জিলহজ্জ মাস এর ১০ দিন পুরোটা দুরুদ ইব্রাহিম পড়া কেমন? বড় দুরুদ পড়ে হবে না ছোট দুরুদ?
Sunnah and Bid'ah · Shafei
Question
এই দুরুদ ইব্রাহিম নাকি ছোট দুরুদ নিয়ে মন সবসময়ই দ্বিধায় থাকে।
আমি সুন্নী বলে জানি
Answer
উত্তর
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين
প্রিয় প্রশ্নকারী,
আপনার প্রশ্নের জন্য আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। জিলহজ্জ মাসের প্রথম ১০ দিন অত্যন্ত বরকতময় ও ফজিলতপূর্ণ। এই দিনগুলোতে নফল ইবাদত, যিকির, দরূদ পাঠ ইত্যাদি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। দরূদ ইব্রাহীম (যা সালাতের তাশাহহুদে পড়া হয়) একটি শ্রেষ্ঠ দরূদ। এটি পাঠ করা সর্বাবস্থায় মুস্তাহাব (প্রশংসিত), বিশেষত এই বিশেষ দিনগুলোতে। নিচে শাফিঈ মাযহাবের কিতাব ও সহিহ হাদিসের আলোকে বিশদ উত্তর দেওয়া হলো।
১. জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিনের ফজিলত
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«مَا الْعَمَلُ فِي أَيَّامٍ أَفْضَلَ مِنْهَا فِي هَذِهِ»
অর্থ: “এই দিনগুলোর (জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিনের) তুলনায় অন্য কোনো দিনে আমল করা বেশি ফজিলতপূর্ণ নয়।”
(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৬৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৮)
সুতরাং এই দিনগুলোতে নফল ইবাদত, যিকির, দরূদ পাঠ ইত্যাদি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
২. দরূদ ইব্রাহীমের মর্যাদা
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
«إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا»
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরূদ পাঠান। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ পাঠাও এবং যথাযথভাবে সালাম জানাও।”
(সুরা আহযাব: ৫৬)
দরূদ ইব্রাহীম হলো সর্বাধিক পূর্ণাঙ্গ দরূদ। ইমাম শাফিঈ (রহ.)-এর “আল-উম্ম” গ্রন্থে এবং ইমাম নববি (রহ.)-এর “আল-মাজমূ’” গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, দরূদ ইব্রাহীম তাশাহুদে পাঠ করা সুন্নত। তবে সাধারণ যিকির ও নফল ইবাদতের জন্যও এটি সর্বোত্তম।
(আল-মাজমূ’, ৩/৪২২; মুগনি আল-মুহতাজ, ১/২১৮)
৩. ‘ছোট দরূদ’ ও ‘বড় দরূদ’ – বিভ্রান্তি নিরসন
আপনি “দরূদ ইব্রাহীম নাকি ছোট দরূদ” – এই দ্বিধার কথা উল্লেখ করেছেন। শাফিঈ মাযহাব অনুযায়ী, যে কোনো বৈধ দরূদ পাঠ করা জায়েজ। তবে দরূদ ইব্রাহীমকে অনেক আলিম “পূর্ণাঙ্গ দরূদ” বলে আখ্যা দিয়েছেন। কেউ কেউ একে ‘বড় দরূদ’ বললেও তা আকারে বড় নয় বরং অর্থের পূর্ণতার কারণে ‘বড়’ বলা হয়। ‘ছোট দরূদ’ বলতে বোঝানো হয় সংক্ষিপ্ত সংস্করণ যেমন: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ (আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ) – যা জায়েজ এবং সওয়াবের।
তবে দরূদ ইব্রাহীম (اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ…) হচ্ছে এমন একটি দরূদ যা সালাতে তাশাহহুদে পাঠ করা সুন্নত (মুআক্কাদা) এবং সাধারণ যিকিরের জন্যও সর্বোত্তম।
(মিনহাজ আল-তালিবিন, ইমাম নববি; তুহফাত আল-মুহতাজ, ইবনে হাজার আল-হায়তামি)
অতএব আপনি নিশ্চিন্তে দরূদ ইব্রাহীম পাঠ করতে পারেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
৪. জিলহজ্জের ১০ দিনে দরূদ ইব্রাহীম পাঠ করা – শাফিঈ ফিকহ
ইমাম নববি (রহ.) “আল-আযকার” গ্রন্থে বলেছেন:
“সারা বছর, বিশেষ করে জুমার দিন, মাগরিব ও ফজরের পর, এবং মসজিদে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় দরূদ পাঠ মুস্তাহাব। আর নিঃসন্দেহে জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিনও এই ফজিলতের মধ্যে শামিল।”
(আল-আযকার, অধ্যায়: দরূদের ফজিলত)
ইমাম রমলি (রহ.) “নিহায়াত আল-মুহতাজ” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:
“যিকির ও দরূদ পাঠের ক্ষেত্রে সময় বা স্থানের কোনো বাধা নেই। বরং যত বেশি সম্ভব পাঠ করা উত্তম। বিশেষ করে বরকতময় দিনগুলোর ক্ষেত্রে।”
(নিহায়াত আল-মুহতাজ, ১/৪৪৭)
সুতরাং এই ১০ দিন প্রচুর পরিমাণে দরূদ ইব্রাহীম ও অন্যান্য দরূদ পাঠ করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
৫. সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ
- জিলহজ্জের প্রথম ১০ দিন যিকির, দরূদ ও নফল ইবাদতের জন্য শ্রেষ্ঠ দিন।
- দরূদ ইব্রাহীম পূর্ণাঙ্গ ও উত্তম দরূদ। আপনি তা পাঠ করতে পারেন।
- ছোট বা বড় দরূদ – উভয়ই জায়েজ। তবে দরূদ ইব্রাহীম পাঠ করলে বেশি সওয়াবের আশা করা যায়।
- চিত্তের দ্বিধা দূর করতে সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিস এবং শাফিঈ ফকিহদের মতামত উপরে দেওয়া হয়েছে। আপনি নিশ্চিন্তে আমল করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার আমল কবুল করুন এবং দ্বিধা দূর করে দিন। আমীন।