স্ত্রী কর্তৃক তালাক সংক্রান্ত বিষয় জানতে চাই

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 4728
Questioner: Lucky Akter
Question Asked: 01 Sep 2026, 12:33 PM
Reviewed & Published: 01 Sep 2026, 12:47 PM
Views: 29
Tokens: 7,084
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম

৩ বছর আগে আমি আমার স্বামী সাথে ঝগড়া করে বলেছিলাম ডিভোর্স লেটার পাঠাই দিব। তখন আমার স্বামী বলে ওকে পাঠাই দিও।।পরের দিন স্বামী মেসেজ দিয়ে বলে কই ডিভোর্স লেটার পাঠালে না তো।।আমি বললাম মেয়েরা পাঠাতে পারে না,,আপনি পাঠান আমি সই করে দিব।।।

স্বামী বলে আমি কেন পাঠাব আমি তে বলিনি,,, """"যদি না পাঠাও তাহলে আরেকবার ডিভোর্স দিবা বলো তাহলে আমি ওই ৩ টা শব্দ বলে দিব।। """"

তাই আমি বলছি তখনের জন্য অপেক্ষা করে কি লাভ এখনই বলে দেন,,,

,"""""তখন আমার স্বামী বলে তুমি শুধু মৌখিকভাবে বলে ডিভোর্স দিবা তাহলে আমার শেষ বাক্য হয়ে যাবে।।।"""

তার এ কথার প্রেক্ষিতে আমি আবার বলছি এখনই বলে দেন।।।কিন্তু তখন আমি আর সে কেউ কিছু বলনি।।

এখন প্রশ্ন। সে যে বললো

১।।তুমি আরেকবার ডিভোর্স দিবা বললে আমি ওই ৩ টা শব্দ বলে দিবো।।
২।তুমি শুধু মৌখিক ভাবে বলো ডিভোর্স দিবা তাহলে আমার শেষ বাক্য হয়ে যাবে।।

২(ক) তুমি যদি মৌখিক ভাবে বলো ডিভোর্স দিবা তখন আমার শেষ বাক্য হয়ে যাবে।। এই দুই ভাবের যেকোন একভাবে বলেছে।।।



এটা কি সারা জীবন এর জন্য নাকি সাময়িক এর জন্য।।।এটা কি শর্ত যুক্ত তালাক।।কারন এর পর আমি বলে ছিলাম কি না তাতে এখন সন্দেহ হচ্ছে।।। আর আমার স্বামী বলে তার কিছু মনে নেই।

আমি ডিভোর্স দিবো বললে কি তখন সরাসরি তালাক হয়ে যাবে,,নাকি তার তালাক শব্দটা বলতে হবে

Answer

উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

প্রশ্নটি মনোযোগ সহকারে পড়ে এবং বিশ্লেষণ করে আমরা নিম্নোক্ত ফিকহী (Hanafi) সমাধান প্রদান করছি। আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনাটি ৩ বছর আগের এবং এটি একটি জটিল মানসিক অবস্থার মধ্যে বলা হয়েছে। আমরা ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ করছি:

১. মূল নীতি (Usul):

ইসলামী ফিকহের (বিশেষত হানাফী মাযহাবের) মূল নীতি হলো, তালাক শুধুমাত্র তখনই কার্যকর হয়, যখন তা স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন শব্দে (সরীহ) বা প্রেক্ষাপট অনুযায়ী দ্ব্যর্থহীন (কিনায়া) উচ্চারিত হয়। শুধু "ডিভোর্স দিব" বা "তালাক দিব" বলার ইচ্ছা বা হুমকি দেওয়া তালাক নয়। তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য স্বামীর পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে "তালাক" শব্দটি বলা বা লিখিতভাবে প্রেরণ করা জরুরি।

২. আপনার ঘটনার বিশ্লেষণ:

ক. প্রথম দিনের ঘটনা: আপনি ঝগড়ার সময় বলেছিলেন, "ডিভোর্স লেটার পাঠাই দিব"। স্বামী জবাবে বলেছিলেন, "ওকে পাঠাই দিও"।

