ওয়াসওয়াসা (شيطاني وسوسہ) কী? মনে আসা খারাপ চিন্তা কি ঈমান নষ্ট করে?
Waswasa-OCD · Hanafi
Question
Answer
উত্তর প্রদানে কর্তব্য:
প্রশ্নটি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এটি وسوسہ (ওয়াসওয়াসা) বা শয়তানের কুমন্ত্রণা সম্পর্কিত। শরীয়তে ওয়াসওয়াসা এমন চিন্তা বা ধারণাকে বলা হয়, যা বারবার মনে উদয় হয় এবং ব্যক্তি তা দূর করতে অক্ষম হয়। হাদীস শরীফে এসেছে:
"শয়তান তোমাদের কাছে এসে বলে, ‘কে তোমাকে সৃষ্টি করেছে? আল্লাহ।’ তারপর বলে, ‘আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে?’ সুতরাং তোমাদের কারো মনে এরূপ চিন্তা আসলে সে যেন বলে: ‘آمَنْتُ بِاللَّهِ’ (আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি)।”
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৩২৭৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৩৪)
হানাফী কিতাবের নির্দেশনা:
- রদ্দুল মুহতার (১/৬২০) গ্রন্থে বলা হয়েছে: “ওয়াসওয়াসা হলো শয়তানের প্ররোচনা, যা মানুষকে ইবাদত ও বিশ্বাসে সন্দেহ সৃষ্টি করে। এর প্রতিকার হলো তা উপেক্ষা করা এবং ‘আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম’ পাঠ করা।”
- ফাতাওয়া উসমানী (১/২১১) গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে: “ঈমান সংক্রান্ত ওয়াসওয়াসা কুফরী নয়, বরং তা শয়তানের কুমন্ত্রণা। সাহাবায়ে কিরামও এর শিকার হয়েছেন।”
আপনার অবস্থা বিশ্লেষণ:
আপনার বর্ণনায় বলা হয়েছে:
- মনে বিভিন্ন চিন্তা আসে (জায়েজ-নাজায়েজ, ইসলাম বিরোধী হতে পারে)।
- সেগুলো খারাপ লাগে বা লাগে না।
- তা দীর্ঘস্থায়ী হয়, চলে গেলেও ফিরে আসে।
এটি ওয়াসওয়াসা-র স্পষ্ট লক্ষণ। বিশেষ করে যখন কোনো ব্যক্তি নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বারবার এ ধরনের চিন্তায় আক্রান্ত হন, তখন তাকে মুছান্নাফ (وسواسی) বা ওয়াসওয়াসা রোগী বলা যেতে পারে। তবে শরীয়তের দৃষ্টিতে কেবল সেই ব্যক্তি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত, যে নিজের ইবাদত ও বিশ্বাসে অতিরিক্ত সন্দেহ পোষণ করে এবং তা থেকে মুক্তি পেতে অক্ষম হয়।
করণীয়:
- ওয়াসওয়াসা উপেক্ষা করুন: ইমাম নববী (রহ.) বলেছেন, “ওয়াসওয়াসা নিয়ে চিন্তা করলে তা বাড়ে; তাই তা গুরুত্ব দেবেন না।” (শরহে মুসলিম, ২/১৪৫)
- আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান:
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ (১) مَلِكِ النَّاسِ (২) إِلَٰهِ النَّاسِ (৩) مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ (৪)
(সূরা নাস, ১-৪) - ইবাদতে ধৈর্য ধারণ করুন: নফল ইবাদত বা কুরআন তিলাওয়াতের সময় এ চিন্তা এলে থামবেন না, বরং অব্যাহত রাখুন।
- আলিম বা মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নিন: চিন্তাগুলো যদি অত্যধিক মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া জরুরি।
মনে রাখবেন:
- ইমাম আহমদ রাম্মী (রহ.) বলেন: “ওয়াসওয়াসা ঈমানের পরিপূর্ণতার পরিচায়ক। কেননা শয়তান বিশ্বাসীকে লক্ষ্য করেই আক্রমণ করে।” (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৪৪)
- আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন: “ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বেশি বেশি পড়ুন।” (বাহেশতী জেওর, ২/১২২)
সারকথা:
আপনি ওয়াসওয়াসা রোগী কিনা তা বিচারের জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো পরীক্ষা করুন:
- চিন্তাগুলো কি আপনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আসে?
- এগুলো কি বারবার পুনরাবৃত্তি হয়?
- আপনি কি এগুলো দূর করতে অক্ষম?
যদি তিনটি শর্তই পূরণ হয়, তবে আপনি ওয়াসওয়াসায় আক্রান্ত। অন্যথায়, এগুলো সাধারণ শয়তানি প্ররোচনা, যা থেকে বাঁচতে উপরোক্ত আমল করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে হেফাজত করুন।