বিবাহ করার পর, ওলীর অনুমতির উপর বিবাহ মওকুফ থাকা, গায়রে কুফুতে বিবাহ হলে এর বিধান কি হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
একজন বালিগ ও সুস্থ-বুদ্ধিসম্পন্ন নারী ওলির অনুমতি ছাড়া একজন পুরুষকে নিকাহ করেছেন। নিকাহর অন্যান্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হয়েছে এবং নিকাহ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু পাত্রটি মেয়ের জন্য শরিয়তসম্মত ‘কুফু’ নয়। এ অবস্থায় হানাফি ফিকহ অনুযায়ী নিকাহটি ওলির অনুমতির ওপর ‘মওকুফ’ থাকবে—এমন কথা জানতে পেরেছি।
এখন প্রশ্ন হলো:
১. যদি মেয়ের ওলি এই নিকাহের অনুমতি না দেন, তাহলে নিকাহের চূড়ান্ত হুকুম কী হবে? নিকাহ কি বাতিল/ফাসখ হয়ে যাবে?
২. ওলি অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত, বা যদি ওলী না জেনে থাকে বিয়ের বিষয়। তখন ওই নারী ও পুরুষ যদি নিজেদের স্বামী-স্ত্রী মনে করে একসঙ্গে অনেকদিন বসবাস করে এবং তাদের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক হয়ে থাকে, সেই সম্পর্কের শরয়ি হুকুম কী?
৩. পরবর্তীতে যদি ওলি নিকাহের অনুমতি না দেন এবং নিকাহটি বাতিল/ফাসখ হয়ে যায়, তাহলে নিকাহ বাতিল হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের মধ্যে যে দাম্পত্য সম্পর্ক হয়েছে, সেটাকে কি বৈধ দাম্পত্য সম্পর্ক হিসেবে গণ্য করা হবে, নাকি অবৈধ সম্পর্ক হিসেবে গণ্য হবে?
৪. কুফুর হিসাব টা কিসের ভিত্তিতে হবে শুধুমাত্র সামাজিক স্ট্যাটাস? বাবার পজিশন ইত্যাদি। বাবা মা যদি মনে করেন কুফু মিলে না তাহলে কি মিলবে না? নাকি এর কোন সীমারেখা আছে?
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল। হানাফি ফিকহের আলোকে আমরা ধাপে ধাপে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।
প্রশ্ন ১: ওলি অনুমতি না দিলে নিকাহের চূড়ান্ত হুকুম কী? হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী, বালিগ (প্রাপ্তবয়স্ক) ও সুস্থ-বুদ্ধিসম্পন্ন নারীর নিজের নিকাহ করার অধিকার রয়েছে। তবে যদি সে তার সমকক্ষ (কুফু) নয় এমন পুরুষের সাথে নিকাহ করে, তাহলে সেই নিকাহ মওকুফ (স্থগিত) থাকবে। অর্থাৎ, নিকাহটি তখনই কার্যকরী হবে যখন ওলি (অভিভাবক) তা অনুমোদন করবেন।
যদি ওলি এই নিকাহে অনুমতি না দেন, তাহলে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, কাজি (বিচারক) এই নিকাহ ভেঙে দিতে পারবেন (ফাসখ)। তবে নিকাহটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে না; বরং কাজির রায়ের মাধ্যমে তা ফাসখ (বিচ্ছেদ) হতে হবে। যদি কাজির কাছে যাওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মতে, ওলির অস্বীকৃতির কারণে নিকাহটি বাতিল বলে গণ্য হবে এবং তাদের আলাদা হয়ে যাওয়া আবশ্যক। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩০০)
প্রশ্ন ২ ও ৩: ওলির অজ্ঞতায় বা অনুমতির আগে দাম্পত্য সম্পর্কের শরয়ি হুকুম কী? যেহেতু নিকাহটি মওকুফ ছিল, তাই ওলির অনুমতির আগ পর্যন্ত বা ফাসখের আগ পর্যন্ত এই সম্পর্কটি একটি সন্দেহজনক (শুবহা) সম্পর্ক হিসেবে গণ্য হবে।
- যদি ওলি পরে অনুমতি দেন, তাহলে নিকাহটি শুরু থেকেই (আগের দিনগুলো থেকেই) বৈধ বলে গণ্য হবে এবং তাদের দাম্পত্য জীবন বৈধ হবে।