  • ফিকহী বিধান: স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাকের হুমকি বা ইচ্ছা প্রকাশ করা তালাক নয়। স্বামীর "পাঠাই দিও" বলা তালাকের ইজাব (প্রস্তাব) নয়, বরং এটি একটি অনুমোদন মাত্র। যেহেতু স্বামী নিজে তালাকের শব্দ উচ্চারণ করেননি বা লিখিতভাবে দেননি, তাই এতে কোনো তালাক পতিত হয়নি।

খ. দ্বিতীয় দিনের ঘটনা (মেসেজ ও কথোপকথন):

  • স্বামী মেসেজে জিজ্ঞেস করলেন, "ডিভোর্স লেটার পাঠালে না তো?" আপনি বললেন, "আপনি পাঠান, আমি সই করে দিব।"
  • স্বামী বললেন, "যদি না পাঠাও তাহলে আরেকবার ডিভোর্স দিবা বলো, তাহলে আমি ওই ৩টা শব্দ বলে দিব।"
  • আপনি বললেন, "এখনই বলে দেন।"
  • স্বামী বললেন, "তুমি শুধু মৌখিকভাবে বলে ডিভোর্স দিবা, তাহলে আমার শেষ বাক্য হয়ে যাবে।"
  • এরপর আপনি আবার বললেন, "এখনই বলে দেন।" কিন্তু উভয়েই আর কিছু বলেননি।

গ. মূল প্রশ্ন: ১. স্বামীর উক্তিগুলো কি শর্তযুক্ত তালাক? ২. আপনি "ডিভোর্স দিব" বললে কি সরাসরি তালাক হয়ে যাবে, নাকি স্বামীকে "তালাক" শব্দ বলতে হবে?

৩. ফিকহী রায় (Hanafi Fiqh):

প্রথম প্রশ্নের উত্তর: আপনার স্বামীর উক্তিগুলো (১ নং ও ২ নং) শর্তযুক্ত তালাকের (তালাক মু'আল্লাক) হুমকি বা ইঙ্গিত মাত্র, তা তালাক নয়। কারণ, তিনি বলেননি, "তুমি ডিভোর্স দিলে তোমার উপর তালাক।" বরং তিনি বলেছেন, "তুমি ডিভোর্স দিবা বললে আমি (স্বামী) ৩টা শব্দ (তালাক) বলে দিব।" অর্থাৎ, তিনি নিজে তালাক দেওয়ার শর্ত নিজের উপর চাপিয়েছেন, কিন্তু সেই শর্ত পূরণের আগেই তিনি থেমে গেছেন এবং কিছু বলেননি।

  • হানাফী ফিকহের নীতি: শর্তযুক্ত তালাক তখনই কার্যকর হয়, যখন শর্ত পূরণ হয় এবং সাথে সাথে তালাকের শব্দ উচ্চারিত হয়। কিন্তু এখানে শর্ত পূরণের পরও (আপনি "এখনই বলে দেন" বলেছেন) স্বামী তালাকের শব্দ উচ্চারণ করেননি। তাই কোনো তালাক পতিত হয়নি।

দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর: আপনি যদি বলেন, "আমি ডিভোর্স দিব", তাহলে সরাসরি তালাক হবে না। কারণ, তালাক দেওয়ার অধিকার শুধুমাত্র স্বামীর। স্ত্রীর পক্ষ থেকে এ ধরনের কথা বলা তালাকের প্রস্তাব বা হুমকি হিসেবে গণ্য হবে, কিন্তু তালাক কার্যকর হবে না। তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য স্বামীকে স্পষ্টভাবে "তালাক" শব্দটি বলতে হবে (যেমন: "তুমি তালাক", "আমি তোমাকে তালাক দিলাম") অথবা লিখিতভাবে দিতে হবে। আপনার স্বামী যদি বলেন, "তুমি ডিভোর্স দিবা বললে আমার শেষ বাক্য হয়ে যাবে" - এর অর্থ এই নয় যে, আপনার কথা বলার সাথে সাথে তালাক পতিত হবে। বরং এটি একটি হুমকি বা সতর্কবার্তা। যেহেতু তিনি পরে আর কিছু বলেননি, তাই তালাক সংঘটিত হয়নি।

