহীহ। যখন স্বামী তার স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেয় এবং স্ত্রী নিজেকে তালাক দেয়, তখন তালাক পতিত হয়।" — (আল-মাবসূত, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৭০)