- যদি ওলি অনুমতি না দেন এবং নিকাহটি ফাসখ হয়ে যায়, তাহলে ফাসখের আগ পর্যন্ত তাদের সম্পর্ক শুবহা (সন্দেহজনক) ছিল বলে গণ্য হবে। এই সময়ে তাদের সন্তান-সন্ততি থাকলে তারা বৈধ সন্তান হিসেবে গণ্য হবে এবং বংশগতভাবে পিতার সাথে যুক্ত হবে। তবে এই সময়ে স্বামী স্ত্রীর উপর মাহর (দেনমোহর) আদায় করা আবশ্যক হবে। কারণ, শুবহার কারণে হাদ্দ (শারীরিক শাস্তি) প্রযোজ্য হবে না, তবে বৈধ নিকাহের মতোই মাহর ও বংশীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬; বাদায়েউস সানায়ে, ২/২৫৩)
প্রশ্ন ৪: কুফুর (সমকক্ষতার) ভিত্তি ও সীমারেখা কী? হানাফি ফিকহে কুফু (সমকক্ষতা) নির্ধারণের জন্য পাঁচটি বিষয়কে ভিত্তি ধরা হয়েছে। এগুলো হলো: ১. বংশ (নসব): পাত্রের বংশ মেয়ের বংশের সমকক্ষ হতে হবে। যেমন: কুরাইশ বংশের মেয়ের সাথে কুরাইশ বংশের ছেলে, আরবের সাথে আরব ইত্যাদি। ২. দ্বীন (ধর্মপরায়ণতা): পাত্র অবশ্যই ফাসিক (পাপাচারী) হবে না; তাকে দ্বীনদার ও আমলদার হতে হবে। ৩. পেশা (হিরফা): পাত্রের পেশা মেয়ের পরিবারের পেশার সাথে সাংঘর্ষিক বা নিকৃষ্ট হবে না। যেমন: কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ের সাথে রক্তমোছা-ময়লাবাহী পেশার লোকের বিয়ে কুফু নয়। ৪. স্বাধীনতা (হুররিয়াত): (বর্তমান যুগে দাস-দাসী না থাকায় এই শর্তটি প্রযোজ্য নয়)। ৫. আর্থিক সক্ষমতা (ইয়াসার): পাত্র মেয়ের মাহর (দেনমোহর) ও ভরণপোষণের জন্য আর্থিকভাবে সক্ষম হতে হবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩০২; রদ্দুল মুহতার, ৩/৯২)
মূলনীতি: কুফু শুধুমাত্র সামাজিক স্ট্যাটাস বা বাবার পজিশনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় না। বরং উপরোক্ত পাঁচটি বিষয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। তবে ধর্মপরায়ণতা (দ্বীনদারি) কে হানাফি ফিকহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি আসে যার দ্বীনদারি ও চরিত্র তোমরা পছন্দ করো, তখন তাকে বিয়ে করাও।" (তিরমিজি, হাদিস: ১০৮৪)
বাবা-মা মনে করলে কি কুফু মিলবে না? বাবা-মায়ের ধারণা চূড়ান্ত নয়। কুফু নির্ধারিত হবে শরিয়তের উল্লিখিত মানদণ্ডে, শুধুমাত্র বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত মতামত বা সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে নয়। যদি পাত্র দ্বীনদার, সচ্চরিত্রবান এবং উপরোক্ত মানদণ্ডে সমকক্ষ হয়, তাহলে বাবা-মায়ের অমত কুফু না হওয়ার কারণ হবে না। তবে শরিয়তের নির্ধারিত মানদণ্ডে (যেমন: বংশ, পেশা, দ্বীন) সত্যিই যদি অসমতা থাকে, তাহলে সেটি কুফুর ক্ষেত্রে বিবেচিত হবে।
আপনার ক্ষেত্রে করণীয়: যেহেতু পাত্রটি কুফু নয় বলে আপনি জানতে পেরেছেন, তাই এই নিকাহটি মওকুফ অবস্থায় আছে। উত্তম পন্থা হলো, মেয়ের ওলির সাথে কথা বলে বিষয়টি পরিষ্কার করা এবং তাদের সম্মতি নেওয়ার চেষ্টা করা। যদি ওলি দ্বীনদার ও সচ্চরিত্র পাত্র দেখে সম্মতি দেন, তাহলে নিকাহটি বৈধ হয়ে যাবে। আর যদি ওলি সম্পূর্ণ অমত থাকেন এবং পাত্র সত্যিই শরিয়তের মানদণ্ডে কুফু না হয়, তাহলে কাজির মাধ্যমে বা পারস্পরিক সম্মতিতে নিকাহটি ফাসখ (বিচ্ছেদ) করে দেওয়া উচিত। তবে মনে রাখবেন, নিকাহের পর তারা একসাথে থাকাকালীন সময়ে কোনো সন্তান হলে সেই সন্তান বৈধ হবে এবং তাদেরকে পৃথক হওয়ার আগ পর্যন্ত পূর্ণ মাহর আদায় করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা সর্বজ্ঞ। তিনি আপনাদের উভয়ের জন্য কল্যাণের তাওফিক দান করুন।