বিয়ে প্রসঙ্গে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন?

Family Life · Hanafi

Question No: 5033
Questioner: Haowa Akther
Question Asked: 05 Sep 2026, 08:38 PM
Reviewed & Published: 05 Sep 2026, 09:12 PM
Views: 26
Tokens: 14,152
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,আমি অনেক বড় একটা সমস্যায় আছি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি তাই আপনার কাছে একটু পরামর্শ চাচ্ছি যদি আপনার মূল্যবান পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করতেন অনেক উপকৃত হইতাম,আমি জেনারেল লাইনে পড়ুয়া একজন মানুষ আল্লাহর অশেষ রহমতে দ্বীনের কিছুটা বুঝ পেয়েছি কখনো নফসের তাড়নায় পথ হারিয়ে ফেলি আবার কখনো সরল পথে আসি এভাবেই জীবন চলছে, তার উপর রয়েছে ওয়াসওয়াসা জনিত সমস্যা,তাই এক কঠিন মূহুর্তে জীবন যাচ্ছে মনে হচ্ছে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেছি না একটু সাহায্য করুন আপু, আমার বিয়ের কথা চলছে আমার পরিবার আমার প্রতি সাপোর্টিভ প্রথম থেকেই আমি চেয়েছি ছেলের দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দেওয়ার, এখন আমি অনেক চিকন এবং গায়ের রং শ্যামলা তো আমার পরিবারের লোকেরা বলতো ঠিক মতো খাওয়াদাওয়া করতে যাতে একটু স্বাস্থ্য হয় যাতে দেখতে আরেকটু সুন্দর লাগে কিন্তু আমার মনে ছিল আমি যেমন তেমনই যেন কেউ আমাকে পছন্দ করে তো, আমার মনে ছিল ভালো মানুষ তো কখনো বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে না তারা অন্তরের সৌন্দর্য দেখে কিন্তু আমার পরিবারের কথা ছিল আমার অন্তরের সৌন্দর্যের সাথে বাহিরের সৌন্দর্যেরও নাকি প্রয়োজন, তাই আমি সিদ্ধান্ত নিছিলাম কেউ দেখতে কিছুটা কম সুন্দর হলেও সে দ্বীনদার হলে তাকেই বিয়ে করবো। এখন কিছুদিন আগে আমার জন্য একটা প্রপোজাল আসছে ছেলে চট্টগ্রাম বন্দরে চাকরি করে সে আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ইন্টার পাশ করছে, ছেলেরা ৩ ভাই (বড় ২ ভাইও মনে হয় আলিয়া থেকেই পড়ছে) বড় ভাই আগে মসজিদে ইমামতি করতো এখন বিদেশ থাকে, মেজো ভাই ঢাকা কাজী অফিসে চাকরি করে।  আর ছেলের বোন ৩ জন, এর মধ্য এক বোনের বিয়ে বেশি ভালো জায়গায় হয়নাই বাকি ২ জনেরটা জানিনা,এখন আমরা ছেলের খবর নিয়ে জানতে পারছি তারা ৩ ভাই ভালো তবে মা নাকি একটু অন্যরকম মানে একজনের কথা আরেকজনের কাছে বলে, এখন এইটা শুনে মন একটু খারাপ হই গেছে, আর ছেলে যখন আমাকে দেখতে আসছিল আমি ছেলেকে জিজ্ঞেস করছিলাম সে ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে কিনা, জামায়াতে সালাত আদায় করে কিনা, কুরআন সঠিকভাবে তিলাওয়াত করতে পারে কিনা, হালাল হারাম মেনে চলে কিনা, সুন্নাহ মেনে চলে কিনা এগুলোতো তার উত্তর পজিটিভই ছিল আমাকেও সে দ্বীন সম্পর্কিত প্রশ্নই করেছে যেটা আমার অনেক ভালোও লাগছিল , তারপর জিজ্ঞেস করছি দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো আলেমের সহবতে আছে কিনা বা অনেকে যে তাবলীগে যায় সে কি এর কিছু করে তো সে বলছে চাকরির জন্য সময় পায় না তবে বই পড়ার অভ্যাস আছে বই পড়ে,আর ছেলের বড় ভাইয়ের আলাদা ঘর আছে, মেঝো ভাই আর এই ছেলে বাবার ঘরে থাকে, ছেলে যেহেতু অবিবাহিত তাই চাকরি থেকে বাড়িতে আসলে ২ ভাইয়ের ঘরে মায়ের সাথে খাবার খায়, এখন ছেলে জায়গা কিনছে ঘর করবে কিন্তু বিয়ে করার পর মেঝো ভাইয়ের বউ আর তার বউ এক ঘরেই থাকবে,মেঝো ভাই থাকে ঢাকায়, আর ছেলে জানে আমি পরিপূর্ণ মাহরাম -ননমাহরাম মেনে চলি সে বলছে আমার পর্দার কোনো সমস্যা হবে না।এখন তার দ্বীনদারিতা ও চারিত্রিক গুনাবলি নিয়ে আমি সন্তুষ্ট তবে তাকে আমি যতটুকু দেখছি বাহ্যিক সৌন্দর্য একবারে বেশিও না আবার কমও না মধ্যম অবস্থায় আছে আরকি আবার আমার মা বলতেছে এতদিন যেই দ্বীনদারিতা খুঁজলি এখন তো তা পাইলি বাহ্যিক বেশী সৌন্দর্য দিয়ে কি করবি,এদিকে ছেলের মায়ের খবর পাইছি উনি একটু অন্যরকম ছেলের বাবা নাই তবে ছেলের সমন্ধে সবাই ভালো বলছে যে সে ধার্মিক এবং আচার ব্যবহাও ভালো।এখন আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারতেছিনা কি করবো, যেহেতু আগে থেকেই ছেলের দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলছি কিন্তু এখন আবার মনের মধ্যে একটা সংশয় যে যদি কখনো সৌন্দর্যের কারনে তাকে অবহেলা করি,আবার নিজেকে নিজেই বুঝাই দ্বীনদারিতাকেই তো প্রাধান্য দিব আমি কি কোনো ভাবে নফসের চাহিদাকে দ্বীনদারিতার চেয়ে বেশী প্রাধান্য দিচ্ছি আরো আছে ওয়াসওয়ার সমস্যা, ইস্তেখারা করতেছি কিন্তু মন কোনো দিকেই যাচ্ছে না,আমার কেমন জানি অদ্ভুত লাগতেছে, এখন কি করবো আপু আল্লাহর জন্য  আমাকে একটু পরামর্শ দিন।

