প্রকাশ্য কুফুরি সমর্থন এর বিধান কি?
Faith and Belief · Hanafi
Question
কুরআন-হাদিসে শিরক ও কুফরির ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর সতর্কতা এসেছে। তাই কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি জেনে-বুঝে প্রকাশ্যে কুফরি কাজে লিপ্ত হয় এবং তওবা না করে সেই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাহলে তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।
পৃথিবীর জীবন শেষ হয়ে গেলে আর তওবা করে ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না। কুফরি অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীর জন্য আখিরাতে রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি এবং জাহান্নামের কঠিন পরিণতি। তাই বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
অন্যদিকে একজন মুসলিম গুনাহগার হলেও, যদি সে শিরক ও কুফর থেকে বেঁচে থাকে এবং ঈমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে তার ব্যাপারে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার দরজা রয়েছে। আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। এমনকি শাস্তি হলেও, ঈমান থাকলে আল্লাহর রহমতে শেষ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশের আশা থাকে।
কিন্তু যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম দাবি করেও প্রকাশ্যে কুফরি কাজে লিপ্ত থাকে এবং তওবা না করে সেই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তার জন্য বিষয়টি অত্যন্ত ভয়াবহ। মৃত্যুর পর আর ফিরে এসে তওবা করার কোনো সুযোগ থাকবে না।
তাই সময় থাকতে নিজের ঈমান ও আমল যাচাই করুন। মুসলিম হয়ে প্রকাশ্যে কোনো কুফরি কাজে জড়িয়ে থাকলে আজই তা পরিত্যাগ করুন, আন্তরিকভাবে তওবা করুন এবং একমাত্র আল্লাহর কাছেই ইবাদত করুন। মৃত্যুর আগে ফিরে আসার সুযোগ আছে—মৃত্যুর পরে আর সেই সুযোগ থাকবে না।"
Answer
উত্তর
প্রশ্নকারী একটি সতর্কবাণী মূলক লেখা ফেসবুকে দেওয়ার ইচ্ছা করেছেন এবং জানতে চেয়েছেন লেখাটি শরীয়তসম্মতভাবে সঠিক কিনা। লেখাটি পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে যে, এর মূল বিষয়বস্তু সঠিক এবং ইসলামী আকীদা-বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে কিছু ক্ষেত্রে পরিভাষাগত সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
লেখাটির বিশ্লেষণ
লেখায় যে বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে:
১. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য ইবাদত করা শিরক - এটি সম্পূর্ণ সঠিক। আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কিছুর ইবাদত করে যা তাদের কোনো ক্ষতি বা উপকার করতে পারে না এবং বলে, এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী।" (সূরা ইউনুস: ১৮)
২. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে সেজদা করা - এটি শিরক। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) সহ সকল আলেমের মতে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য সেজদা করা হারাম এবং শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
৩. কুফরি কাজকে প্রকাশ্যে সমর্থন করা - এটি সঠিক। রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে, কুফরি কাজে সন্তুষ্ট থাকা বা সমর্থন করা কুফরির অন্তর্ভুক্ত। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে—তা যদি অন্তর দিয়ে সমর্থন ও সন্তুষ্টি হয়। কেবল নিরুপায় হয়ে বা ভয়ের কারণে কিছু বলা বা করা ভিন্ন বিষয়।
৪. তওবা না করে কুফরি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে পরিণতি ভয়াবহ - এটি সঠিক। আল্লাহ তাআলা বলেন: "নিশ্চয় যারা ঈমান আনার পর কুফরি করে, অতঃপর কুফরিই বৃদ্ধি পায়, তাদের তওবা কবুল করা হবে না।" (সূরা আলে ইমরান: ৯০)
৫. গুনাহগার মুসলিমের জন্য আল্লাহর রহমতের আশা - এটি সঠিক। আল্লাহ তাআলা বলেন: "নিশ্চয় আল্লাহ তার সাথে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না, তবে এর চেয়ে ছোট যা আছে তা যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন।" (সূরা নিসা: ৪৮)
যেসব বিষয়ে সতর্কতা প্রয়োজন
লেখাটি মূলত সঠিক, তবে কিছু বিষয়ে পরিভাষাগত সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত:
১. "প্রকাশ্যে কুফরি কাজে লিপ্ত হওয়া" - এখানে স্পষ্ট করা দরকার যে, কুফরি কাজ বলতে কী বোঝানো হয়েছে। ইসলামী পরিভাষায় কুফরি কাজ হলো এমন কাজ যা স্বয়ং কুফর বা শিরক হিসেবে গণ্য, যেমন: আল্লাহ ছাড়া অন্যকে সেজদা করা, কুরআন-হাদিসকে অবমাননা করা, ইসলামের কোনো অপরিহার্য বিষয়কে অস্বীকার করা ইত্যাদি। সাধারণ গুনাহ (যেমন: মিথ্যা বলা, চুরি করা) কুফরি কাজ নয়।
