ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ের প্রস্তাব মূল্যায়ন, সৌন্দর্য বনাম দ্বীনদারিত্ব।
Family Life · Hanafi
Question
Answer
বিয়ে সংক্রান্ত পরামর্শ
আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্তসার
আপনি একজন দ্বীনদার ভদ্রমহিলা, যিনি দ্বীনদার ছেলেকে বিয়ে করতে চান। একটি প্রস্তাব এসেছে যেখানে ছেলেটি দ্বীনদার, নামাজি, কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে, কিন্তু বাহ্যিক সৌন্দর্য মধ্যম পর্যায়ের। ছেলের মা সম্পর্কে কিছু নেতিবাচক খবর শুনেছেন। আপনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন এবং ইস্তেখারা করছেন কিন্তু মন স্থির হচ্ছে না।
শরীয়তের দৃষ্টিতে বিয়ের মূলনীতি
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ: لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَلِجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ"
"নারীকে চারটি বিষয় দেখে বিয়ে করা হয়: তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার দ্বীন। তুমি দ্বীনদার নারীকে অগ্রাধিকার দাও, তোমার হাত ধুলোমাখা হোক।" (সহীহ বুখারী: ৫০৯০, সহীহ মুসলিম: ১৪৬৬)
এই হাদীসটি যদিও নারী বিবাহের প্রসঙ্গে, তবে পুরুষ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.)在其 famous work "রাদ্দুল মুহতার" -এ উল্লেখ করেছেন যে, কুফু (সামঞ্জস্যতা) বিবেচনায় দ্বীনদারিত্বই প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত।
ছেলের দ্বীনদারিত্ব মূল্যায়ন
আপনি যে ছেলেটির কথা উল্লেখ করেছেন, তার সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে:
- সে আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ইন্টার পাশ করেছে
- ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে
- জামায়াতে সালাত আদায় করে
- কুরআন সঠিকভাবে তিলাওয়াত করতে পারে
- হালাল-হারাম মেনে চলে
- সুন্নাহ মেনে চলে
- বই পড়ার অভ্যাস আছে
- সে নিজেও দ্বীন সম্পর্কিত প্রশ্ন করেছে
এগুলো অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। তবে কিছু বিষয় খতিয়ে দেখা উচিত:
- সে কোনো আলেমের সাহচর্যে আছে কিনা
- তাবলীগের কার্যক্রমে অংশ নেয় কিনা
- তার আখলাক ও চরিত্র কেমন
শাশুড়ির ব্যাপারে উদ্বেগ
ছেলের মা সম্পর্কে আপনি শুনেছেন যে তিনি "একটু অন্যরকম" - অর্থাৎ একজনের কথা আরেকজনের কাছে বলে থাকেন। এটি একটি উদ্বেগের বিষয়, তবে:
- এটি শুধু শোনা কথা - নিজে যাচাই করে দেখুন
- বিয়ের পর আপনি যদি আলাদা থাকার ব্যবস্থা হয়, তাহলে এই সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে
- ছেলে জায়গা কিনে ঘর করছে - অর্থাৎ ভবিষ্যতে আলাদা থাকার সম্ভাবনা আছে
মেজো ভাইয়ের স্ত্রীর সাথে এক ঘরে থাকা
এটি একটি বাস্তব সমস্যা। তবে:
- মেজো ভাই ঢাকায় থাকেন, ফলে তার স্ত্রী হয়তো গ্রামে থাকবেন
- ছেলে ঘর করছে, বিয়ের পর হয়তো কিছুদিনের মধ্যে আলাদা হয়ে যাবে
- ইসলামী আদর্শে দুই ভাইয়ের স্ত্রী একই বাড়িতে থাকতে পারা বৈধ, তবে শর্ত হলো পর্দা ও শালীনতা রক্ষা করা
সৌন্দর্য নিয়ে আপনার দ্বিধা
আপনি লিখেছেন ছেলেটির বাহ্যিক সৌন্দর্য "একবারে বেশিও না, আবার কমও না, মধ্যম অবস্থায় আছে"। এটি আসলে একটি ভালো অবস্থা। কারণ:
- ইসলাম সৌন্দর্যকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে না
- তবে দ্বীনদারিত্বকে প্রধান মানদণ্ড বানিয়েছে
- মধ্যম পর্যায়ের সৌন্দর্য নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা যেতে পারে
ইমাম আল-হাসান আল-বাসরী (রহ.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি দ্বীনদার নারীকে বিয়ে করে, সে তার দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ই পেয়ে যায়।"
ইস্তেখারা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ
ইস্তেখারা করার পর মন স্থির না হওয়া স্বাভাবিক। ইস্তেখারার অর্থ এই নয় যে, স্বপ্নে সরাসরি উত্তর পাওয়া যাবে। বরং ইস্তেখারা হলো আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা। এরপর যা ঘটে, তাতে কল্যাণই থাকে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি ইস্তেখারা করে, সে ব্যর্থ হয় না।"
আমার পরামর্শ
-
দ্বীনদারিত্বকে প্রাধান্য দিন: আপনি প্রথম থেকেই দ্বীনদার ছেলেকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এই ছেলেটি দ্বীনদার, নামাজি, কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে। এটি একটি বড় নেয়ামত।
-
সৌন্দর্য নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করবেন না: মধ্যম পর্যায়ের সৌন্দর্য নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা যেতে পারে। বরং সুন্দর চেহারা নিয়ে বিয়ে করে পরে দ্বীনদার না হলে সেটাই বড় সমস্যা হবে।
-
শাশুড়ির ব্যাপারে: বিয়ের আগে ছেলের সাথে এ বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করুন। তাকে জানান যে, আপনার পর্দা ও স্বাধীনতার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। ছেলেটি যদি আপনাকে সাপোর্ট করে, তাহলে সমস্যা সমাধান সম্ভব।
-
আলাদা থাকার পরিকল্পনা: ছেলে জায়গা কিনছে, ঘর করছে। বিয়ের পর যত দ্রুত সম্ভব আলাদা থাকার চেষ্টা করুন। যদি কিছুদিন একসাথে থাকতে হয়, তাহলে ধৈর্য ধরুন।
-
ইস্তেখারা চালিয়ে যান: ইস্তেখারা করা ভালো। তবে মনে রাখবেন, ইস্তেখারার পরও যদি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাহলে আল্লাহর উপর ভরসা রেখে সিদ্ধান্ত নিন। আল্লাহ বলেন: "যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা আত-তালাক: ৩)
-
পরামর্শ নিন: আপনার পরিবারের সাথে আলোচনা করুন। তারা আপনার প্রতি সাপোর্টিভ। তাদের মতামত নিন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَأَنْكِحُوهُ، إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ"
"যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তখন তাকে বিয়ে করিয়ে দাও। যদি তা না করো, তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা ও বিস্তর ফাসাদ সৃষ্টি হবে।" (সুনানে তিরমিজি: ১০৮৪, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৯৬৭)
সর্বশেষ পরামর্শ
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, ছেলেটি দ্বীনদার, নামাজি, কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে, হালাল-হারাম মেনে চলে। এটি একটি ভালো প্রস্তাব। সৌন্দর্য মধ্যম পর্যায়ের হলেও তা সমস্যা নয়। শাশুড়ির ব্যাপারে শোনা কথা নিয়ে বেশি চিন্তিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে সতর্ক থাকা জরুরি।
আল্লাহর কাছে ইস্তেখারা করুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন। মনে রাখবেন, নিখুঁত মানুষ এই দুনিয়ায় নেই। দ্বীনদারিত্ব ও সচ্চরিত্রই স্থায়ী সম্পদ।
আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।