যা তালাক বললে কি তালাক হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
আস সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ
প্রশ্নটি মনোযোগ সহকারে পড়েছি। আপনার দুশ্চিন্তা বুঝতে পারছি। আসুন, কুরআন-হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিষয়টি পরিষ্কার করি।
উত্তর:
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনাটি দুটি ভাগে বিভক্ত:
১. প্রথম ঘটনা: "তালাক দিবো" বলার পর "দিছি তো দিছি" বলা
যখন আপনার স্বামী বলেছিলেন "তালাক দিবো" (ভবিষ্যৎ অর্থে), তখন এটি তালাক হয় না। কারণ এটি ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। এরপর আপনি জিজ্ঞেস করায় তিনি রাগে বলেছিলেন "দিছি তো দিছি" — কিন্তু তিনি আগে তালাক দেননি, তাই এটি শুধু রাগের বশে বলা কথা। যেহেতু তিনি প্রকৃতপক্ষে তালাক দেননি, তাই এতে তালাক কার্যকর হয়নি। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৩)
২. দ্বিতীয় ঘটনা: "যা তালাক যা তালাক" ২ বার বলা
এখন মূল প্রশ্ন হলো, "যা তালাক যা তালাক" বলার মাধ্যমে তালাক হয়েছে কিনা।
হানাফি ফিকহের নিয়ম:
- যদি স্বামী রাগের অবস্থায় "তালাক" শব্দ উচ্চারণ করে এবং তার উদ্দেশ্য থাকে তালাক দেওয়া, তাহলে তালাক পতিত হবে।
- তবে যদি তিনি বলেন যে, "আমার মাথা ঠিক ছিল না, আমি কী বলছি খেয়াল করিনি" — অর্থাৎ তিনি এতটাই রাগান্বিত ছিলেন যে তার কথার উপর নিয়ন্ত্রণ ছিল না, তাহলে এই অবস্থায় তালাক পতিত হবে কিনা তা নির্ভর করে রাগের মাত্রার উপর।
রাগের তিনটি স্তর (হানাফি ফিকহ):
১. হালকা রাগ: যে রাগে মানুষ বুঝে-শুনে কথা বলে — এ অবস্থায় তালাক পতিত হবে।
২. মাঝারি রাগ: যে রাগে মানুষ জানে সে কী বলছে, কিন্তু পরিণাম সম্পর্কে ভাবতে পারে না — এ অবস্থায়ও তালাক পতিত হবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৩)
৩. চরম রাগ (ইতলাq): যে রাগে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়ে যায়, সে কী বলছে তা-ই বুঝতে পারে না, এমনকি অনেক সময় অজ্ঞানও হয়ে যায় — এ অবস্থায় তালাক পতিত হবে না। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৫)
আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান:
আপনার স্বামী বলছেন যে, "অনেক রাগে মাথা ঠিক ছিল না, তাই বলেছি ঐভাবে।" কিন্তু তিনি কি সম্পূর্ণ অজ্ঞান ছিলেন বা তার জ্ঞান লোপ পেয়েছিল? সাধারণত মানুষ রাগে "মাথা ঠিক থাকে না" বলতে বোঝায় যে, সে আবেগের বশবর্তী হয়ে কথা বলেছে, কিন্তু সে কী বলছে তা জানে। এই অবস্থায় হানাফি ফিকহ অনুযায়ী তালাক পতিত হয়ে যায়।
তবে, যদি তিনি সত্যিই এমন চরম রাগে ছিলেন যে, তার জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছিল এবং তিনি বুঝতেই পারেননি কী বলছেন — তাহলে তালাক পতিত হবে না। কিন্তু এই দাবি প্রমাণ করা খুবই কঠিন।
বাস্তবিক সিদ্ধান্ত:
যেহেতু আপনার স্বামী "যা তালাক যা তালাক" স্পষ্টভাবে ২ বার উচ্চারণ করেছেন এবং আপনি তা শুনেছেন, তাই হানাফি ফিকহ অনুযায়ী ২টি তালাক পতিত হয়ে গেছে। কারণ:
- তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি এ কথা বলেছেন
- তিনি বলছেন "রাগে বলেছি" — কিন্তু রাগ তালাক পতিত হওয়ার مانع নয়, যতক্ষণ না চরম রাগে জ্ঞান লোপ পায়
- "যা তালাক" শব্দটি স্পষ্ট তালাকের শব্দ (সরীহ), যাতে নিয়তের প্রয়োজন হয় না
ফলাফল:
- ২টি তালাক পতিত হয়েছে (প্রথম ঘটনাটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে না, শুধু দ্বিতীয় ঘটনার ২টি তালাক গণ্য হবে)
- ২টি তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়
- তবে ৩টি তালাক না হওয়ায় হালালা ছাড়া পুনরায় বিয়ে করা যাবে না — অর্থাৎ স্ত্রীকে অন্য কাউকে বিয়ে করতে হবে, সেই বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর (বা স্বামীর মৃত্যুর পর) ইদ্দত শেষে আগের স্বামীর সাথে পুনরায় বিয়ে করা যাবে
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
১. এই অবস্থায় স্থানীয় কোনো বিশ্বস্ত মুফতির কাছে গিয়ে বিষয়টি খুলে বলুন এবং তার কাছ থেকে পরামর্শ নিন। ২. স্বামী যদি বলেন যে, তার জ্ঞান লোপ পেয়েছিল, তাহলে তাকে প্রমাণ করতে হবে — কিন্তু সাধারণত এটা প্রমাণ করা কঠিন। ৩. বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর — ইন্টারনেটের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে সরাসরি মুফতির শরণাপন্ন হোন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।