তালাক নিয়ে
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
একদিন আমি আর আমার স্বামী খাবার খাচ্ছিলাম। তখন আমি আমার আপুর কথা বলছিলাম যে, দুলাভাইয়ার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে আপুকে ডিভোর্স দিয়ে দিত। এটা শুনে আমার স্বামী বললেন, ভাইয়ার জায়গায় আমি থাকলে কি করতাম জানো? এটা শুনেই আমি উনার মুখ চেপে ধরলাম। এরপর উনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, এমন করলাম কেন? আমি বললাম, বউ এর সামনে তালাক শব্দ টা উচ্চারণ করলেই তালাক হয়ে যায়। তাই এমন করেছি। উনি বলেন,, তোমার তালাক দেওয়া….(পুরো কথা শুনিনি আমি) আর বলেন, আরে আমি বলতে চাইছিলাম, ভাইয়ার জায়গায় আমি থাকলে কিভাবে মানাতাম। আর তুমি এটাকে কি বানাই দিলা। আজব।
আর শুনো, ডিভোর্স বললেই ডিভোর্স হয়ে যাবে না। ডিভোর্স একটা শব্দ।
তখন উনি সাথে সাথে বলেছেন,, ডিভোর্স ডিভোর্স। এতেই কি ডিভোর্স হয়ে যাবে? আমার তোমাকে ডিভোর্স দেওয়া ইচ্ছাও নাই। আর কেন ডিভোর্স দিব?
তখন উনি আমাকে উদাহরণ দিলেন যে, ধরো, আমি বললাম, আমার ফ্রেন্ডের সাথে ওর ওয়াইফ এর ডিভোর্স হয়ে গেছে। এতে ডিভোর্স বলায় তুমি তালাক হয়ে যাবে? কিভাবে! তখন উনি আমার সাথে অনেক রাগ করেন।
এর কিছুক্ষণ পর, উনি অনলাইনে উপরের পুরো ঘটনা লিখে সার্চ করেন। ওখানে লেখা ছিল, নিয়ত আর সম্বোধন ছাড়া শুধু স্রীকে বুঝাতে তালাক বললে তালাক হবে না। তখন আমার মন খারাপ দেখে, উনি আমাকে আবার তালাকের বিধান বুঝানোর জন্য বলেন যে, শুনো, আমি তালাক বলছি, এতেই তালাক হয়ে যাবে না। তারপর নিজে নিজে বলেন,, তালাক বলছি। তাতেই নাকি তালাক হয়ে যাবে!! আর আমাকে বলেন, তুমি তালাক শব্দ শুনলে এমন আতঙ্কিত হয়ে যাও কেন! উনি আরও বলেন, তালাক দিতে একটা ভিত্তি লাগে,, এভাবে বলতে হবে, ধরো, করিম বলতেছে, আমি করিম আমার ওয়াইফকে সুস্থ মস্তিষ্কে তালাক দিলাম তাহলে হবে। শুধু তালাক বললে হবে কেন? ধরো, আমি আমার মেয়েকে তালাকের বিধান শিখাচ্ছি। এখানে তালাক বলায় তুমি তালাক হয়ে যাবে? কিভাবে!!
তখন উনি অভিনয় করে দেখান, তালাক শব্দ শুনলে আমি কেমন করি। উনার অভিনয় ছিল এমন,
উনি তালাক বলে আমার মুখ চেপে ধরেন। তারপর বলেন, তুমি এমন করো আমার সাথে। এগুলো ভালো মানুষের কাজ না।
তারপর আর আলোচনা হয়নি এসব নিয়ে।
হুজুর, আমি এখন অনেক চিন্তায় আছি আমাদের তালাক হয়ে গেছে কি না।
আমার স্বামী আমাকে তালাক দিতে চান না। তালাকের কথা শুনলেই রাগ দেখান। আমার তালাক নিয়ে ওয়াসওয়াসা আছে।।আমি প্রায় এসব নিয়ে উনাকে জিজ্ঞাসা করলে উনি আমাকে বকা দিতেন। দয়া করে আমাকে বলুন, আমাদের বিয়ে ঠিক আছে কি না।
আমরা হানাফী মাযহাব অনুসরণ করে নিজেরা বিয়ে করেছিলাম এবং এই মাযহাব অনুসরণ করি।
তাই তালাকের মাসআলা হানাফী মাযহাব অনুযায়ী দিবেন দয়া করেন।
হুজুর, এই ঘটনার কিছুদিন পর আমার স্বামীর চাকরি চলে যায়। আমরা উভয়ই চিন্তিত যে, হঠাৎ করেই কেন চাকরি চলে গেল! উনি আমাকে বলেন যে এখন খারাপ সময় যাচ্ছে একটু ধৈর্য ধরো। কিন্তু আমার মনে ভয় হচ্ছে যে, তালাক হয়ে গেছে কি না। আমরা কি হারাম সম্পর্কে আছি!
