শশুড়বাড়ী লোকজন অত্যাচার করলে এবং স্বামী কিছু না বললে উল্টো আকর্ষণ না থাকার কথা বললে করণীয় কি?
Family Life · Ahle Hadith / Salafi
Question
আমার বিয়ে হয় ১.৫ বছর আগে । বিয়ের দিন থেকে আমার শাশুড় বাড়ির লোকজন আমাকে দেখতে পারেনা। আমি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করি এবং ময়মনসিংহে হলে থাকতাম, এই দেড় বছরে শশুড় বাড়িতে ছুটি পেলে যেতাম,শশুর বাড়ি গাজীপুর এবং আমার স্বামী জব করে গাজীপুরে।
শুরু থেকে বিয়ের প্রথম রাত থেকে আমার শুশুর বাড়ির মানুষ আমাকে দেখতে পারেনা,তারপর দিনের পর দিন খেতে দিতনা, গালাগালি করত, ছোট করে কথা বলত, বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলত কিন্তু আমার স্বামী প্রচন্ড বাবা মা ভক্ত হওয়ায় আমার প্রতি অন্যায় দেখেও চুপ করে থাকত। গতবছর নভেম্বরে স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি নিজে জোর করে সংসার বাঁচানোর জন্য বাচ্ছা নেই, এবং এই কথা শুশুড় বাড়ির কাউকে সাড়ে ৪ মাস পর্যন্ত বলিনি। গত ইদে আমার স্বামী আমাকে শুশুর বাড়ি নিয়ে গেলে এবং তারা যখন জানতে পারে আমার পেটে বাচ্ছা তখন থেকে অত্যাচার আরও বেড়ে যায় এবং তারা জানার ১৫ দিনের মধ্যে আমার ৫ মাসের বাচ্ছা মিসক্যারেজ হয়ে যায় এবং কিছুদিন পরেই আমাকে শুশুর বাড়ি থেকে বের করে দেয়। তারপরেও আমার স্বামী তার মা বাবাকে কিছুই বলেনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটা কথাও বলেনি। এখন আমি বাবার বাড়িতে আছি। কুরবানির ঈদের স্বামী তার বাবা মার সাথেই ঈদ করবে এবং সে আমাকে জানিয়ে দিয়েছে তার আমার প্রতি কোন আকর্ষণ নেই এবং সে আমাকে ছাড়া থাকতে চায়।
এই অবস্থায় আমার করণীয় কি জানাবেন,আমি অনেক মানসিক অশান্তিতে আছি।
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার বর্ণিত পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ, যেখানে পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্মান ও সহানুভূতি থাকা বাধ্যতামূলক। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
"আর তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সদয়ভাবে জীবনযাপন করো।" (সূরা আন-নিসা ৪:১৯)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
"তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো那人 যে তার পরিবারের কাছে ভালো, আর আমি আমার পরিবারের কাছে সবচেয়ে ভালো।" (তিরমিযী, হাদীস: ৩৮৯৫; সহীহ)
আপনার স্বামী যদি বাবা-মায়ের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে চুপ থাকেন এবং আপনাকে ছেড়ে থাকতে চান, তাহলে তিনি তার দায়িত্বে অবহেলা করছেন। ইসলামে স্বামীকে স্ত্রীর প্রতি ন্যায়বিচার ও সুরক্ষা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আপনার করণীয়:
১. সালিশ (মধ্যস্থতা) এর ব্যবস্থা করা:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَإِنْ خِفْتُمْ شِقَاقَ بَيْنِهِمَا فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا إِنْ يُرِيدَا إِصْلَاحًا يُوَفِّقِ اللَّهُ بَيْنَهُمَا
"আর যদি তোমরা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাদের আশঙ্কা করো, তাহলে তোমরা স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিস (মধ্যস্থতাকারী) নিয়োগ করো। তারা যদি সংশোধন চায়, তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিলিয়ে দেবেন।" (সূরা আন-নিসা ৪:৩৫)
আপনি আপনার পরিবার থেকে একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি এবং স্বামীর পরিবার থেকে একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি নিয়ে মধ্যস্থতার চেষ্টা করুন। যদি স্বামী ও তার পরিবার সংশোধন করতে রাজি হয়, তাহলে সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা করা উত্তম।
২. ইসলামী আদালতে (শরী‘আহ কোর্ট) যাওয়া:
যদি সালিশ কার্যকর না হয় এবং স্বামী অন্যায় অব্যাহত রাখে, তাহলে আপনি ইসলামী বিচারকের (কাযী) কাছে যেতে পারেন। বিচারক স্বামীকে ন্যায়বিচার করতে বাধ্য করবেন অথবা স্বামীর পক্ষ থেকে জুলুম প্রমাণিত হলে খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ) অনুমোদন করবেন।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
"যদি স্বামী স্ত্রীর প্রতি জুলুম করে এবং তার অধিকার আদায় না করে, তাহলে স্ত্রীর জন্য বিচারকের কাছে ফরিয়াদ করা জায়েয, যাতে তিনি স্বামীকে ন্যায়পরায়ণ হতে বাধ্য করেন অথবা তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটান।" (মাজমু‘ ফাতাওয়া, ৩২/১১৯)
৩. খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ):
যদি স্বামী আপনাকে তালাক না দেয় এবং আপনি তার সাথে বসবাস করা সম্ভব না মনে করেন, তাহলে আপনি খুলা নিতে পারেন। খুলা হল বিবাহ বিচ্ছেদের একটি পদ্ধতি যেখানে স্ত্রী স্বামীকে কিছু মোহর বা অর্থ ফিরিয়ে দিয়ে তালাক নেয়।
ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন:
"যদি স্ত্রী স্বামীকে ঘৃণা করে এবং তার সাথে থাকা তার জন্য কষ্টকর হয়, তাহলে সে খুলা নিতে পারে, যদিও স্বামী ভালো হয়।" (যাদুল মা‘আদ, ৫/১৯৮)
৪. স্বামীর প্রতি দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া:
স্বামীকে স্পষ্টভাবে বলুন:
"আল্লাহ তাআলা স্বামীকে স্ত্রীর প্রতি ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দিয়েছেন। তুমি যদি আমার প্রতি জুলুম করো এবং আমার হক আদায় না করো, তাহলে তোমার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করব।"
৫. ধৈর্য ও সাবর:
এই কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া জরুরি। আল্লাহ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারাহ ২:১৫৩)
আপনার স্বামীর কর্তব্য:
আপনার স্বামীকে জানিয়ে দিন যে তার বাবা-মায়ের অন্যায় সমর্থন করা ইসলামসম্মত নয়। রাসূল (সা.) বলেছেন:
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ
"সৃষ্টিকর্তার নাফরমানীর কাজে সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (আহমাদ, হাদীস: ১১০৫; সহীহ)
যদি তার বাবা-মা আপনার প্রতি জুলুম করে, তাহলে তাদের আনুগত্য করা তার জন্য জায়েয নয়।
উপসংহার:
আপনার জন্য দুটি প্রধান পথ খোলা রয়েছে:
১. সংশোধনের চেষ্টা: সালিশ ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা।
২. বিচ্ছেদ: যদি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়, তাহলে খুলা বা তালাকের মাধ্যমে বিচ্ছেদ গ্রহণ করা।
আপনার মানসিক শান্তি ও ধর্মীয় অধিকার রক্ষার জন্য ইসলামী আদালতে যাওয়া সবচেয়ে উত্তম হবে। আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য ও সাহায্য দান করুন।
আল্লাহু আলাম (সর্বজ্ঞ)।