২. "রাজনৈতিক কারণ হলেও অন্য ধর্মের অনুষ্ঠিত কুফরি কাজকে প্রকাশ্যে সমর্থন করা" - এখানে সতর্কতা প্রয়োজন। অন্য ধর্মের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ বা সমর্থন করা সবসময় কুফর নয়। যদি কেউ তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে তাদের ধর্মকে সত্য বলে মেনে নেয়, তবে তা কুফর। কিন্তু কেবল সামাজিক বা রাজনৈতিক কারণে তাদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা বা শুভেচ্ছা জানানো, যদি তাতে তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ বা সমর্থন না থাকে, তবে তা কুফর নয়। তবে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকাই উত্তম। (ফাতাওয়া উসমানী, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৫০)
৩. তকফিরের (কাউকে কাফির বলার) ব্যাপারে সতর্কতা - লেখায় সাধারণভাবে বলা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে কাফির বলার আগে অত্যন্ত সতর্কতা প্রয়োজন। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর নীতি হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তির কুফরি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত না হয় এবং তার উপর কোনো শরয়ী অজুহাত না থাকে, ততক্ষণ তাকে কাফির বলা যাবে না।
সংশোধিত প্রস্তাবিত লেখা
উপরোক্ত বিশ্লেষণের আলোকে লেখাটি নিম্নরূপে সংশোধন করা যেতে পারে:
শিরক ও কুফর থেকে সাবধানতা: ঈমান রক্ষার গুরুত্ব
মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বোঝা জরুরি—ইসলামে আল্লাহর জন্য নির্ধারিত ইবাদত অন্য কারও উদ্দেশ্যে করা অত্যন্ত ভয়াবহ বিষয়। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে সেজদা করা, আল্লাহর ইবাদতের কোনো অংশ অন্যের জন্য উৎসর্গ করা, অথবা অন্য ধর্মের এমন কোনো কাজকে অন্তর দিয়ে সমর্থন করা যা স্পষ্টতই কুফরি ও শিরক—এসব কুফরি ও শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
কুরআন-হাদিসে শিরক ও কুফরির ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর সতর্কতা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: "নিশ্চয় আল্লাহ তার সাথে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না, তবে এর চেয়ে ছোট যা আছে তা যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন।" (সূরা নিসা: ৪৮) তাই কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি জেনে-বুঝে এমন কাজে লিপ্ত হয় যা স্পষ্টতই কুফরি বা শিরক এবং তওবা না করে সেই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তাহলে তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।
পৃথিবীর জীবন শেষ হয়ে গেলে আর তওবা করে ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না। কুফরি অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীর জন্য আখিরাতে রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি এবং জাহান্নামের কঠিন পরিণতি। তাই বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
অন্যদিকে একজন মুসলিম গুনাহগার হলেও, যদি সে শিরক ও কুফর থেকে বেঁচে থাকে এবং ঈমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করে, তাহলে তার ব্যাপারে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার দরজা রয়েছে। আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন। এমনকি শাস্তি হলেও, ঈমান থাকলে আল্লাহর রহমতে শেষ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশের আশা থাকে।
কিন্তু যে ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম দাবি করেও জেনে-বুঝে এমন কাজে লিপ্ত থাকে যা স্পষ্টতই কুফরি বা শিরক এবং তওবা না করে সেই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তার জন্য বিষয়টি অত্যন্ত ভয়াবহ। মৃত্যুর পর আর ফিরে এসে তওবা করার কোনো সুযোগ থাকবে না।
তাই সময় থাকতে নিজের ঈমান ও আমল যাচাই করুন। মুসলিম হয়ে জেনে-বুঝে কোনো কুফরি বা শিরকের কাজে জড়িয়ে থাকলে আজই তা পরিত্যাগ করুন, আন্তরিকভাবে তওবা করুন এবং একমাত্র আল্লাহর কাছেই ইবাদত করুন। মৃত্যুর আগে ফিরে আসার সুযোগ আছে—মৃত্যুর পরে আর সেই সুযোগ থাকবে না।
গুরুত্বপূর্ণ নোট
১. লেখাটি সাধারণ সতর্কবাণী হিসেবে দেওয়া যেতে পারে, তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে লেখা হলে অত্যন্ত সতর্কতা প্রয়োজন।
২. ইসলামে তকফির (কাউকে কাফির বলা) অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যদি কোনো ব্যক্তি তার ভাইকে কাফির বলে, তবে তাদের মধ্যে একজন অবশ্যই কুফরিতে ফিরে যাবে।" (সহীহ বুখারী: ৬১০৩)
৩. লেখায় "প্রকাশ্যে কুফরি কাজে লিপ্ত" বলতে সেসব কাজ বোঝানো হয়েছে যা ইসলামী পরিভাষায় স্পষ্টতই কুফরি বা শিরক হিসেবে গণ্য, যেমন: আল্লাহ ছাড়া অন্যকে সেজদা করা, ইসলামের কোনো অপরিহার্য বিষয়কে অস্বীকার করা, কুরআন-হাদিসকে অবমাননা করা ইত্যাদি।