বিবাহের কুফূর মানদণ্ড
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
বংশ মরজাদা - এইটা কেমন? যে ছেলের ফ্যামিলি র সবার সাথে বাবা - চাচা মামা এদের৷ পজিশন এর সাথে মেয়েএ ফ্যামিলির মিলতে হবে?
আবার মেয়েএ বাবা সরকারি চাকরি করলে ছেলের ও কি সেইম হতে হবে? বা ছেলের পরিবার এর অন্যদের অবিস্থান ও মিলতে হবে?
আর আর্থিক সক্ষমতা এইটা কিসের উপর নির্ভর করে?
Answer
বিয়ের কুফূ (কাফু) সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন: বিয়ের কুফূ (সমকক্ষতা) সম্পর্কে জানতে চাই। বর্তমান সময়ের আলোকে উদাহরণসহ জানতে চাই যে, বংশ-মর্যাদা কেমন হতে হবে? ছেলের পরিবারের সবার (বাবা-চাচা-মামা) অবস্থানের সাথে মেয়ের পরিবারের মিলতে হবে কি? মেয়ের বাবা সরকারি চাকরি করলে ছেলেরও কি তাই হতে হবে? আর্থিক সক্ষমতা কিসের উপর নির্ভর করে?
কুফূ (کفؤ) এর সংজ্ঞা ও গুরুত্ব
কুফূ অর্থ সমকক্ষতা বা সামঞ্জস্য। ইসলামি পরিভাষায়, বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর মধ্যে যে সামঞ্জস্য থাকা আবশ্যক বলে শরিয়ত নির্ধারণ করেছে, তাকে কুফূ বলে। এটি বিবাহের শুদ্ধতার জন্য শর্ত নয়, বরং বিবাহের স্থায়িত্ব ও সুখময় জীবনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে:
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَأَنْكِحُوهُ" "যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আসে যার দ্বীন ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তবে তাকে বিবাহ দাও।" (তিরমিজি: ১০৮৪)
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ" "হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে সম্মানিত那人 যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।" (সূরা হুজুরাত: ১৩)
হানাফি মাযহাবে কুফূ এর বিবেচ্য বিষয়সমূহ
হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ অনুযায়ী, কুফূ (সমকক্ষতা) নিম্নলিখিত বিষয়গুলোতে বিবেচনা করা হয়:
১. নসব (বংশ) - النسب
২. দ্বীন (ধর্মপরায়ণতা) - الدين
৩. হুররিয়াত (স্বাধীনতা) - الحرية (বর্তমানে প্রযোজ্য নয়)
৪. শিল্প/পেশা - الصناعة
৫. বিত্ত/আর্থিক সক্ষমতা - المال
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) -এর মতে, কুফূ বিবেচনায় নিম্নলিখিত বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ:
- বংশ (কুরাইশ, আরব, অনারব)
- ইসলাম (মুসলিম হওয়া)
- পেশা
- দীনদারি
- বিত্ত
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) -এর মতে, উপরোক্ত বিষয়গুলোর সাথে সাথে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোও বিবেচ্য:
- পিতার ইসলাম গ্রহণের সময় (পুরাতন মুসলিম বনাম নতুন মুসলিম)
ইমাম তহাবী (রহঃ) বলেন, কুফূ বিবেচনায় শুধু দ্বীনদারিই মূল বিবেচ্য বিষয়।
বংশ (নসব) সম্পর্কে বিস্তারিত
রদ্দুল মুহতার (শামী) -এ উল্লেখ আছে:
"الكفاءة في النسب معتبرة عند أبي حنيفة، فيكون القرشي كفؤًا للقرشية، والعربي كفؤًا للعربية، وهكذا" "ইমাম আবু হানিফার মতে বংশে সমকক্ষতা বিবেচ্য। কুরাইশ পুরুষ কুরাইশ নারীর জন্য সমকক্ষ, আরব পুরুষ আরব নারীর জন্য সমকক্ষ।"
আল-হিদায়া -তে বলা হয়েছে:
"وأما الكفاءة في النسب فشرطها أن لا يكون الرجل أدنى نسبًا من المرأة" "বংশে সমকক্ষতার শর্ত হলো, পুরুষের বংশ মেয়ের বংশের চেয়ে নিকৃষ্ট না হওয়া।"
বংশ মর্যাদার বাস্তব প্রয়োগ:
বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বংশ মর্যাদার অর্থ এই নয় যে, ছেলের পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের (বাবা-চাচা-মামা) অবস্থান মেয়ের পরিবারের সবার সাথে হুবহু মিলতে হবে। বরং এর অর্থ হলো:
