আসসালামু আলাইকুম।কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে স্বামী কর্তৃক তালাক প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া থাকলে
Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi
Question
কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে স্বামী কর্তৃক তালাক প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া থাকলে স্ত্রী সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে তালাক দিতে পারেন।
আমার প্রশ্নগুলো হলো—
১। কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামের ক্ষমতা ব্যবহার করে স্ত্রী এভাবে তালাক দিলে শরিয়াহ অনুযায়ী তা কি গ্রহণযোগ্য?
২। এভাবে স্ত্রী তালাক দিলে শরিয়াহ অনুযায়ী কয় তালাক হিসেবে গণ্য হবে?
৩। শরিয়াহ অনুযায়ী ৯০ দিনের হিসাব কবে থেকে হবে? (রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ/চেয়ারম্যান নোটিশ পাওয়ার দিন থেকে ৯০ দিন গণনা হয়।)
৪। এই ৯০ দিনের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী পুনরায় সংসার করতে চাইলে, শুধু মুখে রুজু/পুনর্মিলন করলেই হবে, নাকি রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ীও তালাক প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে?
দয়া করে কুরআন-সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য ফিকহের কিতাবের দলিলসহ সংক্ষেপে উত্তর দিলে উপকৃত হব।
জাযাকুমুল্লাহু খায়রন।
Answer
ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। নিম্নে কুরআন-সুন্নাহ এবং সালাফি স্কলারদের মতামতের আলোকে আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া হলো:
১. কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামের ক্ষমতা ব্যবহার করে স্ত্রীর তালাক দেওয়া কি শরিয়াহসম্মত?
ইসলামি শরিয়াহতে তালাক দেওয়ার মূল ক্ষমতা স্বামীর। তবে স্বামী ইখতিয়ারে (ক্ষমতা) স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অধিকার দিতে পারে। এটি ইসলামি ফিকহের একটি স্বীকৃত বিষয়, যাকে "তাফবিজ" (تفويض الطلاق) বা তালাকের ক্ষমতা অর্পণ বলা হয়। কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে যদি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে যে, স্বামী স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করেছেন, এবং স্ত্রী সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে তালাক দেয়, তবে তা শরিয়াহ অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য হবে।
দলিল:
- আল্লাহ তাআলা বলেন: "তালাক দুইবার। এরপর হয় ভালোভাবে রাখা অথবা সৌজন্যের সাথে বিদায় দেওয়া।" (সূরা আল-বাকারা: ২২৯)
- রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সময়ে নারীদের তালাকের ক্ষমতা দেওয়ার ঘটনা রয়েছে। ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: "তালাক সেই ব্যক্তির জন্য, যে তা গ্রহণ করে (অর্থাৎ স্বামী), আর শর্ত সেই ব্যক্তির জন্য, যে তা করে (অর্থাৎ স্ত্রী, যদি শর্ত দেওয়া হয়)।" (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২০৮১, সিলসিলা সহিহাহ: ১৩৭১ - শায়খ আলবানী সহিহ বলেছেন)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা দেয়, তবে স্ত্রী তা ব্যবহার করতে পারবে। এটি বৈধ এবং এতে তালাক পতিত হবে।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ৩৩/৮৫)
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেয়, এবং স্ত্রী তা ব্যবহার করে, তাহলে তা একটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে, যদি না স্বামী সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয়।" (আশ-শারহুল মুমতি': ১৩/২৯০)
২. এভাবে স্ত্রী তালাক দিলে কয় তালাক গণ্য হবে?
যদি স্ত্রী তালাকের ক্ষমতা ব্যবহার করে একবার তালাক দেয়, তবে তা একটি তালাকে বায়িন (অপারক তালাক) হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ, এটি একটি তালাক, যা রজয়ী (প্রত্যাবর্তনযোগ্য) নয়, বরং বায়িন (অপারক) হবে। এরপর স্বামী-স্ত্রী পুনরায় একসাথে থাকতে চাইলে নতুন মোহর ও নতুন চুক্তিতে পুনর্বিবাহ করতে হবে।
দলিল:
- শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "যখন স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেওয়া হয় এবং সে তা ব্যবহার করে, তখন তা একটি তালাক গণ্য হবে, এবং তা বায়িন তালাক।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ৩৩/৮৫)
- শায়খ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দেয় এবং স্ত্রী তা ব্যবহার করে, তবে তা একটি তালাক হবে, এবং স্বামী চাইলে নতুন বিবাহের মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে নিতে পারবে।" (মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বায: ২২/১৬০)
৩. শরিয়াহ অনুযায়ী ৯০ দিনের (ইদ্দত) হিসাব কবে থেকে শুরু হবে?