Answer

বিয়ে প্রসঙ্গে পরামর্শ


ভূমিকা

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আপনার দীর্ঘ প্রশ্নটি মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। আপনি বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন—এটি খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। ইসলামে বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পরামর্শ ও ইস্তেখারা করা উচিত। আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমরা কয়েকটি মূল বিষয় আলোচনা করব।


১. দ্বীনদারিতাকে প্রাধান্য দেওয়ার গুরুত্ব

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"যখন তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে, যার দ্বীনদারি ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তখন তাকে বিয়ে করিয়ে দাও। যদি তা না করো, তবে পৃথিবীতে ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়বে।"
(সুনানে তিরমিজি: ১০৮৪, সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৯৬৭)

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বিয়ের ক্ষেত্রে দ্বীনদারি ও চরিত্রই প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত। বাহ্যিক সৌন্দর্য গৌণ বিষয়।


২. সৌন্দর্যের গুরুত্ব

ইসলাম সৌন্দর্যকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেনি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"নারীকে চারটি বিষয়ের জন্য বিয়ে করা হয়: তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার দ্বীনদারি। তুমি দ্বীনদার নারীকে বেছে নাও, তবেই তুমি সফল হবে।"
(সহিহ বুখারি: ৫০৯০, সহিহ মুসলিম: ১৪৬৬)

তবে লক্ষণীয়—এই হাদিসে দ্বীনদারিকে সবার উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। সৌন্দর্য একটি কাম্য বিষয়, কিন্তু তা কখনো দ্বীনদারির বিকল্প হতে পারে না।


৩. আপনার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ

আপনি যা বর্ণনা করেছেন তাতে দেখা যাচ্ছে:

  • ছেলেটি দ্বীনদার, নামাজি, কুরআন তিলাওয়াত করতে পারে, হালাল-হারাম মেনে চলে
  • সে আলিয়া মাদ্রাসা থেকে পড়াশোনা করেছে
  • তার চরিত্র সম্পর্কে সবাই ভালো বলছে
  • সে চাকরিজীবী এবং নিজের ঘর করার চেষ্টা করছে
  • তার বাহ্যিক সৌন্দর্য মধ্যম পর্যায়ের

আপনার সংশয়: বাহ্যিক সৌন্দর্য কম হওয়ার কারণে তাকে অবহেলা করার ভয়।


৪. ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)-এর দৃষ্টিভঙ্গি

ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) বলেছেন:

"বিয়ের ক্ষেত্রে দ্বীনদারি ও সচ্চরিত্রতাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কারণ, দ্বীনদার স্বামী স্ত্রীর হক আদায় করবে এবং তাকে ভালো রাখবে।"

(আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ)


৫. শাশুড়ির ব্যাপারে আপনার উদ্বেগ

আপনি উল্লেখ করেছেন যে, ছেলের মা "একটু অন্যরকম"—অর্থাৎ তিনি একজনের কথা আরেকজনের কাছে বলে থাকেন। এটি একটি উদ্বেগের বিষয়, তবে:

১. ছেলেটি যদি দ্বীনদার হয়, তবে সে তার মাকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে
২. ইসলামে শাশুড়ি-বউয়ের সম্পর্ক নিয়ে অনেক নির্দেশনা রয়েছে
৩. আপনি যদি পর্দা মেনে চলেন এবং সীমার মধ্যে থাকেন, তবে এই সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব
৪. ছেলেটি নিজে জায়গা কিনে আলাদা ঘর করার চেষ্টা করছে—এটি ইতিবাচক