- ছেলের পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান মেয়ের চেয়ে কম না হওয়া
- ছেলের বংশ মর্যাদা মেয়ের বংশ মর্যাদার সমান বা উত্তম হওয়া
- ছেলের পরিবার সমাজে সম্মানিত ও সুনামধন্য হওয়া
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহঃ) -এর মতে, বংশ মর্যাদার ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো পারিবারিক সুনাম ও সমাজে গ্রহণযোগ্যতা। কোনো নির্দিষ্ট পেশা বা চাকরি বংশ মর্যাদার মানদণ্ড নয়।
পেশা ও চাকরির ক্ষেত্রে কুফূ
ফতোয়া আলমগীরী -তে উল্লেখ আছে:
"وأما الكفاءة في الصناعة فتراعى عند أبي حنيفة، فيكون التاجر كفؤًا للتاجرة، والفلاح كفؤًا للفلاحة" "ইমাম আবু হানিফার মতে পেশায় সমকক্ষতা বিবেচ্য। ব্যবসায়ী ব্যবসায়ীর মেয়ের জন্য সমকক্ষ, কৃষক কৃষকের মেয়ের জন্য সমকক্ষ।"
তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) -এর মতে, পেশায় সমকক্ষতা বিবেচ্য নয়। তাদের মতে, পেশাগত পার্থক্য কুফূ-এর অন্তরায় নয়।
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) -এর মতে, বর্তমান যুগে পেশার ভিত্তিতে কুফূ নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ পেশা পরিবর্তনশীল। আজকে যে পেশা উচ্চ মর্যাদার মনে হয়, কালকে তা পরিবর্তন হতে পারে। তাই পেশার চেয়ে দ্বীনদারি ও চারিত্রিক গুণাবলি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মেয়ের বাবা সরকারি চাকরি করলে ছেলেরও কি সরকারি চাকরি করতে হবে?
উত্তর: না, মেয়ের বাবা সরকারি চাকরি করলে ছেলেরও সরকারি চাকরি করা জরুরি নয়। কুফূ-এর ক্ষেত্রে পাত্রের নিজের পেশা ও আয়ের উৎস বিবেচনা করা হয়, পাত্রের বাবার পেশা নয়। আর পাত্রের পেশা যদি বৈধ ও সম্মানজনক হয় এবং সে যদি মেয়ের ভরণপোষণের সামর্থ্য রাখে, তবে তা যথেষ্ট।
ইমদাদুল ফতোয়া -তে উল্লেখ আছে:
"کفؤ میں اصل چیز یہ ہے کہ لڑکا لڑکی کے قابل ہو، نہ کہ لڑکے کے گھر والے لڑکی کے گھر والوں کے برابر ہوں" "কুফূ-এর মূল বিষয় হলো ছেলে মেয়ের উপযুক্ত হওয়া, ছেলের পরিবার মেয়ের পরিবারের সমান হওয়া নয়।"
আর্থিক সক্ষমতা (مال) সম্পর্কে
রদ্দুল মুহতার -এ বলা হয়েছে:
"وأما الكفاءة في المال فشرطها أن يكون الرجل قادرًا على أداء المهر والنفقة" "আর্থিক সমকক্ষতার শর্ত হলো, পুরুষ মোহর আদায় ও ভরণপোষণের সামর্থ্য রাখে।"
আর্থিক সক্ষমতা কিসের উপর নির্ভর করে?
১. মোহর আদায়ের সামর্থ্য: পাত্রের পক্ষে মোহর আদায় করা সম্ভব কিনা ২. ভরণপোষণের সামর্থ্য: স্ত্রীর ভরণপোষণের (খাওয়া, বস্ত্র, বাসস্থান) খরচ বহন করতে সক্ষম কিনা ৩. স্থির আয়: পাত্রের একটি স্থির ও বৈধ আয়ের উৎস আছে কিনা
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন, আর্থিক সক্ষমতার অর্থ এই নয় যে, পাত্র ধনী হতে হবে। বরং তার একটি বৈধ উপার্জনের ব্যবস্থা থাকতে হবে যার মাধ্যমে সে স্ত্রীর ভরণপোষণ ও মোহর আদায় করতে সক্ষম। তবে হ্যাঁ, মেয়ের পক্ষ থেকে যদি আর্থিক দাবি থাকে, তবে তা পাত্রের সামর্থ্যের মধ্যে হওয়া উচিত।
বংশ মরজাদা - বাস্তব উদাহরণ
প্রশ্নকারীর প্রশ্নের প্রেক্ষিতে উদাহরণ:
ধরুন, মেয়ের বাবা একজন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (যেমন: যুগ্ম সচিব) এবং তার পরিবার সমাজে সম্মানিত। এখন ছেলের বাবা যদি একজন সফল ব্যবসায়ী হন এবং পরিবার সমাজে সম্মানিত হয়, তবে ছেলের বাবা সরকারি চাকরি না করলেও বংশ মর্যাদার দিক থেকে কুফূ বজায় থাকবে। কারণ:
- উভয় পরিবারই সমাজে সম্মানিত
- উভয় পরিবারের আর্থিক অবস্থা প্রায় সমান
- উভয় পরিবারই ধর্মপরায়ণ
