ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ের প্রস্তাব মূল্যায়ন, সৌন্দর্য বনাম দ্বীনদারিত্ব।

Family Life · Hanafi

Question No: 5035
Questioner: Haowa Akther
Question Asked: 05 Sep 2026, 09:09 PM
Reviewed & Published: 05 Sep 2026, 09:17 PM
Views: 12
Tokens: 13,641
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম, আপু অনেক বড় একটা সমস্যায় আছি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি তাই আপনার কাছে একটু পরামর্শ চাচ্ছি যদি আপনার মূল্যবান পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করতেন অনেক উপকৃত হইতাম,আমি জেনারেল লাইনে পড়ুয়া একজন মানুষ আল্লাহর অশেষ রহমতে দ্বীনের কিছুটা বুঝ পেয়েছি কখনো নফসের তাড়নায় পথ হারিয়ে ফেলি আবার কখনো সরল পথে আসি এভাবেই জীবন চলছে, তার উপর রয়েছে ওয়াসওয়াসা জনিত সমস্যা,তাই এক কঠিন মূহুর্তে জীবন যাচ্ছে মনে হচ্ছে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেছি না একটু সাহায্য করুন আপু, আমার বিয়ের কথা চলছে আমার পরিবার আমার প্রতি সাপোর্টিভ প্রথম থেকেই আমি চেয়েছি ছেলের দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দেওয়ার, এখন আমি অনেক চিকন এবং গায়ের রং শ্যামলা তো আমার পরিবারের লোকেরা বলতো ঠিক মতো খাওয়াদাওয়া করতে যাতে একটু স্বাস্থ্য হয় যাতে দেখতে আরেকটু সুন্দর লাগে কিন্তু আমার মনে ছিল আমি যেমন তেমনই যেন কেউ আমাকে পছন্দ করে তো, আমার মনে ছিল ভালো মানুষ তো কখনো বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে না তারা অন্তরের সৌন্দর্য দেখে কিন্তু আমার পরিবারের কথা ছিল আমার অন্তরের সৌন্দর্যের সাথে বাহিরের সৌন্দর্যেরও নাকি প্রয়োজন, তাই আমি সিদ্ধান্ত নিছিলাম কেউ দেখতে কিছুটা কম সুন্দর হলেও সে দ্বীনদার হলে তাকেই বিয়ে করবো। এখন কিছুদিন আগে আমার জন্য একটা প্রপোজাল আসছে ছেলে চট্টগ্রাম বন্দরে চাকরি করে সে আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ইন্টার পাশ করছে, ছেলেরা ৩ ভাই (বড় ২ ভাইও মনে হয় আলিয়া থেকেই পড়ছে) বড় ভাই আগে মসজিদে ইমামতি করতো এখন বিদেশ থাকে, মেজো ভাই ঢাকা কাজী অফিসে চাকরি করে।  আর ছেলের বোন ৩ জন, এর মধ্য এক বোনের বিয়ে বেশি ভালো জায়গায় হয়নাই বাকি ২ জনেরটা জানিনা,এখন আমরা ছেলের খবর নিয়ে জানতে পারছি তারা ৩ ভাই ভালো তবে মা নাকি একটু অন্যরকম মানে একজনের কথা আরেকজনের কাছে বলে, এখন এইটা শুনে মন একটু খারাপ হই গেছে, আর ছেলে যখন আমাকে দেখতে আসছিল আমি ছেলেকে জিজ্ঞেস করছিলাম সে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে কিনা, জামায়াতে সালাত আদায় করে কিনা, কুরআন সঠিকভাবে তিলাওয়াত করতে পারে কিনা, হালাল হারাম মেনে চলে কিনা, সুন্নাহ মেনে চলে কিনা এগুলোতো তার উত্তর পজিটিভই ছিল আমাকেও সে দ্বীন সম্পর্কিত প্রশ্নই করেছে যেটা আমার অনেক ভালোও লাগছিল , তারপর জিজ্ঞেস করছি দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো আলেমের সহবতে আছে কিনা বা অনেকে যে তাবলীগে যায় সে কি এর কিছু করে তো সে বলছে চাকরির জন্য সময় পায় না তবে বই পড়ার অভ্যাস আছে বই পড়ে,আর ছেলের বড় ভাইয়ের আলাদা ঘর আছে, মেঝো ভাই আর এই ছেলে বাবার ঘরে থাকে, ছেলে যেহেতু অবিবাহিত তাই চাকরি থেকে বাড়িতে আসলে ২ ভাইয়ের ঘরে মায়ের সাথে খাবার খায়, এখন ছেলে জায়গা কিনছে ঘর করবে কিন্তু বিয়ে করার পর মেঝো ভাইয়ের বউ আর তার বউ এক ঘরেই থাকবে,মেঝো ভাই থাকে ঢাকায়, আর ছেলে জানে আমি পরিপূর্ণ মাহরাম -ননমাহরাম মেনে চলি সে বলছে আমার পর্দার কোনো সমস্যা হবে না।এখন তার দ্বীনদারিতা নিয়ে আমি মোটামুটি সন্তুষ্ট তবে তাকে আমি যতটুকু দেখছি বাহ্যিক সৌন্দর্য একবারে বেশিও না আবার কমও না মধ্যম অবস্থায় আছে আরকি আবার আমার মা বলতেছে এতদিন যেই দ্বীনদারিতা খুঁজলি এখন তো তা পাইলি বাহ্যিক বেশী সৌন্দর্য দিয়ে কি করবি,এদিকে ছেলের মায়ের খবর পাইছি উনি একটু অন্যরকম ছেলের বাবা নাই,এখন আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারতেছিনা কি করবো, যেহেতু আগে থেকেই ছেলের দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলছে কিন্তু এখন আবার মনের মধ্যে একটা সংশয় যে যদি কখনো সৌন্দর্যের কারনে তাকে অবহেলা করি,আবার নিজেকে নিজেই বুঝাই দ্বীনদারিতাকেই তো প্রাধান্য দিব আমি কি কোনো ভাবে নফসের চাহিদাকে দ্বীনদারিতার চেয়ে বেশী প্রাধান্য দিচ্ছি আরো আছে ওয়াসওয়ার সমস্যা, ইস্তেখারা করতেছি কিন্তু মন কোনো দিকেই যাচ্ছে না,আমার কেমন জানি অদ্ভুত লাগতেছে, এখন কি করবো আপু আল্লাহর জন্য  আমাকে একটু পরামর্শ দিন।

