শেয়ারে ব্যবসা সংক্রান্ত ফতোয়া
Business and Job · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
বিষয়: নাবিক (Seafarer) Recruitment Business-এ অংশীদারি, লাইসেন্স ব্যবহার, শ্রমের পারিশ্রমিক, সাত-স্কৃতি কণ্টন এবং ব্যবসায়িক কাঠামো শরিয়াহসম্মত কি না-এ বিষয়ে শরয়ি নির্দেশনা প্রার্থনা।
সম্মানিত মুফতি সাহেব/হুজুর,
ইফতা বিভাগ/ ফতোয়া বোর্ড
আমি মোঃ সুমন শিকদার (প্রথম অংশীদার) এবং আমার দ্বিতীয় অংশীদার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান আমরা উভয়ে মিলে একটি ব্যবসা পরিচালনা করতে চাচ্ছি। আমাদের ব্যবসাটি হলো নাবিক (Seafarer) Recruitment Business |
আমাদের ব্যবসাযের আয় বা ব্যয় মূলত দুইভাবে আসবে। কিছু ক্ষেত্রে জাহাজের মালিক (Ship Owner) আমাদের নাবিক সরবরাহের বিনিময়ে অর্থ প্রদান করবেন এবং কিছু ক্ষেত্রে আমরা যে নাবিকদের জাহাজে পাঠাব, তাদের কাছ থেকেও নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ, জাহাজের মালিক অথবা নাবিক যে পক্ষ থেকে বৈধভাবে অর্থ গ্রহণ করা হবে, সেটিই আমাদের ব্যবসায়িক আমের অংশ হবে।
এই ব্যবসা পরিচালনার জন্য একটি লাইসেন্সের প্রযোজন হবে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৫,০০,০০০ (পঁচিশ লক্ষ) টাকা। আমাদের কাছে এই পরিমাণ অর্থ না থাকায় আমরা তৃতীয় একজন ব্যক্তির কাছ থেকে লাইসেন্সটি ব্যবহারের জন্য নেব। এই লাইসেন্সের জামানত বাবদ আমরা ওই ব্যক্তিকে ৫,৫০,০০০ (পাঁচ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা প্রদান করব। এই সম্পূর্ণ জামানতের অর্থ দ্বিতীয় অংশীদার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান প্রদান করবেন।
এছাড়াও, প্রতি মাসে আমরা ওই লাইসেন্সধারী ব্যক্তিকে আমাদের মাধ্যমে পাঠানো প্রতি নাবিকের জন্য ৫,০০০ (পাঁচ হাজার) টাকা প্রদান করব।
যেহেতু প্রথম অংশীদার মোঃ সুমন শিকদার দেশে থেকে ব্যবসার সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন এবং ব্যবসার সকল দিক দেখাশোনা করবেন, তাই তাঁর শ্রম ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের পারিশ্রমিক হিসেবে প্রতি মাসে ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে (বেতন হিসেবে)। এ বিষয়ে উভয় অংশীদার সম্মত।
উল্লেখ্য, দ্বিতীয় অংশীদার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান নিজে এ ধরনের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা ও শ্রমের কাজ করবেন না। তাঁর পরিবর্তে ভাঁর ভাই এই ধরনের কাজে নিয়োজিত থাকবেন। তাই তাঁর ভাইয়ের শ্রমের পারিশ্রমিক হিসেবে প্রতি মাসে ২০,০০০ (বিশ হাজার) টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে (বেতন হিসেবে)।
অন্যদিকে, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে আহাজ মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যবসা সংগ্রহ এবং নতুন জাহাজ মালিকদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের কাজে আমরা উভয়েই প্রথম অংশীদার মোঃ সুমন শিকদার এবং দ্বিতীয় অংশীদার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান নিজ নিজভাবে শ্রম ও সদয় প্রদান করব।