কিন্তু যদি মেয়ের বাবা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হন এবং ছেলের বাবা একজন দিনমজুর হন, তবে বংশ মর্যাদার দিক থেকে কুফূ নেই বলে গণ্য হবে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ছেলের বাবা-চাচা-মামা সবার অবস্থান মেয়ের পরিবারের সবার সাথে মিলতে হবে—এমন কোনো শর্ত ইসলামে নেই। বরং ছেলের নিজের যোগ্যতা ও তার পরিবারের সামগ্রিক অবস্থান বিবেচনা করা হয়।
দ্বীনদারি (دین) - সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্বীনদারি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ" "নারীর সাথে বিবাহ চারটি বিষয়ের জন্য করা হয়: তার সম্পদের জন্য, তার বংশের জন্য, তার সৌন্দর্যের জন্য এবং তার দ্বীনদারির জন্য। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার হাত ধুলাময় হোক।" (বুখারি: ৫০৯০, মুসলিম: ১৪৬৬)
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহঃ) -এর মতে, দ্বীনদারি হলো প্রকৃত কুফূ। বংশ, পেশা, সম্পদ—এগুলো গৌণ বিষয়। যদি পাত্র দ্বীনদার ও সচ্চরিত্রবান হয়, তবে বংশ বা পেশার ছোটখাটো পার্থক্য কুফূ-এর অন্তরায় নয়।
বর্তমান যুগে কুফূ নির্ধারণের নীতিমালা
মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) -এর আলোকে বর্তমান যুগে কুফূ নির্ধারণের নীতিমালা:
১. দ্বীনদারি: পাত্র ও পাত্রী উভয়ের দ্বীনদারি ও চারিত্রিক গুণাবলি—এটিই প্রধান মানদণ্ড ২. পারিবারিক সুনাম: উভয় পরিবারের সামাজিক অবস্থান ও সুনাম ৩. শিক্ষাগত যোগ্যতা: পাত্রের শিক্ষাগত যোগ্যতা পাত্রীর চেয়ে কম না হওয়া ৪. আর্থিক সামর্থ্য: পাত্রের মোহর আদায় ও ভরণপোষণের সামর্থ্য ৫. বৈবাহিক জীবনের উপযুক্ততা: পাত্র পাত্রীর সাথে জীবনযাপনে সক্ষম
গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা
১. কুফূ বিবাহ শুদ্ধ হওয়ার শর্ত নয়: কোনো কারণে কুফূ না থাকলেও বিবাহ শুদ্ধ হবে। তবে অভিভাবকদের উচিত কুফূ বিবেচনা করা।
২. সর্বসম্মত মত: চার ইমামের মতে, দ্বীনদারি কুফূ-এর একটি শর্ত। দ্বীনদার ছেলে দীনদার মেয়ের জন্য সমকক্ষ।
৩. অভিভাবকের সম্মতি: মেয়ের অভিভাবক যদি কুফূ না থাকা সত্ত্বেও বিবাহে সম্মতি দেন, তবে বিবাহ শুদ্ধ হবে।
৪. মেয়ের ইচ্ছা: প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে নিজের ইচ্ছায় কুফূ না থাকা সত্ত্বেও বিবাহ করতে পারে, তবে অভিভাবকের পরামর্শ নেওয়া উত্তম।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
১. বংশ মরজাদা কেমন হতে হবে? বংশ মরজাদার অর্থ এই নয় যে, ছেলের পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের (বাবা-চাচা-মামা) অবস্থান মেয়ের পরিবারের সবার সাথে মিলতে হবে। বরং ছেলের পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান মেয়ের চেয়ে কম না হওয়াই যথেষ্ট। উভয় পরিবার সমাজে সম্মানিত ও সুনামধন্য হলে বংশ মরজাদা পূরণ হয়েছে বলে ধরা হবে।
২. মেয়ের বাবা সরকারি চাকরি করলে ছেলেরও কি সরকারি চাকরি করতে হবে? না, একান্তই প্রয়োজন নেই। ছেলের পেশা বৈধ ও সম্মানজনক হলে এবং সে মেয়ের ভরণপোষণের সামর্থ্য রাখলে তা যথেষ্ট। পেশার ভিত্তিতে কুফূ নির্ধারণ করা বর্তমান যুগে প্রাসঙ্গিক নয়।
৩. আর্থিক সক্ষমতা কিসের উপর নির্ভর করে? আর্থিক সক্ষমতা নির্ভর করে পাত্রের মোহর আদায়ের সামর্থ্য ও স্ত্রীর ভরণপোষণের (খাওয়া, বস্ত্র, বাসস্থান) খরচ বহনের সামর্থ্যের উপর। পাত্র ধনী হওয়া জরুরি নয়, তবে তার একটি স্থির ও বৈধ আয়ের উৎস থাকা প্রয়োজন।
৪. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্বীনদারি ও চারিত্রিক গুণাবলি। বংশ, পেশা, সম্পদ—এগুলো গৌণ বিষয়। দ্বীনদার ও সচ্চরিত্রবান পাত্রই উত্তম পাত্র।
والله أعلم بالصواب