Answer

বিয়ে সংক্রান্ত পরামর্শ

আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্তসার

আপনি একজন দ্বীনদার ভদ্রমহিলা, যিনি দ্বীনদার ছেলেকে বিয়ে করতে চান। একটি প্রস্তাব এসেছে যেখানে ছেলেটি দ্বীনদার, নামাজি, কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে, কিন্তু বাহ্যিক সৌন্দর্য মধ্যম পর্যায়ের। ছেলের মা সম্পর্কে কিছু নেতিবাচক খবর শুনেছেন। আপনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন এবং ইস্তেখারা করছেন কিন্তু মন স্থির হচ্ছে না।

শরীয়তের দৃষ্টিতে বিয়ের মূলনীতি

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

"تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ"

"নারীকে চারটি বিষয় দেখে বিয়ে করা হয়: তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার দ্বীন। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার হাত ধুলোমাখা হোক।" (সহীহ বুখারী: ৫০৯০, সহীহ মুসলিম: ১৪৬৬)

এই হাদীসটি যদিও নারী বিবাহের প্রসঙ্গে, তবে পুরুষ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.)在其 famous work "রাদ্দুল মুহতার" -এ উল্লেখ করেছেন যে, কুফু (সামঞ্জস্যতা) বিবেচনায় দ্বীনদারিত্বই প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত।

ছেলের দ্বীনদারিত্ব মূল্যায়ন

আপনি যে ছেলেটির কথা উল্লেখ করেছেন, তার সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে:

  1. সে আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ইন্টার পাশ করেছে
  2. ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে
  3. জামায়াতে সালাত আদায় করে
  4. কুরআন সঠিকভাবে তিলাওয়াত করতে পারে
  5. হালাল-হারাম মেনে চলে
  6. সুন্নাহ মেনে চলে
  7. বই পড়ার অভ্যাস আছে
  8. সে নিজেও দ্বীন সম্পর্কিত প্রশ্ন করেছে

এগুলো অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। তবে কিছু বিষয় খতিয়ে দেখা উচিত:

  • সে কোনো আলেমের সাহচর্যে আছে কিনা
  • তাবলীগের কার্যক্রমে অংশ নেয় কিনা
  • তার আখলাক ও চরিত্র কেমন

শাশুড়ির ব্যাপারে উদ্বেগ

ছেলের মা সম্পর্কে আপনি শুনেছেন যে তিনি "একটু অন্যরকম" - অর্থাৎ একজনের কথা আরেকজনের কাছে বলে থাকেন। এটি একটি উদ্বেগের বিষয়, তবে:

  1. এটি শুধু শোনা কথা - নিজে যাচাই করে দেখুন
  2. বিয়ের পর আপনি যদি আলাদা থাকার ব্যবস্থা হয়, তাহলে এই সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে
  3. ছেলে জায়গা কিনে ঘর করছে - অর্থাৎ ভবিষ্যতে আলাদা থাকার সম্ভাবনা আছে

