ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে স্বপ্নের ভালো ব্যাখ্যা দেওয়া ও “ভালো দেখেছেন” বলার বিধান।
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় হলো—কেউ যদি কোন স্বপ্ন (ভালো বা মন্দ) শুনে উত্তর দেয়, “আপনি যা দেখেছেন, ভালো দেখেছেন” এবং এই বিশ্বাস করে যে, এমন বলার কারণে খারাপ কিছু হবে না, বরং আল্লাহর ইচ্ছায় ভালো হবে, তাহলে তা কি বিদ‘আত?
সংক্ষেপে উত্তর হলো—এটি বিদ‘আত নয়। বরং এটি একটি প্রশংসনীয় ও সুন্নাহসম্মত পন্থা, যদি সঠিক নিয়তে ও ইসলামী শিক্ষার আলোকে বলা হয়। নিচে বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
১. স্বপ্নের ব্যাখ্যা ও ভালো বলার গুরুত্ব
ইসলামে স্বপ্নের ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে ভালো ব্যাখ্যা (তাফসীরে হাসান) দেওয়া উৎসাহিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"إِذَا رَأَى أَحَدُكُمْ رُؤْيَا يُحِبُّهَا فَإِنَّمَا هِيَ مِنَ اللَّهِ، فَلْيَحْمَدِ اللَّهَ عَلَيْهَا وَلْيُحَدِّثْ بِهَا، وَإِذَا رَأَى غَيْرَ ذَلِكَ مِمَّا يَكْرَهُ فَإِنَّمَا هِيَ مِنَ الشَّيْطَانِ، فَلْيَسْتَعِذْ مِنْ شَرِّهَا وَلَا يُحَدِّثْ بِهَا أَحَدًا؛ فَإِنَّهَا لَا تَضُرُّهُ"
“তোমাদের কেউ যখন কোনো পছন্দনীয় স্বপ্ন দেখে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে; সে যেন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এবং তা (অন্যদেরকে) বলে। আর যখন অপছন্দনীয় কিছু দেখে, তা শয়তানের পক্ষ থেকে; সে যেন তার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং তা কাউকে না বলে; তাহলে তা তাকে কোনো ক্ষতি করবে না।”
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৯৮৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬১)
এছাড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, মন্দ স্বপ্ন দেখা গেলে বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলবে, আউযুবিল্লাহ পড়বে, এবং স্থান পরিবর্তন করে অন্য দিকে শুয়ে পড়বে। আর ভালো স্বপ্ন দেখলে তা শুধু বন্ধু-প্রিয়জন বা আলেমকে বলবে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২২৬২)
২. “ভালো দেখেছেন” বলার প্রমাণ ও হিকমত
সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীন থেকে প্রমাণিত যে, কারো মন্দ স্বপ্নের কথা শুনলে তারা তা ভালো অর্থে ব্যাখ্যা করতেন। যেমন হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতেন এবং ভালো বলেই সীমাবদ্ধ রাখতেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৯৯০)
ইমাম নববী (রহ.) বলেন:
"يُسْتَحَبُّ لِمَنْ سُئِلَ عَنْ رُؤْيَا أَنْ يَقُولَ خَيْرًا، فَإِنْ لَمْ يَعْلَمْ فَلْيَقُلْ: خَيْرًا تَرَى، أَوْ نَحْوَ ذَلِكَ"
“স্বপ্ন সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তির জন্য ভালো বলা মুস্তাহাব। যদি ভালো অর্থ না জানে, তাহলে বলবে: ‘ভালো দেখেছেন’ বা এরূপ কিছু।”
(শরহুন নববী লি সহীহ মুসলিম, ১৫/২৯)
৩. বিশ্বাস সম্পর্কে সতর্কতা
আপনার প্রশ্নের মূল বক্তব্য হলো—যে ব্যক্তি বলে “ভালো দেখেছেন” এবং বিশ্বাস করে যে, এর ফলে খারাপ কিছু হবে না, বরং আল্লাহর ইচ্ছায় ভালো হবে—এমন বিশ্বাস বিদ‘আত নয়, বরং তা তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর প্রতি ভরসারই বহিঃপ্রকাশ। কারণ প্রকৃত কল্যাণ ও অকল্যাণ আল্লাহর হাতে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
"لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ"
“তোমাদের কেউ মুমিন হবে না যতক্ষণ না সে তাকদীরের ভালো-মন্দের ওপর বিশ্বাস করে।”
(সুনান ইবনে মাজাহ, হাদীস: ৭৭)
তবে সাবধান থাকা জরুরি যে, কেউ যদি মনে করে যে, “ভালো দেখেছেন” বলার শব্দটির নিজস্ব কোনো বিশেষ ক্ষমতা আছে বা এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মন্দকে দূর করে দেয়—তা যদি শিরকি আকীদা হয়। কিন্তু এখানে প্রশ্নকারী বলেছেন, “আল্লাহর ইচ্ছায় ভালো হবে” — যা সম্পূর্ণ তাওহীদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
৪. ইমাম ও ফুকাহায়ে হানাফীর বক্তব্য
হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহে স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে—ভালো ব্যাখ্যাই দেওয়া উচিত। ইমাম ইবনু আবেদীন (রহ.) (রদ্দুল মুহতার, ১/১৬২) ও ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৩/২০৭)-তে উল্লেখ আছে যে, স্বপ্নের ভালো ব্যাখ্যা দেওয়া মুস্তাহাব এবং মন্দ ব্যাখ্যা থেকে বিরত থাকা উচিত।
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) লিখেছেন:
“স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে হলে ভালো ব্যাখ্যাই দেওয়া কর্তব্য। নবী করীম (ﷺ)-এর তরীকা ছিল যে, তিনি স্বপ্নের ভালো ব্যাখ্যা দিতেন এবং মন্দ ব্যাখ্যা দিতেন না।”
(মা‘আরিফুল কুরআন, তাফসীর সূরা ইউসুফ)
৫. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
উপরোক্ত দলিল ও ফুকাহার বক্তব্যের আলোকে বলা যায়—
✓ “ভালো দেখেছেন” বলা জায়েয এবং মুস্তাহাব।
✓ যদি কেউ এই বিশ্বাস রাখে যে, এ কথা বলার কারণে আল্লাহর ইচ্ছায় মন্দ দূর হবে ও কল্যাণ আসবে—তা বিদ‘আত নয়। বরন্ত এটি তাওয়াক্কুল ও হাসান যন্নের (উত্তম ধারণা) অন্তর্ভুক্ত।
✓ তবে যদি কেউ মনে করে যে, এই শব্দটির নিজস্ব কোনো বাতেনী শক্তি আছে—তা ভুল। কিন্তু সাধারণ মুসলিমের বিশ্বাস আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখাই হয়, তাই তাকে আপত্তি করার প্রয়োজন নেই।
সতর্কতা:
- মন্দ স্বপ্ন দেখলে তা সাধারণের কাছে না বলাই উত্তম।
- ভালো স্বপ্ন দেখলে কেবল প্রিয়জন বা জ্ঞানী ব্যক্তিকে বলবেন।
- কেউ মন্দ স্বপ্ন বলে ফেললে, তাকে বলুন “তা ভালো” এবং তাকে তাওয়াক্কুলের দিকে উৎসাহিত করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।