৪. "সাময়িক না স্থায়ী" এবং "শর্তযুক্ত তালাক" প্রসঙ্গে:

  • সাময়িক তালাক (তালাকুল বিদ'আহ) বা স্থায়ী তালাক (তালাকুস সুন্নাহ): তালাক সাধারণত স্থায়ী হয়, তবে তা এক তালাক, দুই তালাক বা তিন তালাক হিসেবে গণ্য হয়। আপনার ঘটনায় যেহেতু তালাকই পতিত হয়নি, তাই এই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক নয়।
  • শর্তযুক্ত তালাক (তালাক মু'আল্লাক): ইসলামে শর্তযুক্ত তালাক বৈধ, তবে তা তখনই কার্যকর হয় যখন শর্ত পূরণ হয় এবং শর্ত পূরণের সাথে সাথে তালাকের শব্দ উচ্চারিত হয়। আপনার ক্ষেত্রে শর্ত পূরণের পরও স্বামী তালাকের শব্দ উচ্চারণ করেননি, তাই এটি শর্তযুক্ত তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।

৫. আপনার সন্দেহ ও স্বামীর "মনে নেই" বলার প্রেক্ষাপট:

আপনি বলেছেন, "এর পর আমি বলে ছিলাম কি না তাতে এখন সন্দেহ হচ্ছে।"

  • ফিকহী নীতি: সন্দেহের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, ইয়াকীন (নিশ্চিততা) সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না। (اليقين لا يزول بالشك)। যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন যে, আপনি "ডিভোর্স দিব" বলেছেন কি না, এবং স্বামীও বলেছেন তার কিছু মনে নেই, তাই তালাক পতিত হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই। বর্তমানে আপনারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বৈধভাবে একসাথে বসবাস করছেন, এটি-ই সঠিক। কোনো প্রকার সন্দেহের কারণে তালাক কার্যকর গণ্য হবে না।

৬. চূড়ান্ত ফতোয়া:

১. আপনার স্বামীর উক্তিগুলো (১, ২, ২(ক)) কোনো তালাক নয়। এটি ছিল রাগের মাথায় বলা হুমকি বা শর্তযুক্ত প্রস্তাব, যা পরে আর কার্যকর হয়নি। ২. আপনি "ডিভোর্স দিব" বললে সরাসরি তালাক হবে না। তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য স্বামীকে স্পষ্টভাবে "তালাক" শব্দ বলতে হবে বা লিখতে হবে। ৩. আপনাদের বিবাহ এখনও বৈধ ও বহাল আছে। ৩ বছর আগের ঘটনার কারণে কোনো তালাক পতিত হয়নি। ৪. সাময়িক বা স্থায়ী তালাকের প্রশ্নই আসে না, যেহেতু তালাকই সংঘটিত হয়নি।

৭. পরামর্শ:

  • ভবিষ্যতে ঝগড়ার সময় "তালাক" বা "ডিভোর্স" শব্দ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। এটি শয়তানের কাজ এবং সম্পর্ক নষ্ট করার কারণ।
  • স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মতানৈক্য হলে ধৈর্য ধারণ করুন এবং পরিবারের বড়দের বা আলেমদের মাধ্যমে সমাধান করুন।
  • বর্তমানে আপনারা স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন যাপন করুন। কোনো প্রকার অপরাধবোধ বা সন্দেহ পোষণ করবেন না।

আল্লাহ তাআলা আপনাদের সম্পর্কে বরকত দান করুন এবং সর্বদা সুখে-শান্তিতে রাখুন। (আমিন)

রেফারেন্সসমূহ:

  • আল-হিদায়াহ (১ম খণ্ড, তালাক অধ্যায়)
  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) - ৩য় খণ্ড, তালাক অধ্যায়
  • ফতোয়া আলমগীরী (ফতোয়া হিন্দিয়া) - ১ম খণ্ড, তালাক অধ্যায়
  • বাহিশতী জেওর - তালাক অধ্যায়
  • ইমদাদুল ফতোয়া - ২য় খণ্ড, তালাক অধ্যায়
  • ফতোয়া উসমানী - ২য় খণ্ড, তালাক অধ্যায়

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.