সকল বৈধ ব্যবসায়িক খরচ, লাইসেন্স-সংক্রান্ত খরচ, শ্রমের পারিশ্রমিক এবং অন্যান্য প্রযোজনীয় খরচ বাদ দেওয়ার পর যে নিট লাভ থাকবে, তা আমরা ৫০:৫০ অনুপাতে তাগ করে নেব।
একইভাবে, ব্যবসায যদি কোনো ক্ষতি হয়, তাহলে শরিয়াহসম্মত নিয়ম অনুযায়ী আমরা উভয়ে সেই ক্ষতির দায়ভার বহন করব।
উপরোক্ত ব্যবসায়িক কাঠামো, লেনদেন এবং পারিশ্রমিকের ব্যবস্থার ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধি-বিধান কী তা জানার জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে আপনাদের নিকট শরয়ি নির্দেশনা প্রার্থনা করছি
প্রশ্নসমূহ
১। আমাদের উপরোক্ত অংশীদারি চুক্তি ও ব্যবসায়িক কাঠামো শরিয়াহসম্মত কি না? যদি শরিয়াহসম্মত না হয়, তাহলে এটিকে শরিয়াহসম্মত করার সঠিক পদ্ধতি কী?
২। ব্যবসা পরিচালনার শ্রম ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রথম অংশীদার মোঃ সুমন শিকদারকে প্রতি মাসে ৫০,০০০ টাকা এবং দ্বিতীয় অংশীদার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানের ভাইকে প্রতি মাসে ২০,০০০ টাকা পারিশ্রমিক দেওয়ার ব্যবস্থা শরিয়াহসম্মত কি না? যদি শরিয়াহসম্মত না হয়, তাহলে শরিয়াহসম্মতভাবে এই ব্যবস্থা কীভাবে করা যাবে?
৩। উপরোক্ত সকল বৈধ ব্যবসায়িক খরচ, লাইসেন্স-সংক্রান্ত খরচ এবং শ্রমের পারিশ্রমিক ইত্যাদি বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট নিট লাভ ৫০:৫০ অনুপাতে প্রথম অংশীদার ও দ্বিতীয় অংশীদারের মধ্যে ভাগ করা শরিয়াহসম্মত কি না?
৪। ব্যবসায় কোনো ক্ষতি হলে শরিয়াহসম্মত নিয়ম অনুযায়ী সেই ক্ষতি কীভাবে প্রথম অংশীদার ও দ্বিতীয় অংশীদারের মধ্যে বহন করতে হবে?
৫। পুরো ব্যবসায়িক কাঠামোটি মুশারাকা/শিরকাহ, ইজারা অথবা অন্য কোনো শরিয়াহসম্মত চুক্তির মাধ্যমে কীভাব সাজানো উচিত, যাতে ব্যবসার সকল লেনদেন ও কার্যক্রম শরিয়াহসম্মত হয়?
বিষয়টি যেহেতু আমাদের বাস্তব ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত, তাই কুরআন-সুন্নাহ, ফিকহের মূলনীতি এবং নির্ভরযোগ্য ফিকহি কিতাবের আলোকে উপরোক্ত বিষয়গুলোর বিস্তারিত শরয়ি নির্দেশনা প্রদান করলে আমরা অভান্ত উপকৃত ও কৃতজ্ঞ থাকব।
বিশেষভাবে আমাদের জন্য কোন কোন চুক্তি কীভাবে সম্পাদন করা উচিত, লাভ-ক্ষতি কীভাবে নির্ধারণ করতে হবে, শ্রমের পারিশ্রমিক কীভাবে বৈধভাবে নির্ধারণ করা যাবে এবং লাইসেন্স ব্যবহারের আমানত ও প্রতি নাবিকের জন্য ৫,০০০ টাকা প্রদানের বিষয়টি কীভাবে শরিয়াহসম্মতভাবে পরিচালনা করা যাবে-এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা কামনা করছি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের ব্যবসাকে হালাল, বরকতময় ও শরিয়াহসম্মত করার তাওফিক দান করুন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান।
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
প্রশ্ন: নাবিক (Seafarer) Recruitment Business-এ অংশীদারি, লাইসেন্স ব্যবহার, শ্রমের পারিশ্রমিক এবং ব্যবসায়িক কাঠামো শরিয়াহসম্মত কি না?
