বিয়ের আগে ডিভোর্সের শর্ত দেওয়া যাবে কি
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
হানাফি মাজহাবে মুল কিতাবে তো দেখাই কাযকর পচুর কিলানতো অবস্থাই আছি
মুজতাহিদ কোথায় পাবো সালাফি মুফতি বা গ্যানড মুফতি আবদুল আজিজ ইবনে বাজ তাও পড়িশতিত বিবেচনা করতেন সব দিক হানাফি মাজহাবে তো বিবেচনা করে না
Answer
বিয়ের আগে ডিভোর্সের শর্ত সংক্রান্ত মাসআলা
উত্তর:
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণা ও সংশয় বুঝতে পারছি। আসুন আমরা এই মাসআলাটি কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে পরিষ্কারভাবে বুঝার চেষ্টা করি।
মূল মাসআলা: বিয়ের আগে ডিভোর্সের শর্ত
আপনি যে মাসআলাটি নিয়ে চিন্তিত, তা হলো—বিয়ের আগে কেউ যদি বলে, "বিয়ের পর অমুক কাজ করলে তালাক" বা "বিয়ের সাথে তালাকের শর্ত যুক্ত থাকবে"—এমন শর্ত দেওয়া হলে তা কীভাবে গণ্য হবে?
হানাফি মাজহাবের মূল নীতি
উত্তরের মূল কথা
১ম অবস্থা: বিবাহের সাথে সম্পর্কহীনভাবে শর্তযুক্ত করা (ইযাফত ছাড়া তা’লীক)
-
সুরত বা বিবরণ: ছেলেটি যদি বিবাহের আগে মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে কোনো কাজের সাথে ডিভোর্স ঝুলন্ত করে থাকে, কিন্তু সেখানে বিবাহের সাথে কোনো সংযোগ না করে থাকে। যেমন: "তুমি যদি অমুক কাজ করো, তবে তোমার তালাক" বা "তুমি যদি সেখানে যাও, তবে তুমি ডিভোর্স" ইত্যাদি ।
-
হুকুম ও সমাধান: হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ও সর্বসম্মত ফয়সালা অনুযায়ী, বিয়ের আগে বেগানা বা অপরিচিত মহিলার সাথে বিবাহের কোনো সম্পর্ক না দেখিয়ে সরাসরি কোনো কাজের সাথে তালাক ঝুলন্ত করলে তা সম্পূর্ণ বাতিল ও লগু (Void) বলে গণ্য হয় । কারণ হানাফী ফিকহের অকাট্য নীতি হলো— তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য ছেলেটির সেই মেয়ের ওপর বৈবাহিক মালিকানা (Milk) থাকতে হবে, অথবা শর্তারোপের সময় কথাটিকে ভবিষ্যতের বিবাহের সাথে সংযোগ করতে হবে ।
-
করণীয়: যেহেতু কথাটি গোড়া থেকেই সম্পূর্ণ বাতিল, তাই বিবাহের পর মেয়েটি সেই শর্তাধীন কাজটি করলেও কোনো তালাক পতিত হবে না এবং বৈবাহিক সম্পর্কের কোনো ক্ষতি হবে না। এক্ষেত্রে ছেলেটির অতিরিক্ত কোনো কিছু করার বা কোনো আমল করার প্রয়োজন নেই; তারা নিশ্চিন্তে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে পারবেন।
-
উৎস, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৭০-২৭১ (কাবিননামায় তাফবীযে তালাক ও বিবাহের পূর্বে শর্ত পরিচ্ছেদ)।
- ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া (আলমগীরী — ১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৩৭৪-৩৭৫ (কিতাবুত তালাক, কসম ও তা’লীক পরিচ্ছেদ)।
২য় অবস্থা: বিবাহের সাথে সম্পর্কযুক্ত করে শর্ত দেওয়া (ইযাফত সহ তা’লীক)
-
সুরত বা বিবরণ: ছেলেটি যদি বিবাহের কথা উল্লেখ করে শর্ত জুড়ে দিয়ে থাকে। যেমন: "আমি যদি তোমাকে বিয়ে করি, আর তুমি যদি অমুক কাজ করো, তবে তোমার তালাক" বা "তোমাকে বিয়ে করার পর তুমি যদি অমুক কাজ করো, তবে তোমার ডিভোর্স" ইত্যাদি ।
-
