স্বামীর রাগের সময় বলা "একবারের জন্য পাঠিয়ে দেব" বাক্যটির দরুন কি তালাক পতিত হবে ?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
পরবর্তীতে এটা নিয়ে জিজ্ঞেস করলে উনি বলেন উনি এটা তালাকের নিয়তে বলেন নাই।আমি একবারে বাবার বাসায় ই থাকবো মানে আমাকে রাগ করে ঐখানেই রাখবেন এমন টা বুঝিয়েছেন।
এখন আমি নরমালি বাবার বাসায় বেড়াতে গেলে কি কোন সমস্যা হবে?আমি বুঝতে পারছি না কি করবো।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, আপনার স্বামী রাগের মাথায় বলেছেন, "যদি তুমি বাবার বাড়ি যাও, তাহলে আমি তোমাকে একবারের জন্য পাঠিয়ে দেব।" পরে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, তিনি এ কথা তালাকের নিয়তে বলেননি, বরং রাগ করে বোঝাতে চেয়েছেন যে, তিনি আপনাকে বাবার বাড়িতে থাকতে দেবেন না।
ফতোয়ার মূল নীতি: হানাফি মাযহাবের সুপ্রসিদ্ধ নীতি হলো, তালাকের শব্দ বা এমন শব্দ যা দ্বারা তালাক বোঝানো হয়, তা যদি রাগের সময় বলা হয় এবং পরবর্তীতে স্বামী দাবি করেন যে, তার তালাকের নিয়ত ছিল না, তাহলে সেক্ষেত্রে তার কথাই বিশ্বাস করা হবে, যদি না সে মিথ্যাবাদী হয়। তবে শর্ত হলো, বাক্যটি এমন হতে হবে যা দ্বারা তালাক স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না (কিনায়া শব্দ)।
আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান: আপনার স্বামীর উক্ত বাক্যটি ("একবারের জন্য পাঠিয়ে দেব") তালাকের স্পষ্ট (সরীহ) শব্দ নয়। এটি একটি অস্পষ্ট বা কিনায়া (Kinayah) ধরনের শব্দ। কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক কার্যকরী হওয়ার জন্য নিয়ত (Intention) শর্ত। যেহেতু আপনার স্বামী স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, তিনি তালাকের নিয়ত করেননি, তাই আইনগতভাবে (Fiqhi দৃষ্টিকোণ থেকে) কোনো তালাক পতিত হয়নি। আপনার বিবাহ বৈধ ও বহাল রয়েছে।
রাগের সময় তালাকের বিধান: হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, রাগের সময় উচ্চারিত তালাকও যদি স্পষ্ট শব্দে হয়, তবে তা পতিত হয়ে যায়। কিন্তু যেহেতু এখানে শব্দটি স্পষ্ট নয় এবং স্বামী নিয়ত অস্বীকার করেছেন, তাই তালাক পতিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
আপনার করণীয়: ১. যেহেতু তালাক পতিত হয়নি, তাই আপনি স্বাভাবিকভাবে বাবার বাড়িতে বেড়াতে যেতে পারবেন। তবে উত্তম হলো, স্বামীর অনুমতি নিয়ে এবং তার সন্তুষ্টি রেখে যাওয়া। ইসলামে স্ত্রীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া (প্রয়োজন ছাড়া) বের হওয়া অনুচিত। ২. আপনার স্বামী যে শর্তটি দিয়েছেন (একবারের জন্য পাঠিয়ে দেব) সেটি তালাকের শর্ত নয়, বরং এটি একটি হুমকি বা সতর্কবাণীস্বরূপ। যেহেতু তিনি নিজেই বলেছেন এটি তালাকের নিয়তে বলেননি, তাই এটি কোনো শর্ত হিসেবে গণ্য হবে না। ৩. ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝামেলা এড়াতে স্বামীর সাথে কথা বলে বিষয়টি পরিষ্কার করে নিন। প্রয়োজনে পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সমাধান করুন।
রেফারেন্স (হানাফি কিতাব):
- রদ্দুল মুহতার (ফতোয়ায়ে শামী): কিতাবুত তালাক-এ বলা হয়েছে, কিনায়া শব্দে তালাক কার্যকরী হওয়ার জন্য নিয়ত বা এমন অবস্থা প্রয়োজন যা থেকে নিয়ত স্পষ্ট বোঝা যায় (যেমন ঝগড়ার সময়)। তবে স্বামী যদি নিয়ত অস্বীকার করে এবং তার অবস্থা এমন না হয়, তাহলে তালাক পতিত হবে না। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৮৯)
- ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (আলমগীরি): বলা হয়েছে, রাগের সময় বলা তালাক যদি কিনায়া শব্দে হয় এবং নিয়ত না থাকে, তাহলে তা কার্যকরী হয় না। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ১/৩৭৩)
- ফতোয়ায়ে উসমানি: তালাকের কিনায়া শব্দে নিয়তের গুরুত্ব এবং নিয়ত না থাকলে তালাক না পতিত হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
উপসংহার: আপনার স্বামীর উক্ত বাক্যে তালাক পতিত হয়নি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। তবে বাবার বাড়ি যাওয়ার আগে স্বামীর সাথে নরমালি কথা বলে অনুমতি নিয়ে যাওয়াই শ্রেয় এবং ইসলামী আদব। আল্লাহ তাআলা আপনার সংসারে শান্তি বজায় রাখুন।