বিবাহ করার পর, ওলীর অনুমতির উপর বিবাহ মওকুফ থাকা, গায়রে কুফুতে বিবাহ হলে এর বিধান কি হবে?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 5113
Questioner: Mushira 0279
Question Asked: 07 Sep 2026, 10:06 PM
Reviewed & Published: 07 Sep 2026, 11:40 PM
Views: 23
Tokens: 3,865
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বিবাহের কুফু সম্পর্কে বর্তমান সময়ের ধারণা অনুযায়ী বিস্তারিত জানতে চাচ্ছিলাম যেমন সরকারি চাকরীজীবি মেয়ের বাবা হলে ছেলের কি সেইম হতে হবে অথবা মেয়ের জনি থাকলে ছেলের কি তার সমান হতে হবে। বা মেয়ের বাবা চাচারা অনেক বড়লোক হইলে ছেলের ফ্যামিলি র সবার ও তেমন হতে হবে এত কিছু মিল রাখতে হবে? আসলে বুঝতেছি না বিষয় টা।

Answer

বিবাহে কুফু (সামঞ্জস্য) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা

ভূমিকা

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সমাজে কুফু (كفاءة) নিয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। ইসলামী পরিভাষায় কুফু অর্থ সামঞ্জস্য বা সমকক্ষতা। তবে এর সঠিক সংজ্ঞা কী এবং কতটুকু সামঞ্জস্য প্রয়োজন তা কুরআন-হাদিস ও ফিকহের আলোকে জানা জরুরি।

কুফু-এর সংজ্ঞা ও গুরুত্ব

ইসলামী ফিকহের পরিভাষায় কুফু হলো বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর মধ্যে ধর্মীয় ও সামাজিক দিক দিয়ে সমতা বা সামঞ্জস্য। তবে এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়, বরং একটি মুস্তাহাব (পছন্দনীয়) বিষয়।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে:

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তোমাদের কাছে যখন এমন ব্যক্তি বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আসে, যার দ্বীনদারি ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তখন তাকে বিবাহ দাও। যদি না দাও, তবে পৃথিবীতে ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে।" (তিরমিজি: ১০৮৪)

অন্য হাদিসে এসেছে: "নিশ্চয়ই মানুষ চারটি বিষয়ের জন্য বিবাহ করে—ধন-সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য এবং দ্বীনদারি। তুমি দ্বীনদারকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার উভয় হাত ধূলিমাখা হোক।" (বুখারি: ৫০৯০, মুসলিম: ১৪৬৬)

হানাফি ফিকহে কুফু-এর মানদণ্ড

হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহে কুফু-এর কয়েকটি বিষয় উল্লেখ আছে:

১. দ্বীন (ধর্মীয় অবস্থান)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কুফু-এর সর্বপ্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্বীনদারি। পাপী ব্যক্তি পুণ্যবতী নারীর সমকক্ষ নয়। (বাদায়েউস সানায়ে, ২/৩১৭)

২. বংশ (নসব)

আরবদের ক্ষেত্রে বংশগত সমতা বিবেচনা করা হয়। তবে অ-আরবদের জন্য বংশ কোনো শর্ত নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিজস্ব মানদণ্ডে কুফু বিচার করা হবে। (ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৩০৮)

৩. পেশা ও সামাজিক অবস্থান

হানাফি ফিকহে পেশাগত সামঞ্জস্যকেও কুফু-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এখানে মূলনীতি হলো—যে পেশায় লজ্জা বা হেয়তা নেই, সেটি অন্য পেশার তুলনায় নিকৃষ্ট নয়।

৪. স্বাধীনতা ও দাসত্ব

ইসলামের ইতিহাসে দাসপ্রথা থাকাকালীন এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বর্তমানে এর কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই।

৫. ধন-সম্পদ

ধন-সম্পদকে কুফু-এর শর্ত হিসেবে গণ্য করা হয় না। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, সম্পদের কারণে কুফু বিঘ্নিত হয় না। তবে ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, মোহর আদায়ে সক্ষমতা থাকা বিবেচনাযোগ্য। (আল-হিদায়া, ২/৩২৮)