উত্তর
১. অংশীদারি চুক্তি ও ব্যবসায়িক কাঠামোর শরীয়াহসম্মত মূল্যায়ন:
-
শরয়ী হুকুম: আপনাদের বর্তমান খসড়া চুক্তি ও ব্যবসায়িক কাঠামোটি সম্পূর্ণ শরীয়াহসম্মত নয়। এতে প্রধানত তিনটি শরী'আতি জটিলতা বা ত্রুটি রয়েছে:
- লাইসেন্স ভাড়া নেওয়ার অবৈধতা: কোনো লাইসেন্স বা সরকারি অনুমতিপত্র মূলত কোনো বস্তুগত সম্পদ (মাল) নয়, বরং এটি একটি নিরেট অধিকার (হক্বে মুজাররাদ) । হানাফী ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, নিরেট অধিকার বা কাগজের পারমিটের ওপর সরাসরি ইজারা (ভাড়া) চুক্তি সহীহ হয় না এবং এর বিনিময়ে ফিক্সড ভাড়া দেওয়া নাযায়েয ।
- অংশীদারের জন্য নির্দিষ্ট বেতন নির্ধারণ: প্রথম অংশীদার মোঃ সুমন শিকদার এই ব্যবসায়ের একজন অংশীদার (শরীফ)। হানাফী ফিকহ অনুযায়ী, অংশীদারি কারবারে কোনো অংশীদারের জন্য কাজের বিনিময়ে নির্দিষ্ট মাসিক বেতন (Fixed Salary) নির্ধারণ করা জায়েয নয় ।
- ক্ষতি বহনের অবৈধ শর্ত: যদি সমস্ত ব্যবসায়িক মূলধন (৫,৫০,০০০ টাকা জামানত) ২য় অংশীদার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান প্রদান করেন এবং ১ম অংশীদার সুমন শিকদার কোনো আর্থিক বিনিয়োগ না করেন, তবে এটি মূলত একটি 'মুদারাবা' চুক্তি। মুদারাবা চুক্তিতে লোকসান বা আর্থিক ক্ষতি হলে তা সম্পূর্ণ মূলধন সরবরাহকারী (রব্বুল মাল) বহন করবেন। ১ম অংশীদারের ওপর আর্থিক ক্ষতির দায় চাপানো শরীয়তসম্মত নয় । আর যদি এটি 'শিরকাতুল ইনান' (অংশীদারিত্ব) হয়, তবে ক্ষতি কেবল মূলধনের অনুপাত অনুযায়ী বন্টিত হতে হবে। উভয় অংশীদারের মূলধন সমান না হওয়া সত্ত্বেও ক্ষতি ৫০:৫০ অনুপাতে বহন করার শর্ত বাতিল ও ফাসিদ।
-
শরিয়াহসম্মত করার সঠিক পদ্ধতি (Correct Method):
- মোঃ সুমন শিকদারকে লোকসানের অংশীদার করতে চাইলে তাঁকে ব্যবসার মূলধনে কিছু আর্থিক অংশ বিনিয়োগ করতে হবে (শিরকাতুল ইনান)। আর যদি তিনি কোনো মূলধন না দেন, তবে চুক্তিটি হবে 'মুদারাবা'।
- মোঃ সুমন শিকদারের শ্রমের মূল্যায়ন নির্দিষ্ট বেতনের পরিবর্তে তাঁর লভ্যাংশের পার্সেন্টেজ বাড়িয়ে করতে হবে।
- লাইসেন্সটি সরাসরি ভাড়া না নিয়ে, লাইসেন্সদাতাকে ব্যবসায় অংশীদার (পার্টনার) করা যেতে পারে, অথবা তার কোম্পানিকে নির্দিষ্ট প্রশাসনিক কাজের বিপরীতে উযরত বা সেবা মূল্য (Service Fee) দেওয়া যেতে পারে।
-
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৪শ খণ্ড): পৃষ্ঠা ১৮২ (অংশীদারিত্বের লোকসান ও শর্তাবলী) এবং পৃষ্ঠা ১৮৩ (মুদারাবার লোকসানের বিধান)।
