পরিবারে কেন বিপদ আসে ইসলামিক সমাধান।

Family Life · Hanafi

Question No: 4669
Questioner: Afroja
Question Asked: 31 Aug 2026, 01:07 PM
Reviewed & Published: 31 Aug 2026, 02:30 PM
Views: 29
Tokens: 7,722
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমাদের বাসায় গত ৩-৪ মাস ধরে প্রত্যেকেই লক্ষ করছি যে অনেক বিপদ আসছে। যেকোনো কাজ করতে গেলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছি। এক এর পর এক বিপদ লেগেই আছে। আমরা অনেক সুখী পরিবার ছিলাম। আত্নীয় স্বজন প্রত্যেকেই বলতো আমরা অনেক ভালো আছি। অর্থ সম্পদ কম থাক্লেও জীবনে ঝামেলা ছিল না। কিছু মানুষ এই কারণে আমাদেরকে হিংসা ও করে। ৩-৪ মাস যাবত বাসায় যেই কাজই করানো হচ্ছে প্রব্লেম হচ্ছে। হঠাৎ করেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ আসছে। আমার বোনের ছোট্ট বাবু টাও মারা গিয়েছে। আব্বু হঠাৎ ই অসুস্থ হয়েছে। আমার বোন অনেক মেধাবী ছাত্রী হওয়ার পরেও এইচ এস সি পরীক্ষা একটা দিতে পারিনি। ওকেও সবাই অনেক হিংসা করে ভালো রেজাল্ট করার কারনে। জান এবং মাল দুটোর ই ক্ষতি হচ্ছে।

আবার আমার বোনের ৪ বছরের বাবুটা মারা যাওয়ার পর থেকে পারিবারের প্রত্যেকেই অনেক ভেংগে পড়েছে। কেমন জানি সবাই আর আগের মতো চাইলেও ইবাদত করতে পারছে না। সবাই ভাবছে দুয়া করেও কি লাভ আল্লাহ তো শুনে না। আল্লাহর যা ভালো মনে হয় তাই করে৷ এত ডাকলাম আল্লাহকে আল্লাহ শুনলো না। আগে আমাদের ফজর মিস ই হতো না বললে চলে কিন্তু এখন প্রায়ই মিস হয়ে যাচ্ছে। কুরআন পড়া হচ্ছে না। ইবাদতে মনযোগ আগ্রহ আসছে না আগের মতো। ইমান দূর্বল হয়ে যাচ্ছে। আমরা এটা বুঝছি সবাই। অনেক খারাপ লাগছে এমন কেনো হচ্ছে। আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। ভালো লাগছে না একটু ও। আমরা কি করবো কিচ্ছু বুঝছি না। আমরা চাই আগের মতো ইবাদত করতে কুরআন পড়তে, আল্লাহর উপরে ভরসা করতে।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় বোন, আপনার কষ্টের কথা শুনে সত্যিই খুব খারাপ লাগলো। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি আপনাদের সবাইকে এই কঠিন সময়ে ধৈর্য ও সাহায্য দান করুন এবং আপনাদের সব বিপদ দূর করে দিন। (আমিন)

প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানিয়ে রাখি—বিপদ-আপদ, কষ্ট ও পরীক্ষা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে এবং এটি মুমিনের জন্য রহমতও বটে। কুরআন ও হাদিসে এর অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। আপনারা মনে করছেন আল্লাহ আপনাদের ডাক শুনছেন না, এটি শয়তানের প্ররোচনা এবং মন খারাপের কারণে সৃষ্ট একটি ভুল ধারণা। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
"তোমাদের রব বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব।" (সূরা গাফির: ৬০)

আল্লাহর এই ওয়াদা অটল। তিনি অবশ্যই ডাক শোনেন, তবে উত্তর দেন তাঁর হিকমত অনুযায়ী—কখনো তাৎক্ষণিক, কখনো বিলম্বে, আবার কখনো এর চেয়ে উত্তম কিছু দিয়ে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