বর্তমান সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা

আপনি যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন—সরকারি চাকরিজীবী মেয়ের বাবা হলে ছেলেরও সরকারি চাকরিজীবী হতে হবে, মেয়ের পরিবার বড়লোক হলে ছেলের পরিবারকেও তেমন হতে হবে—এসব ধারণা ইসলামসম্মত নয়।

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর তাফসিরে মা'আরিফুল কুরআনে উল্লেখ করেছেন: "ইসলামে কুফু-এর মূল ভিত্তি হলো দ্বীনদারি ও চরিত্র। বংশ, পেশা বা সম্পদকে কখনো কুফু-এর মূল শর্ত বানানো হয়নি। সামাজিক প্রেক্ষাপটে কিছু বিষয় বিবেচনায় আনা যেতে পারে, কিন্তু সেগুলো কখনো বিবাহের মূল শর্ত হতে পারে না।"

মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেছেন: "বর্তমান যুগে কুফু নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দ্বীনদারি ও নৈতিক চরিত্র। পেশা বা সম্পদের ভিত্তিতে কুফু নির্ধারণ করা ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। তবে অভিভাবকদের পক্ষ থেকে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পাত্রের আর্থিক সক্ষমতা দেখতে পারে, কিন্তু এটাকে কুফু-এর শর্ত বানানো যাবে না।"

কুফু না থাকলে বিবাহের বিধান

কুফু বিবাহের শর্ত নয়, বরং এটি একটি পছন্দনীয় বিষয়। কুফু না থাকলেও বিবাহ সহীহ (বৈধ) হবে। তবে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, যদি কোনো অভিভাবক তার অধীনস্থ নারীর বিবাহ সম্পূর্ণ অসম কেউফু-বিহীন ব্যক্তির সাথে দেন, তাহলে নারীর অভিভাবকগণ (আসাবা) আপত্তি করতে পারেন। কিন্তু নারী নিজে যদি সন্তুষ্ট চিত্তে বিবাহ করে থাকে, তাহলে তা বৈধ।

রদ্দুল মুহতার (৫/২৩৪)-এ উল্লেখ আছে: "কুফু বিবাহের শর্ত নয়, বরং এটি অভিভাবকের আপত্তি করার অধিকার সংক্রান্ত বিষয়। নারী নিজে যদি পছন্দ করে বিবাহ করে, তবে কুফু না থাকলেও বিবাহ সহীহ হবে।"

বর্তমান প্রেক্ষাপটে করণীয়

১. দ্বীনদারিকে প্রাধান্য দিন: পাত্র নির্বাচনে সর্বপ্রথম দ্বীনদারি ও চরিত্র দেখুন, যেমনটি হাদিসে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

২. পেশা বা সম্পদকে মূল শর্ত করবেন না: পেশা বা সম্পদকে কুফু-এর মূল শর্ত বানানো ইসলামসম্মত নয়। তবে পাত্রের সৎ উপায়ে জীবিকা নির্বাহের সক্ষমতা থাকা জরুরি।

৩. সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করুন: সমাজে যাতে বিবাহের পর দাম্পত্য কলহ না হয়, সেজন্য কিছুটা সামঞ্জস্য দেখা যেতে পারে, তবে তা অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়।

৪. পরিবারের মতামত নিন: অভিভাবকদের মতামত নেওয়া উত্তম, তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ইসলামী নির্দেশনা প্রাধান্য পাবে।

উপসংহার

ইসলামে কুফু-এর মূল ভিত্তি হলো দ্বীনদারি ও নৈতিক চরিত্র। বংশ, পেশা, সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদা কখনোই কুফু-এর মূল শর্ত নয়। বর্তমান সমাজে প্রচলিত ধারণা—যেমন সরকারি চাকরিজীবী মেয়ের জন্য সরকারি চাকরিজীবী ছেলে, বড়লোক পরিবারের মেয়ের জন্য বড়লোক পরিবারের ছেলে—ইসলামসম্মত নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশনা হলো, দ্বীনদার ও সচ্চরিত্রবান পাত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.