শরিয়াহ অনুযায়ী ইদ্দত (তালাকের পর অপেক্ষার সময়) গণনা করা হয় তালাক পতিত হওয়ার দিন থেকে, কোনো রাষ্ট্রীয় নোটিশ বা আদালতের সিদ্ধান্ত থেকে নয়। যেহেতু স্ত্রী তালাক দিয়েছে, তাই তালাক পতিত হওয়ার সাথে সাথেই ইদ্দত শুরু হবে।
দলিল:
- আল্লাহ তাআলা বলেন: "আর তালাকপ্রাপ্তা নারীরা নিজেদের জন্য তিন হায়েজ (পিরিয়ড) পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।" (সূরা আল-বাকারা: ২২৮)
- যেসব নারীর পিরিয়ড হয় না বা যাদের বয়স হয়েছে, তাদের জন্য ইদ্দত তিন মাস। আল্লাহ বলেন: "তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যাদের ঋতুবর্তিতা সম্পর্কে তোমরা নিরাশ হয়েছ, যদি তোমরা সন্দেহ কর, তবে তাদের ইদ্দত তিন মাস।" (সূরা আত-তালাক: ৪)
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "ইদ্দত তালাক পতিত হওয়ার দিন থেকে গণনা করা হবে, কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন: 'তালাকপ্রাপ্তা নারীরা...' অর্থাৎ তালাক পতিত হওয়ার পর থেকে।" (আশ-শারহুল মুমতি': ১৩/৩২০)
সুতরাং, রাষ্ট্রীয় আইনে নোটিশ পাওয়ার দিন থেকে ৯০ দিন গণনা করা হলেও, শরিয়াহ অনুযায়ী ইদ্দত তালাক পতিত হওয়ার দিন থেকেই শুরু হবে।
৪. ৯০ দিনের মধ্যে পুনরায় সংসার করতে চাইলে শুধু মুখে রুজু করলেই হবে, নাকি রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে?
যেহেতু স্ত্রীর দেওয়া তালাকটি বায়িন তালাক (অপারক তালাক), তাই এই তালাকের পর স্বামী-স্ত্রী পুনরায় একসাথে থাকতে চাইলে শুধু মুখে রুজু করলে হবে না। বরং তাদেরকে নতুন মোহর নির্ধারণ করে নতুন বিবাহ চুক্তি (নিকাহ) সম্পন্ন করতে হবে। কারণ বায়িন তালাকের পর স্বামীর ফিরিয়ে নেওয়ার অধিকার থাকে না।
দলিল:
- আল্লাহ তাআলা বলেন: "অতঃপর যদি সে তাকে তালাক দেয় (তৃতীয়বার), তবে তারপর সে তার জন্য বৈধ হবে না, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিবাহ করে।" (সূরা আল-বাকারা: ২৩০)
- তবে এটি তৃতীয় তালাকের ক্ষেত্রে। প্রথম বা দ্বিতীয় বায়িন তালাকের ক্ষেত্রে নতুন নিকাহের মাধ্যমে ফিরে আসা যায়। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: "বায়িন তালাকের পর স্বামী চাইলে নতুন মোহর ও নতুন চুক্তিতে তাকে পুনর্বিবাহ করতে পারবে।" (মাজমুউল ফাতাওয়া: ৩৩/৮৫)
রাষ্ট্রীয় আইনের প্রসঙ্গ: রাষ্ট্রীয় আইনে তালাক প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা আবশ্যক, কারণ ইসলামি রাষ্ট্র বা মুসলিম দেশে রাষ্ট্রীয় আইন মেনে চলা জরুরি, যতক্ষণ না তা শরিয়াহর পরিপন্থী হয়। তবে শরিয়াহ অনুযায়ী মূল বিষয় হলো নতুন নিকাহ সম্পন্ন করা। রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া একটি আনুষ্ঠানিকতা, যা বৈধতা ও নথিভুক্তির জন্য প্রয়োজন। তাই শরিয়াহ ও রাষ্ট্রীয় আইন উভয়ই মেনে চলা উচিত।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
১. হ্যাঁ, কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামের ক্ষমতা ব্যবহার করে স্ত্রীর তালাক দেওয়া শরিয়াহসম্মত, যদি শর্তটি স্পষ্ট থাকে।
২. এটি একটি তালাকে বায়িন হিসেবে গণ্য হবে।
৩. ইদ্দত তালাক পতিত হওয়ার দিন থেকে শুরু হবে, রাষ্ট্রীয় নোটিশ থেকে নয়।
৪. বায়িন তালাকের পর শুধু মুখে রুজু যথেষ্ট নয়; নতুন নিকাহ করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা উচিত।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।