এই বাড়তি টাকা কি হালাল হবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
সমিতির অন্য সদস্যদের প্রয়োজন পরলেও এখান থেকে টাকা নেয়। এবং মাসে মাসে দিয়ে শোধ করে কিস্তির মতো এবং টাকা হাতে থাকলে সবগুলোই পরিশোধ করে দেয়, এবং তারা নিজে থেকেই কিছু বাড়তি দেয়ার ইচ্ছা প্রষোন করে। এবং তারা আমাকে বলে দিতে বলে কত টাকা অতিরিক্ত দিবে। এখানে যেহেতু সম্পূর্ণ টাকাটা আমার না, আমি যদি বলে দেই এত টাকা বেশি দিয়ে দিয়েন, এতে কি সমিতির টাকা হারাম হয়ে যাবে? আর আমি যেভাবে টাকা দেই সেটা কি হালাল হচ্ছে?
Answer
উত্তরের সারসংক্ষেপ
আপনার প্রশ্নটি একটি সমিতি (কমিটি) ব্যবস্থা নিয়ে, যেখানে সদস্যরা মাসিক চাঁদা জমা দেন এবং আপনি সেই টাকা ব্যবসায় ব্যবহার করেন। এই লেনদেনের বিধান জানতে চান।
মূল উত্তর
১. সদস্যদের ঋণ পরিশোধের সময় অতিরিক্ত টাকার পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়ার বিধান:
-
অতিরিক্ত টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম (সুদ): সমিতির সদস্যদের প্রয়োজনে ফান্ড থেকে যে টাকা দেওয়া হয় এবং তারা পরবর্তীতে কিস্তিতে বা একবারে তা শোধ করে, শরী'আতের পরিভাষায় তা হলো 'কর্জ' বা ঋণ।
-
ঋণের ক্ষেত্রে ইসলামি শরী'আতের অকাট্য ও সর্বসম্মত মূলনীতি হলো— "যে ঋণ কোনো প্রকার মুনাফা বা অতিরিক্ত সুবিধা টেনে আনে, তা সুদের অন্তর্ভুক্ত" (كل قرض جر منفعة فهو ربا) ।
-
ঋণগ্রহীতা যদি ঋণদাতার কোনো পূর্বশর্ত, চুক্তি, ইঙ্গিত বা প্রত্যাশা ছাড়া সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঋণ পরিশোধের সময় খুশি হয়ে মূল টাকার অতিরিক্ত কিছু বেশি দেয়, তবে তা গ্রহণ করা জায়েয ও প্রশংসনীয়। হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— "নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে উত্তমরূপে ঋণ পরিশোধ করে"।
-
কিন্তু এখানে বড় শরয়ী জটিলতাটি হলো: যখন সমিতির সদস্যরা অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে আপনার কাছে জানতে চায় যে— "কত টাকা অতিরিক্ত দিবে?" আর আপনি যদি তাদের মুখে বলে দেন যে— "এত টাকা বেশি দিয়ে দিয়েন"—তখন এটি আর তাদের ঐচ্ছিক বা নিঃশর্ত দান থাকে না; বরং এটি নির্ধারিত অতিরিক্ত পাওনা বা সুদে (Riba) রূপান্তরিত হয়ে যায়।
-
অতএব, আপনার পক্ষ থেকে অতিরিক্ত টাকার কোনো পরিমাণ বা হার নির্ধারণ করে দেওয়া কোনোভাবেই জায়েয হবে না। যদি আপনি মুখে কোনো পরিমাণ নির্ধারণ করে দেন, তবে সমিতির সেই অতিরিক্ত টাকা সম্পূর্ণ হারাম ও সুদ হিসেবে গণ্য হবে।
-