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৬শ খণ্ড): পৃষ্ঠা ১৮৫ (হক্বে মুজাররাদের ভাড়ার অবৈধতা) ।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা ৩২০-৩২১ (যৌথ অংশীদারিত্ব অধ্যায়) ।
২. মোঃ সুমন শিকদার এবং ২য় অংশীদারের ভাইকে পারিশ্রমিক (বেতন) দেওয়ার বিধান:
-
মোঃ সুমন শিকদারের ৫০,০০০ টাকা বেতনের হুকুম:
- অবৈধ ও নাযায়েয: মোঃ সুমন শিকদার যেহেতু এই ব্যবসার একজন অংশীদার (শরীফ), তাই অংশীদারি কারবারে শরিকের জন্য নির্দিষ্ট মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হানাফী ফিকহ অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ ও ফাসিদ ।
- শরী'আহসম্মত বিকল্প: মোঃ সুমন শিকদার যেহেতু সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা ও শ্রমের কাজ করবেন এবং ২য় অংশীদার সরাসরি কাজ করবেন না, তাই মোঃ সুমন শিকদারকে লাভের অংশ বেশি দেওয়া যাবে । উদাহরণস্বরূপ, মূলধন অসমান হলেও তারা চুক্তি করতে পারেন যে, ব্যবসার মোট লাভের ৭০% পাবেন ১ম অংশীদার (মোঃ সুমন শিকদার) এবং ৩০% পাবেন ২য় অংশীদার (ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান) । এভাবে লাভের পার্সেন্টেজ বাড়িয়ে মোঃ সুমন শিকদারের শ্রমের মূল্যায়ন করা শরীয়তসম্মত ।
-
২য় অংশীদারের ভাইয়ের ২০,০০০ টাকা বেতনের হুকুম:
- বৈধ ও জায়েয: ২য় অংশীদারের ভাই যেহেতু এই ব্যবসার অংশীদার (পার্টনার) নন, বরং একজন তৃতীয় ব্যক্তি (Third Party), তাই তাকে নির্দিষ্ট মাসিক বেতনের ভিত্তিতে কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া সম্পূর্ণ জায়েয ও সহীহ । এটি শরীয়তের ইজারা (চাকরি/শ্রম নিয়োগ) চুক্তির অধীনে বৈধ।
-
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৪শ খণ্ড): পৃষ্ঠা ১৭৮-১৭৯ (শরিকের জন্য বেতন নির্ধারণের মাসআলা এবং বিকল্প পদ্ধতি) এবং পৃষ্ঠা ১৮২।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা ৩১৬-৩১৭ (অংশীদারের দায়িত্ব ও মজুরি)।
৩. অবশিষ্ট নিট লাভ ৫০:৫০ অনুপাতে ভাগ করার বিধান:
- উত্তর: হ্যাঁ, অংশীদারি ব্যবসায় নিজেদের পারস্পরিক সন্তুষ্টি ও সম্মতিতে লভ্যাংশ ৫০:৫০ বা অন্য যেকোনো অনুপাতে ভাগ করে নেওয়া সম্পূর্ণ শরীয়াহসম্মত ও জায়েয।
- শরয়ী বিশ্লেষণ: হানাফী মাযহাবের নিয়ম অনুযায়ী, অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে মূলধনের অনুপাত কম-বেশি হলেও পারস্পরিক চুক্তির ভিত্তিতে লভ্যাংশ সমান সমান (৫০:৫০) বা এক পক্ষের জন্য বেশি নির্ধারণ করা সহীহ । হাদীস শরীফে এসেছে— "মুসলমানরা তাদের পারস্পরিক শর্তানুযায়ী চুক্তিবদ্ধ থাকে" । তবে মোঃ সুমন শিকদারের নির্দিষ্ট বেতন বা ভাতার চুক্তি বাতিল করে লাভের হার সমন্বয় করতে হবে ।
- কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৪শ খণ্ড): পৃষ্ঠা ১৮২ (লভ্যাংশ বণ্টনের নিয়ম ও শর্তাবলী)।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা ৩১৬-৩১৭।
৪. ব্যবসায় লোকসান বা ক্ষতি হলে তা প্রথম ও দ্বিতীয় অংশীদারের মধ্যে বহন করার নিয়ম:
- উত্তর ও শরয়ী নিয়ম: লোকসান বা আর্থিক ক্ষতি বহনের ক্ষেত্রে শরীয়তের চিরন্তন বিধান হলো— "ক্ষতি বা লোকসান সর্বদা মূলধনের অনুপাত অনুযায়ী বন্টিত হবে" (الوضيعة على قدر المالين)। লভ্যাংশের অনুপাত নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী কম-বেশি করা গেলেও লোকসানের অনুপাত মূলধনের অনুপাতের বাইরে পরিবর্তন করা সম্পূর্ণ অবৈধ ।
- আপনাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি বহনের ক্ষেত্রে দুটি সুরত হতে পারে:
- সুরত-১ (যদি এটি 'মুদারাবা' হয়): যদি সমস্ত মূলধন (৫,৫০,০০০ টাকা জামানত) ২য় অংশীদার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান প্রদান করেন এবং ১ম অংশীদার সুমন শিকদার কোনো আর্থিক বিনিয়োগ না করেন, তবে ব্যবসায় লোকসান হলে তার ১০০% ক্ষতি ২য় অংশীদার বহন করবেন। ১ম অংশীদার মোঃ সুমন শিকদার কোনো আর্থিক ক্ষতির দায় বহন করবেন না, কারণ তিনি শ্রম বিনিয়োগ করেছেন।
- সুরত-২ (যদি এটি 'শিরকাতুল ইনান' বা অংশীদারিত্ব হয়): যদি ১ম অংশীদার মোঃ সুমন শিকদারও কিছু মূলধন বিনিয়োগ করেন (যেমন: ১ম অংশীদার দিলেন ৫০,০০০ টাকা এবং ২য় অংশীদার দিলেন ৫,৫০,০০০ টাকা), তবে ব্যবসায় ক্ষতি হলে তা উভয়ের বিনিয়োগকৃত মূলধনের অনুপাত (Capital Ratio) অনুযায়ী বন্টিত হবে। এক্ষেত্রে লোকসান ৫০:৫০ অনুপাতে বহন করার শর্ত বা চুক্তি শরীয়তসম্মত নয় এবং তা ফাসিদ ।
- কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৪শ খণ্ড): পৃষ্ঠা ১৮২ (ক্ষতি বন্টনের মৌলিক নীতি) এবং পৃষ্ঠা ১৮৩ (মুদারাবার ক্ষেত্রে ক্ষতির হুকুম) ।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা ৩২০-৩২১।
৫. শরীয়াহসম্মত ব্যবসায়িক রূপরেখা ও কাঠামো গঠন:
আপনাদের লেনদেন ও কার্যক্রমকে ১০০% হালাল ও বরকতময় করতে নিম্নোক্ত দুইটি শরীয়াহসম্মত রূপরেখার যেকোনো একটি অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়া হলো:
-
**১ম প্রস্তাবিত কাঠামো: 'শিরকাতুল ইনান' বা মুশারাকা (Musharakah) পদ্ধতি **
- কাজের বিবরণ: ১ম অংশীদার মোঃ সুমন শিকদার এবং ২য় অংশীদার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান উভয়ে মিলে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনা করবেন ।