Answer
তালাক সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনার বিবরণ অনুযায়ী, আপনার স্বামী বিভিন্ন সময়ে "তালাক" এবং "ডিভোর্স" শব্দগুলো উচ্চারণ করেছেন, কিন্তু সেগুলো কি তালাক হিসেবে গণ্য হবে? আপনি জানতে চাইছেন আপনার বিবাহ এখনও বৈধ আছে কিনা।
হানাফী মাযহাব অনুযায়ী মাসআলা
১. তালাকের শর্তাবলী
হানাফী মাযহাব অনুযায়ী তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য তিনটি মূল শর্ত রয়েছে:
- স্পষ্ট নিয়ত (ইরাদাহ) - তালাক দেওয়ার ইচ্ছা
- সম্বোধন (মুখাতাবাহ) - স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলা
- সুস্পষ্ট শব্দ ব্যবহার - "তালাক" বা এর সমার্থক স্পষ্ট শব্দ
কুরআন ও হাদীসের আলোকে:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তালাক দুইবার, তারপর হয় ভালোভাবে রাখা অথবা সৌজন্যের সাথে বিদায় দেওয়া।" (সূরা আল-বাকারা: ২২৯)
২. আপনার ঘটনার বিশ্লেষণ
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করছি:
ক. প্রথম ঘটনা:
- আপনার স্বামী বলেছিলেন: "ভাইয়ার জায়গায় আমি থাকলে কি করতাম জানো?"
- আপনি মুখ চেপে ধরায় তিনি বলেছিলেন: "তোমার তালাক দেওয়া..." (অসম্পূর্ণ বাক্য)
- বিশ্লেষণ: এটি একটি অসম্পূর্ণ বাক্য ছিল এবং তালাকের নিয়তে বলা হয়নি। এটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।
খ. দ্বিতীয় ঘটনা:
- আপনার স্বামী বলেছিলেন: "ডিভোর্স ডিভোর্স"
- বিশ্লেষণ: এটি তালাক দেওয়ার নিয়তে বলা হয়নি, বরং তালাকের ধারণা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, "ডিভোর্স" শব্দটি আরবী "তালাক"-এর সমার্থক হলেও, এটি ব্যবহারের সময় নিয়ত গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু এখানে তালাকের নিয়ত ছিল না, তাই এটি তালাক হবে না।
গ. তৃতীয় ঘটনা:
- আপনার স্বামী বলেছিলেন: "শুনো, আমি তালাক বলছি, এতেই তালাক হয়ে যাবে না।"
- তারপর নিজে নিজে বলেছিলেন: "তালাক বলছি"
- বিশ্লেষণ: এটি ছিল তালাকের বিধান বোঝানোর উদ্দেশ্যে, তালাক দেওয়ার নিয়তে নয়। এটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।
ঘ. চতুর্থ ঘটনা:
- আপনার স্বামী অভিনয় করে "তালাক" শব্দ উচ্চারণ করে আপনার মুখ চেপে ধরেছিলেন
- বিশ্লেষণ: এটি ছিল আপনার প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্য অভিনয়, তালাকের নিয়তে নয়। এটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।
গুরুত্বপূর্ণ নীতি
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন:
"তালাকের ক্ষেত্রে নিয়ত (ইরাদাহ) অপরিহার্য। যদি কেউ তালাকের নিয়ত ছাড়া শুধু শব্দ উচ্চারণ করে, তবে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না, যদি না তা স্পষ্ট ও সুস্পষ্ট শব্দে স্ত্রীকে সম্বোধন করে বলা হয়।"
ফাতাওয়া আলমগীরী-তে উল্লেখ আছে:
"যদি কেউ তালাকের আলোচনা করতে গিয়ে বা তালাকের বিধান বোঝাতে গিয়ে 'তালাক' শব্দ উচ্চারণ করে, তবে তা তালাক হবে না, যতক্ষণ না তালাকের নিয়ত থাকে।"
ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ) সম্পর্কে
আপনার মধ্যে তালাক নিয়ে যে ওয়াসওয়াসা (সন্দেহ) তৈরি হচ্ছে, এটি শয়তানের প্ররোচনা। মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন:
"তালাক নিয়ে অতিরিক্ত সন্দেহ-ওয়াসওয়াসা করা উচিত নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত স্পষ্টভাবে তালাক কার্যকর না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত বিবাহ বৈধ থাকবে।"
হাদীসে এসেছে: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং যা করতে বাধ্য করা হয় তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।" (সহীহ মুসলিম: ১২৬৩)
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর
আপনার বিবাহ এখনও বৈধ আছে। আপনার বর্ণিত কোনো ঘটনাতেই তালাক কার্যকর হয়নি। কারণ:
- কোনো ঘটনাতেই তালাকের স্পষ্ট নিয়ত ছিল না
- কোনো ঘটনাতেই স্ত্রীকে সম্বোধন করে তালাক দেওয়া হয়নি
- সবগুলো ঘটনাই ছিল তালাকের আলোচনা, বিধান বোঝানো বা অভিনয়
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, তালাকের জন্য নিয়ত অপরিহার্য। যেহেতু আপনার স্বামীর কোনো ঘটনাতেই তালাকের নিয়ত ছিল না, তাই কোনো তালাকই কার্যকর হয়নি।
চাকরি চলে যাওয়া প্রসঙ্গে
চাকরি চলে যাওয়া তালাকের সাথে সম্পর্কিত নয়। এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে বোঝা চাপান না।" (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬)
আপনার উচিত ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা।
উপদেশ
১. তালাক নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা ও ওয়াসওয়াসা করা থেকে বিরত থাকুন ২. স্বামীর সাথে ভালোভাবে কথা বলে বিষয়টি বুঝে নিন ৩. প্রয়োজনে স্থানীয় কোনো আলেমের সাথে পরামর্শ করুন ৪. নামাজ ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।