"তোমাদের প্রত্যেকের দোয়া কবুল হয়, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে এবং বলে, 'আমি দোয়া করলাম কিন্তু কবুল হলো না'।" (সহিহ বুখারি: ৬৩৪০, সহিহ মুসলিম: ২৭৩৫)

সুতরাং, দোয়া কবুল না হওয়ার হতাশা কখনোই পোষণ করা যাবে না। এটি শয়তানের বড় চক্রান্ত, যাতে মানুষ আল্লাহর থেকে দূরে সরে যায়।


কেন বিপদ আসে এবং এর প্রতিদান

বিপদ মুমিনের জন্য পরীক্ষা, গুনাহের কাফফারা এবং মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

"মুসলিমের ওপর যে কষ্ট, রোগ, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট বা চিন্তা আসে—এমনকি যে কাঁটাবিদ্ধ হয়—তা দ্বারা আল্লাহ তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেন।" (সহিহ বুখারি: ৫৬৪১, সহিহ মুসলিম: ২৫৭৩)

আরেকটি হাদিসে আছে:

"যার কল্যাণ আল্লাহ চান, তিনি তাকে বিপদে ফেলেন।" (সহিহ বুখারি: ৫৬৪৫)

সুতরাং, এই বিপদগুলো আপনাদের প্রতি আল্লাহর অসন্তুষ্টির লক্ষণ নয়, বরং এটি তাঁর ভালোবাসা ও কল্যাণেরই একটি অংশ হতে পারে, যার মাধ্যমে তিনি আপনাদের গুনাহ মাফ করছেন এবং মর্যাদা বাড়াচ্ছেন।


হিংসা (নযর-বদর) থেকে সুরক্ষা

আপনারা উল্লেখ করেছেন যে, কিছু মানুষ আপনাদের হিংসা করে। ইসলামে হিংসা ও বদনযরকে সত্য বলে স্বীকার করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

"বদনযর (কুদৃষ্টি) সত্য; যদি কোনো কিছু তাকদিরের পূর্বে অগ্রসর হতো, তবে বদনযরই অগ্রসর হতো।" (সহিহ মুসলিম: ২১৮৮)

তাই এর থেকে বাঁচার জন্য নিম্নলিখিত আমলগুলো করুন:

১. সূরা ফালাক ও সূরা নাস প্রতিদিন পড়ুন এবং নিজেদের ওপর ঝেড়ে ফেলুন। (আবু দাউদ: ৫০৮২) ২. আয়াতুল কুরসি প্রতিদিন পড়ুন। (সহিহ বুখারি: ২৩১১) ৩. দরুদ শরিফ বেশি বেশি পড়ুন। ৪. সকাল-সন্ধ্যার যিকির (আযকার) নিয়মিত করুন। যেমন: "বিসমিল্লাহিল্লাযি লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামা'ই ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম" (আবু দাউদ: ৫০৮৮) — এটি পড়লে কোনো ক্ষতি হয় না।


ইবাদতে মনোযোগ ফিরিয়ে আনার উপায়

আপনারা বলেছেন ইবাদতে মনোযোগ আসছে না, ফজর মিস হয়ে যাচ্ছে, কুরআন পড়া হচ্ছে না। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক—মানসিক চাপ ও শোকের কারণে এমনটা হয়। তবে শয়তান এই সুযোগে আপনাদেরকে আরও দূরে সরিয়ে নিতে চায়। তাই:

১. ছোট ছোট আমল দিয়ে শুরু করুন: একসাথে সব ইবাদত ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন না। প্রথমে শুধু ফরজ নামাজগুলো সময়মতো আদায়ের চেষ্টা করুন। ফজরের জন্য অ্যালার্ম দিন এবং পরিবারের সবাই মিলে একে অপরকে জাগিয়ে দিন।