হুকুম: হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, এই ধরণের শর্তযুক্ত তালাক (তা’লীক) সহীহ ও কার্যকর । বিবাহের পর স্ত্রী যদি কখনো সেই কাজটি করে, তবে সাথে সাথে তালাক পতিত হয়ে যাবে।
-
করণীয় ও নিশ্চিত শরয়ী সমাধান (হিলা বা কসম ভাঙার উপায়): যদি ছেলেটি এই কসম বা ডিভোর্সের শর্ত থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে চায়, তবে হানাফী ফিকহে এর একটি সুনির্দিষ্ট ও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সমাধান রয়েছে, যা নিচে তুলে ধরা হলো:
- প্রথম ধাপ (বিবাহ সম্পন্ন করা): প্রথমে তারা উভয়ে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সাক্ষীদের উপস্থিতিতে বিবাহ (আকদ) সম্পন্ন করবেন।
- দ্বিতীয় ধাপ (স্ত্রী শর্তটি করার আগেই তালাক দেওয়া): স্ত্রী সেই নিষিদ্ধ বা শর্তাধীন কাজটি করার আগেই স্বামী স্ত্রীকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ১টি 'তালাকে বাযেন' (যেমন স্পষ্ট শব্দে মুখে বলবে: "তোমাকে এক তালাকে বাযেন দিলাম") প্রদান করবেন । এর ফলে তাদের বিবাহ বন্ধন সাময়িকভাবে ভেঙে যাবে এবং স্ত্রী ইদ্দত বা অপেক্ষায় থাকবেন।
- তৃতীয় ধাপ (ইদ্দতের ভেতর শর্তটি সম্পন্ন করা): স্ত্রী তালাকপ্রাপ্তা (বাযেন) অবস্থায় থাকা কালেই ঐ শর্তাধীন বা নিষিদ্ধ কাজটি একবার সম্পন্ন করবেন (যার সাথে তালাক ঝুলন্ত করা হয়েছিল)।
- কসম ভাঙার রহস্য: যেহেতু স্ত্রী এই কাজটি করার সময় স্বামীর বিবাহ বন্ধনে ছিলেন না (কারণ আগেই বাযেন তালাক দেওয়া হয়েছিল), সেহেতু কাজটি হওয়ার সাথে সাথে পূর্বের করা কসমটি পূরণ হয়ে যাবে কিন্তু নতুন কোনো তালাক পতিত হবে না। এর মাধ্যমে তালাকের পূর্ববর্তী শর্ত বা কসমটি চিরতরে ভেঙে ও সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে যাবে।
- চতুর্থ ধাপ (পুনরায় বিবাহ করা): কসমটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের পারস্পরিক সম্মতিতে নতুন মোহর নির্ধারণ করে এবং দুজন মুসলিম পুরুষ সাক্ষীর উপস্থিতিতে পুনরায় নতুন আকদ বা নিকাহ সম্পন্ন করবেন ।
- ফলাফল: কসমটি যেহেতু ইদ্দতের ভেতর কাজ করার মাধ্যমে একবার ভেঙে বা বাতিল হয়ে গেছে, তাই পুনরায় বিবাহের পর স্ত্রী যতবারই সেই কাজ করুক না কেন, আর কোনটি তালাক পতিত হবে না। তারা সম্পূর্ণ শঙ্কামুক্ত দাম্পত্য জীবন কাটাতে পারবেন।
(সতর্কতা: যদি কসমের শুরুতে "কুল্লামা" বা "যখনই/যতবারই" শব্দ ব্যবহৃত হয়ে থাকে, তবে এই সমাধান প্রযোজ্য হবে না; সেক্ষেত্রে ভিন্ন জটিল মাসআলা রয়েছে, যা অভিজ্ঞ মুফতী সাহেবের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সমাধান করতে হবে।)
-
উৎস, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- কাওয়াইদুল ফিক্বহ (হাশিয়া সহ): পৃষ্ঠা: ১১০-১১১ (قاعدة: المعلق بالشرط معدوم قبل الشرط - শর্তের পূর্বে তা’লীককৃত তালাক অস্তিত্বহীন থাকে)।
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৬৭-২৬৮ [৩১৯]।
- ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া (আলমগীরী — ১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৪০৫-৪১০ (তা’লীক ও কসমের সমাধান অধ্যায়)।
(আল্লাহই সর্বাধিক সঠিক জানেন)