সঠিক ও শরয়ী পদ্ধতি: যখন কোনো সদস্য অতিরিক্ত দিতে চাবে, আপনি স্পষ্ট ভাষায় তাকে বলবেন— "এটি একটি কর্জ বা ঋণ, তাই অতিরিক্ত কোনো টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া শরীয়তে সম্পূর্ণ হারাম। আপনার খুশিমতো আপনি যা ইচ্ছে দিতে পারেন, তবে আমার পক্ষ থেকে কোনো পরিমাণ বা বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়" ।
-
কিতাব ও পৃষ্ঠা নির্দেশিকা:
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা ২৫৮ ও পৃষ্ঠা ২৯৭-২৯৮ ("ডেবিট কার্ড ও ক্রেডিট কার্ড" পরিচ্ছেদের অধীনে সুদের আলোচনা)।
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা ২৯৮-২৯৯ ("কিস্তিতে ক্রয়-বিক্রয়ের শর'য়ী বিধান" পরিচ্ছেদের অধীনে ৩য় ও ৪র্থ মূলনীতি)।
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা ১৯৩-১৯৪ ও পৃষ্ঠা ১৮০।
২. সমিতির টাকা নিজের ব্যবসায় ব্যবহার করা এবং ফান্ডে স্বেচ্ছায় অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার বিধান:
-
আপনার অতিরিক্ত টাকা দেওয়া হালাল হচ্ছে: সমিতির সদস্যদের টাকা মূলত আপনার কাছে 'আমানত' হিসেবে থাকার কথা [৩৪৩]। আপনি যদি তাদের সবার সুস্পষ্ট অনুমতি নিয়ে সেই টাকা নিজের ব্যক্তিগত ব্যবসায় খাটান, তবে ফিকহের দৃষ্টিতে তা আপনার ওপর 'কর্জ' বা ঋণ হিসেবে গণ্য হবে।
-
যেহেতু টাকাটি আপনার ওপর কর্জ, সেহেতু সমিতির সাথে কোনো পূর্বচুক্তি, শর্ত, অলিখিত প্রত্যাশা বা হার নির্ধারণ করা ছাড়া আপনি যদি আপনার নিজের খুশিমতো ("যখন যা মন চায়, খুশি হয়ে") সমিতির ফান্ডে কিছু অতিরিক্ত টাকা বা লাভ প্রদান করেন, তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে 'তবাররু' বা ঐচ্ছিক দান হিসেবে সম্পূর্ণ হালাল ও জায়েয।
-
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ নসীহত ও উত্তম পদ্ধতি: আমানতের টাকা ব্যক্তিগত ব্যবসায় ব্যবহার করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকা উচিত। আপনারা আত্মীয়রা মিলে যেহেতু একটি সমিতি করেছেন, তাই এই কর্জের লেনদেনটিকে আরও নিরাপদ, স্বচ্ছ ও সংশয়মুক্ত করতে 'মুদারাবা' (Mudarabah) বা 'শারিকাতুল ইনান' (অংশীদারিত্ব) চুক্তিতে রূপান্তর করে নেওয়া সবচেয়ে উত্তম। সেক্ষেত্রে ব্যবসার লাভ-ক্ষতি সবার মাঝে মূলধনের অনুপাত অনুযায়ী বা সুনির্দিষ্ট চুক্তির মাধ্যমে বন্টিত হবে, যা আপনাদের পুরো উপার্জনকে ১০০% নিরাপদ ও বরকতময় করবে।
-
কিতাব ও পৃষ্ঠা নির্দেশিকা:
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা ২৯৮-২৯৯ এবং পৃষ্ঠা ১৭৬ ("প্রভিডেন্ট ফান্ডের যাকাত সংক্রান্ত মাসআলা")।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা ৪৪৪ ("যৌথ উত্তরাধিকার সম্পদে হস্তক্ষেপ" পরিচ্ছেদের অধীনে অনুমতি সহকারে ব্যবহারের বিবরণ) ও পৃষ্ঠা ৪৪৭।
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা ৩৪৮ ও পৃষ্ঠা ১৬৭।