২. কুরআন তিলাওয়াত: প্রতিদিন অল্প পরিমাণ হলেও (যেমন: এক পৃষ্ঠা বা ১০ আয়াত) কুরআন পড়ার চেষ্টা করুন। নিয়মিত অল্প পড়া অনেক ভালো, হঠাৎ করে বেশি পড়ে ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে।

৩. দোয়া ও যিকির: প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় কিছু যিকির করুন। যেমন: "সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি" ১০০ বার, "আস্তাগফিরুল্লাহ" ১০০ বার। এতে মন শান্তি পাবে।

৪. ধৈর্য ও সবরের দোয়া: এই দোয়াটি বেশি বেশি পড়ুন:

إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
"ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন" (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁরই কাছে ফিরে যাব)

আরও পড়ুন:

اللَّهُمَّ أَجِرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا
"আল্লাহুম্মা আজিরনি ফি মুসিবাতি ওয়া আখলিফ লি খাইরান minha"
(হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আমাকে প্রতিদান দিন এবং এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন।) — সহিহ মুসলিম: ৯১৮


ইমান শক্তিশালী করার উপায়

১. আল্লাহর গুণাবলি নিয়ে চিন্তা করুন: আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু, করুণাময়, জ্ঞানী। তিনি যা করেন, তার মধ্যে কল্যাণ থাকে। কুরআনে বলা হয়েছে:

وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ
"আর হতে পারে তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।" (সূরা বাকারা: ২১৬)

২. সৎ ও আলেম ব্যক্তিদের সাহচর্য নিন: যারা আল্লাহভীরু, তাদের সাথে সময় কাটান। তাদের কথা শুনলে ইমান শক্তিশালী হয়।

৩. মৃত শিশুর জন্য দোয়া করুন: আপনার বোনের ৪ বছরের শিশুটি মারা গেছে—এটি খুবই কষ্টের বিষয়। তবে জেনে রাখুন, জান্নাতে শিশুরা "ইবরাহিম (আঃ)-এর হাওজ" -এর কাছে থাকে এবং কিয়ামতের দিন তারা তাদের পিতামাতাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে। (সহিহ মুসলিম: ২৬৩৫) সুতরাং, এই শিশুটি আপনাদের জন্য জান্নাতে সুপারিশকারী হবে, ইনশাআল্লাহ।


হিংসা থেকে বাঁচার দোয়া

যারা হিংসা করে, তাদের থেকে বাঁচতে এই দোয়াটি পড়ুন:

أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ
"আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাক"
(আল্লাহর পরিপূর্ণ কালামসমূহের উসিলায় আশ্রয় চাই তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে।) — সহিহ মুসলিম: ২৭০৮


সর্বশেষ পরামর্শ

১. আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন: মনে রাখবেন, আল্লাহই একমাত্র সাহায্যকারী। তিনি বলেন:

وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
"যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।" (সূরা তালাক: ৩)

২. পরিবারের সবাই মিলে ইবাদত করুন: একসাথে নামাজ পড়ুন, একসাথে কুরআন পড়ুন, একসাথে দোয়া করুন। এতে পারিবারিক বন্ধনও মজবুত হবে এবং ইবাদতেও মনোযোগ আসবে।

৩. ডাক্তারের পরামর্শ নিন: আপনার আব্বু অসুস্থ—তার চিকিৎসা অবশ্যই করান। ইসলামে চিকিৎসা করানোও ইবাদত। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: "প্রতিটি রোগের নিরাময় আছে।" (সহিহ বুখারি: ৫৬৭৮)

৪. হতাশা দূর করুন: মনে রাখবেন, এই দুনিয়া পরীক্ষার স্থান। কষ্ট আসবেই, তবে ধৈর্য ধরলে এর প্রতিদান অনেক বড়। আল্লাহ বলেন:

إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
"নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা বাকারা: ১৫৩)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.