৬. ইস্তেখারার ব্যাপারে আপনার অবস্থা

আপনি বলেছেন ইস্তেখারা করছেন কিন্তু মন কোনো দিকেই যাচ্ছে না। ইস্তেখারা সম্পর্কে মনে রাখবেন:

১. ইস্তেখারা করার অর্থ এই নয় যে, স্বপ্নে বা মনে কোনো বিশেষ ইঙ্গিত পাবেন
২. ইস্তেখারার উদ্দেশ্য হলো—আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা
৩. ইস্তেখারার পর সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অন্তর যেদিকে ঝোঁকে বা যেটি যুক্তিসঙ্গত মনে হয়, সেটিই গ্রহণ করা উচিত
৪. ইস্তেখারার পরও যদি মনে কোনো দিকনির্দেশনা না পান, তবে পরামর্শশীলদের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া জায়েয

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহঃ) বলেছেন: "ইস্তেখারা হলো আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা। এর অর্থ এই নয় যে, স্বপ্নে কিছু দেখতে হবে। বরং অন্তর যেদিকে ঝোঁকে বা যেটি ভালো মনে হয়, সেটিই করা উচিত।"
(রাদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৭)


৭. ওয়াসওয়াসা (সন্দেহপ্রবণতা) মোকাবিলা

আপনি ওয়াসওয়াসার সমস্যার কথাও উল্লেখ করেছেন। শয়তান মানুষকে সিদ্ধান্তহীনতায় ফেলতে চায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

"শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়।"
(সূরা আল-বাকারা: ২৬৮)

ওয়াসওয়াসা দূর করার উপায়:

  • আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা
  • আউযুবিল্লাহ পড়া
  • দ্বীনি আলেমদের সাথে পরামর্শ করা
  • সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পিছনে না তাকানো

৮. আপনার জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, ছেলেটির মধ্যে দ্বীনদারি ও চরিত্রের ভালো গুণাবলি রয়েছে। তার সম্পর্কে সবাই ভালো বলছে। সে নিজে চেষ্টা করছে ঘর করার। তার বাহ্যিক সৌন্দর্য মধ্যম পর্যায়ের—এটি কোনো বড় সমস্যা নয়।

আমার পরামর্শ:

১. দ্বীনদারিকেই প্রাধান্য দিন — আপনি প্রথম থেকেই এই নীতি মেনে চলেছেন, এটি সঠিক
২. বাহ্যিক সৌন্দর্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেবেন না — স্থায়ী সম্পর্কের ভিত্তি দ্বীনদারি ও চরিত্র
৩. শাশুড়ির ব্যাপারে — ছেলেটির সাথে খোলাখুলি আলোচনা করুন, সে কীভাবে এই বিষয়টি ম্যানেজ করবে
৪. ইস্তেখারা চালিয়ে যান — তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অন্তরের প্রবণতা ও যুক্তি ব্যবহার করুন
৫. পরামর্শ নিন — আপনার পরিবার ও দ্বীনি আলেমদের সাথে পরামর্শ করুন
৬. নামাজে দোয়া করুন — সিজদায় আল্লাহর কাছে হেদায়াত প্রার্থনা করুন


৯. একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"দুনিয়া হলো সাময়িক উপকরণ, আর দুনিয়ার মধ্যে সর্বোত্তম উপকরণ হলো সৎকর্মপরায়ণা স্ত্রী।"
(সহিহ মুসলিম: ১৪৬৭)

এছাড়াও বলেছেন:

"তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।"
(সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫)


১০. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, ছেলেটি দ্বীনদার, চরিত্রবান, চাকরিজীবী এবং নিজের সংসার করার চেষ্টা করছে। তার সম্পর্কে সবাই ভালো বলছে। আপনার দ্বিধা মূলত বাহ্যিক সৌন্দর্য ও শাশুড়ির আচরণ নিয়ে।

মনে রাখবেন: নিখুঁত মানুষ কেউ নেই। প্রতিটি পরিবারে কিছু না কিছু সমস্যা থাকে। গুরুত্বপূর্ণ হলো—ছেলেটির দ্বীনদারি ও চরিত্র যদি ভালো হয়, তবে সে আপনার হক আদায় করবে এবং আপনাকে সম্মান করবে।

ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেছেন: "যে ব্যক্তি দ্বীনদার, তার সাথে জীবনযাপন করা সহজ। কারণ, দ্বীনদার ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে অন্যায় করে না।"


উপসংহার

আপনার উচিত:

  1. দ্বীনদারি ও চরিত্রকে প্রাধান্য দেওয়া—যা আপনি প্রথম থেকেই করে আসছেন
  2. বাহ্যিক সৌন্দর্যকে গৌণ বিষয় হিসেবে দেখা
  3. ইস্তেখারা ও পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া
  4. আল্লাহর উপর ভরসা করা

আল্লাহ তায়ালা আপনার জন্য যা কল্যাণকর তা সহজ করে দিন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.