- মূলধন: ২য় অংশীদার জামানত বাবদ ৫,৫০,০০০ টাকা দিবেন। ১ম অংশীদার সুমন শিকদারও কিছু মূলধন (যেমন: ১,০০,০০০ টাকা বা তার বেশি/কম) ব্যবসায় বিনিয়োগ করবেন।
- পারিশ্রমিক ও শ্রম: মোঃ সুমন শিকদারের ৫০,০০০ টাকা বেতন বাতিল করা হবে। যেহেতু তিনি সার্বক্ষণিক শ্রম দিবেন, তাই তার শ্রমের পারিশ্রমিক হিসেবে তার লভ্যাংশের হার বৃদ্ধি করা হবে। ২য় অংশীদারের ভাই যেহেতু অংশীদার নন, তাই তাকে ২০,০০০ টাকা মাসিক বেতনে ইজারা চুক্তির অধীনে ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।
- লাভ বণ্টন: লাভ হলে মোঃ সুমন শিকদার পাবেন ৬০% বা ৭০% এবং ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান পাবেন ৪০% বা ৩০% (বা পারস্পরিক সম্মত যেকোনো হার)।
- লোকসান বণ্টন: ক্ষতি বা লোকসান হলে তা উভয়ের বিনিয়োগকৃত মূলধনের অনুপাত (Capital Ratio) অনুযায়ী বন্টিত হবে।
- লাইসেন্স সমাধান: লাইসেন্সদাতাকে ব্যবসার লভ্যাংশের একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন: ৫% বা ১০% প্রফিট শেয়ার) দেওয়ার চুক্তিতে অংশীদার বা মুদারিব হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
-
২য় প্রস্তাবিত কাঠামো: 'মুদারাবা' (Mudarabah) পদ্ধতি
- কাজের বিবরণ: ২য় অংশীদার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান হবেন 'সাহেবুল মাল' (পুঁজিপতি) এবং ১ম অংশীদার মোঃ সুমন শিকদার হবেন 'মুদারিব' (শ্রমিক/পরিচালক) ।
- মূলধন: ২য় অংশীদার পুরো ৫,৫০,০০০ টাকা জামানত প্রদান করবেন। ১ম অংশীদার কোনো আর্থিক পুঁজি বিনিয়োগ করবেন না, কেবল তার শ্রম খাটাবেন।
- লাভ বণ্টন: ব্যবসায় যে নিট লাভ হবে, তা উভয়ের মাঝে ৫০:৫০ বা ৬০:৪০ বা যেকোনো সম্মত অনুপাতে বন্টিত হবে।
- লোকসান বণ্টন: ব্যবসায় কোনো লোকসান হলে তার আর্থিক দায় ১০০% মূলধনদাতা ২য় অংশীদার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বহন করবেন । ১ম অংশীদার মোঃ সুমন শিকদার কোনো লোকসান বহন করবেন না (তার লোকসান হলো তার খাটুনি ও সময় নষ্ট হওয়া)।
- বেতন: সুমন শিকদারের ৫০,০০০ টাকা বেতন বাতিল থাকবে, তিনি কেবল লাভের অংশ পাবেন । ২য় অংশীদারের ভাইকে ২০,০০০ টাকা বেতনে ব্যবসার কর্মচারী বা সাধারণ আজীর (শ্রমিক) হিসেবে রাখা যাবে।
-
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১৪শ খণ্ড): পৃষ্ঠা ১৭৮-১৭৯, পৃষ্ঠা ১৮২, পৃষ্ঠা ১৮৩।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা ৩১৬-৩১৭ এবং ৩২০-৩২১।
আল্লাহই ভালো জানেন।