আড়াই বছর বয়সী শিশুর সাথে মায়ের স্পর্শে হুরমত মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
বাচ্চার বয়স আড়াই বছর হলে তার সাথে মায়ের স্পর্শে হুরমত মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে? যদি হুরমত সাব্যস্ত হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয়।
Answer
উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো, আড়াই বছর বয়সী শিশুর সাথে মায়ের স্পর্শে হুরমত মুসাহারাত (বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে সৃষ্ট আত্মীয়তার বাধা) সাব্যস্ত হবে না।
আপনি যে শর্তটি উল্লেখ করেছেন—"যদি হুরমত সাব্যস্ত হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয়"—তা ইসলামি ফিকহের (হানাফি মাযহাব) আলোকে সম্পূর্ণ ভুল ও অজ্ঞতাপ্রসূত ধারণা। ইসলামি আইনে একজন আড়াই বছর বয়সী শিশুর সাথে এমন কোনো শারীরিক সম্পর্কের কথা কল্পনাই করা যায় না, যা হুরমত মুসাহারাত সাব্যস্ত করার কারণ হতে পারে।
হুরমত মুসাহারাত সাব্যস্ত হওয়ার শর্ত (হানাফি ফিকহ)
হানাফি মাযহাবের প্রধান গ্রন্থসমূহ (যেমন: আল-হিদায়াহ, রদ্দুল মুহতার, ফাতাওয়া আলমগীরি) অনুযায়ী, হুরমত মুসাহারাত সাব্যস্ত হওয়ার জন্য শুধুমাত্র স্পর্শ (লামস) যথেষ্ট নয়। এর জন্য শাহওয়াত (যৌনক্ষুধা/কামভাব) সহ স্পর্শ হওয়া আবশ্যক।
১. স্পর্শের সংজ্ঞা ও শর্ত:
- ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) -এর মতে, হুরমত সাব্যস্ত হওয়ার জন্য সরাসরি চামড়ায় চামড়া স্পর্শ এবং সাথে সাথে শাহওয়াত (যৌনক্ষুধা) সৃষ্টি হওয়া জরুরি।
- ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) -এর মতে, শাহওয়াত সৃষ্টি হওয়া জরুরি, তবে তারা মনে করেন যে, সাধারণত পুরুষের স্পর্শে শাহওয়াত সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক, তাই তারা স্পর্শকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। কিন্তু এই মতানৈক্য শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
২. শিশুর ক্ষেত্রে বিধান:
- আড়াই বছর বয়সী শিশু (ছেলে বা মেয়ে) কোনোভাবেই শাহওয়াতের বিষয় হতে পারে না।
- ইসলামি ফিকহের পরিভাষায়, যে শিশুর বয়স নয় বছর (কিছু বর্ণনায় সাত বছর) এর কম, তার সাথে স্পর্শে কোনো হুরমত সাব্যস্ত হয় না। কারণ, এ বয়সের শিশু সাধারণত "শাহওয়াতের পাত্র" (যৌনক্ষুধা জাগানোর উপযুক্ত) নয়।
- ফাতাওয়া আলমগীরি এবং রদ্দুল মুহতার-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, "যে শিশু শাহওয়াতের পাত্র নয় (অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্ক ও নাবালক), তার সাথে স্পর্শে হুরমত মুসাহারাত সাব্যস্ত হয় না।"
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ
আপনি লিখেছেন, "বাচ্চার বয়স আড়াই বছর হলে তার সাথে মায়ের স্পর্শে হুরমত মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে? যদি হুরমত সাব্যস্ত হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা হয়।"
- "হুরমত সাব্যস্ত হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা" বলতে আপনি যদি বোঝাতে চান যে, শিশুটি যদি এমন কোনো আচরণ করে যা প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে হুরমত সাব্যস্ত করত, তাহলে সেটি সম্পূর্ণ ভুল। আড়াই বছরের শিশুর পক্ষে এমন কোনো শারীরিক বা মানসিক অবস্থা সম্ভব নয় যা ইসলামি আইনে "শাহওয়াত" হিসেবে গণ্য হবে।
- মায়ের স্পর্শ: মা তার সন্তানকে আদর করা, কোলে নেওয়া, দুধ খাওয়ানো, জড়িয়ে ধরা—এসব সম্পূর্ণ বৈধ ও স্বাভাবিক। এতে কোনো প্রকার হুরমত মুসাহারাত সাব্যস্ত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
- সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলেও: এমনকি সন্তান বড় হয়ে গেলেও, মা-ছেলের মধ্যে স্বাভাবিক মাতৃত্বপূর্ণ স্পর্শ (যেমন: মাথায় হাত বুলানো, কপালে চুমু) হুরমত সাব্যস্ত করে না, যতক্ষণ না তা শাহওয়াতের সাথে হয় (যা অত্যন্ত গর্হিত ও নিষিদ্ধ)।
কুরআন ও হাদিসের আলোকে
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমাদের সেই মায়েরা হারাম (বিবাহের জন্য) যারা তোমাদেরকে স্তন্যপান করিয়েছে এবং তোমাদের দুধ-বোনেরা..." (সূরা আন-নিসা: ২৩)
এই আয়াতে হুরমত মুসাহারাতের মূলনীতি বর্ণিত হয়েছে, যা শুধুমাত্র বৈধ ও স্বাভাবিক বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমেই সাব্যস্ত হয়। একটি শিশুর সাথে মায়ের স্বাভাবিক স্পর্শ কখনোই এর অন্তর্ভুক্ত নয়।
হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"হালাল ও হারামের মধ্যে যা সন্দেহজনক, তা পরিত্যাগ করো।" (বুখারি, মুসলিম)
আপনার প্রশ্নটি সম্পূর্ণ সন্দেহজনক ও ভিত্তিহীন। ইসলামে এমন কোনো বিধান নেই যা আড়াই বছরের শিশুর সাথে মায়ের স্পর্শকে হারাম বা হুরমত সাব্যস্তকারী বলে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর: না, আড়াই বছর বয়সী শিশুর সাথে মায়ের স্পর্শে হুরমত মুসাহারাত সাব্যস্ত হবে না। এমনকি যদি শিশুটি ছেলে হয় এবং মা তাকে জড়িয়ে ধরে, আদর করে, তাহলেও কোনো সমস্যা নেই। এটি সম্পূর্ণ বৈধ ও স্বাভাবিক মাতৃত্বপূর্ণ আচরণ।
আপনার জন্য পরামর্শ: আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ যদি এই ধরনের ভিত্তিহীন ওয়াসওয়াসা (শয়তানি প্ররোচনা) বা ভুল ধারণায় আক্রান্ত হন, তাহলে তা দূর করার জন্য: ১. বিশ্বস্ত আলেমের কাছে সরাসরি প্রশ্ন করুন এবং তার কাছ থেকে জেনে নিন। ২. ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে বেশি বেশি দরুদ শরিফ পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুন। ৩. মনে রাখবেন, ইসলাম ধর্ম সহজ। নিজের সন্তানকে আদর করা, স্নেহ করা—এটি ইবাদত। এতে কোনো প্রকার হারাম বা হুরমতের প্রশ্ন নেই।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। (আমিন)