মেজো ভাইয়ের স্ত্রীর সাথে এক ঘরে থাকা

এটি একটি বাস্তব সমস্যা। তবে:

  • মেজো ভাই ঢাকায় থাকেন, ফলে তার স্ত্রী হয়তো গ্রামে থাকবেন
  • ছেলে ঘর করছে, বিয়ের পর হয়তো কিছুদিনের মধ্যে আলাদা হয়ে যাবে
  • ইসলামী আদর্শে দুই ভাইয়ের স্ত্রী একই বাড়িতে থাকতে পারা বৈধ, তবে শর্ত হলো পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করা

সৌন্দর্য নিয়ে আপনার দ্বিধা

আপনি লিখেছেন ছেলেটির বাহ্যিক সৌন্দর্য "একবারে বেশিও না, আবার কমও না, মধ্যম অবস্থায় আছে"। এটি আসলে একটি ভালো অবস্থা। কারণ:

  1. ইসলাম সৌন্দর্যকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে না
  2. তবে দ্বীনদারিত্বকে প্রধান মানদণ্ড বানিয়েছে
  3. মধ্যম পর্যায়ের সৌন্দর্য নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা যেতে পারে

ইমাম আল-হাসান আল-বাসরী (রহ.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি দ্বীনদার নারীকে বিয়ে করে, সে তার দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ই পেয়ে যায়।"

ইস্তেখারা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ

ইস্তেখারা করার পর মন স্থির না হওয়া স্বাভাবিক। ইস্তেখারার অর্থ এই নয় যে, স্বপ্নে সরাসরি উত্তর পাওয়া যাবে। বরং ইস্তেখারা হলো আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা। এরপর যা ঘটে, তাতে কল্যাণই থাকে।

ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি ইস্তেখারা করে, সে ব্যর্থ হয় না।"

আমার পরামর্শ

  1. দ্বীনদারিত্বকে প্রাধান্য দিন: আপনি প্রথম থেকেই দ্বীনদার ছেলেকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এই ছেলেটি দ্বীনদার, নামাজি, কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে। এটি একটি বড় নেয়ামত।

  2. সৌন্দর্য নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করবেন না: মধ্যম পর্যায়ের সৌন্দর্য নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা যেতে পারে। বরং সুন্দর চেহারা নিয়ে বিয়ে করে পরে দ্বীনদার না হলে সেটাই বড় সমস্যা হবে।

  3. শাশুড়ির ব্যাপারে: বিয়ের আগে ছেলের সাথে এ বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করুন। তাকে জানান যে, আপনার পর্দা ও স্বাধীনতার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। ছেলেটি যদি আপনাকে সাপোর্ট করে, তাহলে সমস্যা সমাধান সম্ভব।

  4. আলাদা থাকার পরিকল্পনা: ছেলে জায়গা কিনছে, ঘর করছে। বিয়ের পর যত দ্রুত সম্ভব আলাদা থাকার চেষ্টা করুন। যদি কিছুদিন একসাথে থাকতে হয়, তাহলে ধৈর্য ধরুন।

  5. ইস্তেখারা চালিয়ে যান: ইস্তেখারা করা ভালো। তবে মনে রাখবেন, ইস্তেখারার পরও যদি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাহলে আল্লাহর উপর ভরসা রেখে সিদ্ধান্ত নিন। আল্লাহ বলেন: "যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক: ৩)

  6. পরামর্শ নিন: আপনার পরিবারের সাথে আলোচনা করুন। তারা আপনার প্রতি সাপোর্টিভ। তাদের মতামত নিন।

একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

"إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَأَنْكِحُوهُ، إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ"

"যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তখন তাকে বিয়ে করিয়ে দাও। যদি তা না করো, তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা ও বিস্তর ফাসাদ সৃষ্টি হবে।" (সুনানে তিরমিজি: ১০৮৪, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৯৬৭)

সর্বশেষ পরামর্শ

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, ছেলেটি দ্বীনদার, নামাজি, কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে, হালাল-হারাম মেনে চলে। এটি একটি ভালো প্রস্তাব। সৌন্দর্য মধ্যম পর্যায়ের হলেও তা সমস্যা নয়। শাশুড়ির ব্যাপারে শোনা কথা নিয়ে বেশি চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে সতর্ক থাকা জরুরি।

আল্লাহর কাছে ইস্তেখারা করুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন। মনে রাখবেন, নিখুঁত মানুষ এই দুনিয়ায় নেই। দ্বীনদারিত্ব ও সচ্চরিত্রই স্থায়ী সম্পদ।

আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.