স্ত্রীর পিতা বাধা দিলে স্ত্রী কি গোপনে স্বামীর সাথে মিলিত হতে পারবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
গোপনে স্বামীর সাথে মিলিত হওয়ার বিধান
উত্তর: ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে স্ত্রী তার স্বামীর সাথে মিলিত হওয়া সম্পূর্ণ বৈধ এবং এটি স্বামীর হক। স্ত্রীর পিতা বা পরিবারের অন্য কেউ এতে বাধা দিতে পারে না। তবে কিছু শর্ত ও আদবের বিষয় রয়েছে।
শরীয়তের দলিল
১. কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ "আর নারীদের জন্য তেমনি অধিকার রয়েছে, যেমনটি তাদের উপর রয়েছে (স্বামীর) ন্যায়সংগত অধিকার।" (সূরা আল-বাকারা: ২২৮)
২. হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَأَبَتْ فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا لَعَنَتْهَا الْمَلَائِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ "যখন কোনো পুরুষ তার স্ত্রীকে শয্যায় ডাকে এবং স্ত্রী তা অস্বীকার করে, আর স্বামী তার উপর রাগান্বিত অবস্থায় রাত কাটায়, তখন ফজর পর্যন্ত ফেরেশতারা তাকে (স্ত্রীকে) অভিশাপ দেয়।" (সহীহ বুখারী: ৫১৯৩, সহীহ মুসলিম: ১৪৩৬)
হানাফী ফিকহের আলোকে বিধান
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) সহ সকল হানাফী ফকীহগণের মতে, স্ত্রীর উপর স্বামীর সাথে মিলিত হওয়া ওয়াজিব (আবশ্যক) যখন স্বামী বৈধভাবে আহ্বান করে। স্ত্রীর পিতা বা অভিভাবকের এ বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই।
রদ্দুল মুহতার (শামী) -এ উল্লেখ আছে:
يجب عليها تمكينه من نفسها إذا طلبها في قبلها "স্বামী যখন স্ত্রীকে আহ্বান করে, তখন স্ত্রীর উপর নিজেকে সমর্পণ করা ওয়াজিব।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬০)
ফাতাওয়া আলমগীরী -তে বলা হয়েছে:
إذا دعا الرجل امرأته إلى فراشه وجب عليها أن تجيبه "যখন স্বামী স্ত্রীকে শয্যায় ডাকে, তখন স্ত্রীর উপর তার আহ্বানে সাড়া দেওয়া ওয়াজিব।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/১৪৬)
স্ত্রীর পিতার বাধা দেওয়ার বিধান
স্ত্রীর পিতা বা পরিবারের অন্য কেউ স্বামী-স্ত্রীর বৈধ মিলনে বাধা দিলে তা গুনাহের কাজ এবং শরীয়তসম্মত নয়। কারণ:
১. বিবাহের পর স্ত্রী স্বামীর দায়িত্বে চলে যায় এবং স্বামীর আনুগত্য তার উপর ওয়াজিব হয়। ২. পিতা বা অভিভাবকের এ বিষয়ে কোনো কর্তৃত্ব নেই। ৩. পিতার এমন আচরণ জুলুম ও অন্যায়।
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন:
لا ولاية للأب على البكر البالغ في منعها من زوجها "প্রাপ্তবয়স্ক কুমারী মেয়েকে তার স্বামীর থেকে আলাদা করার কোনো ক্ষমতা পিতার নেই।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬১)
গোপনে মিলিত হওয়ার বিধান
যেহেতু স্ত্রীর পিতা অন্যায়ভাবে বাধা দিচ্ছে, তাই স্ত্রী গোপনে স্বামীর সাথে মিলিত হতে পারবে। তবে কিছু বিষয় লক্ষণীয়:
১. গোপনীয়তা রক্ষা করা - ইসলামী আদব অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রীর মিলন সর্বদা গোপনীয় হওয়া উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ وَتُفْضِي إِلَيْهِ ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا "কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং সে তার সাথে মিলিত হয়, অতঃপর সে তার (স্ত্রীর) গোপনীয়তা প্রকাশ করে।" (সহীহ মুসলিম: ১৪৩৭)
২. পিতার সম্মান রক্ষা - পিতার সাথে দুর্ব্যবহার না করে, সম্ভব হলে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করা উচিত। তবে প্রয়োজনে গোপনে স্বামীর সাথে মিলিত হওয়া জায়েয।
৩. স্বামীর হক আদায় - স্ত্রীর উপর স্বামীর হক আদায় করা ফরজ। পিতার অন্যায় বাধার কারণে তা পরিত্যাগ করা যাবে না।
গুরুত্বপূর্ণ নোট
১. স্ত্রী তার পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে এবং সম্ভব হলে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করবে। ২. প্রয়োজনে বিশ্বস্ত আলেম বা মুরুব্বীর মাধ্যমে পিতাকে বোঝানো যেতে পারে। ৩. পিতা যদি একান্তই না মানে, তাহলে স্ত্রী গোপনে স্বামীর সাথে মিলিত হতে পারবে এবং এতে কোনো গুনাহ হবে না। ৪. এতে পিতার অবাধ্যতা হচ্ছে না, বরং পিতাই শরীয়তবিরোধী কাজ করছেন।
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলেন:
"স্বামীর সাথে স্ত্রীর মিলন বৈধ বিষয়। এতে কারো অনুমতি প্রয়োজন নেই। পিতা বা অভিভাবকের বাধা শরীয়তসম্মত নয়। স্ত্রী চাইলে গোপনে স্বামীর সাথে মিলিত হতে পারবে।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩৮৫)
মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:
"বিবাহের পর স্ত্রী স্বামীর অধীনে চলে যায়। পিতার কর্তৃত্ব তখন সীমিত হয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রীর বৈধ সম্পর্কে পিতা বাধা দিতে পারে না। প্রয়োজনে স্ত্রী গোপনে স্বামীর সাথে মিলিত হতে পারবে।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২১৬)
সারকথা: স্ত্রী তার স্বামীর হক পূরণে গোপনে মিলিত হতে পারবে এবং এতে কোনো গুনাহ নেই। বরং পিতার এমন বাধা দেওয়া অন্যায় ও গুনাহের কাজ। তবে স্ত্রী পিতার সাথে সদ্ব্যবহার বজায় রাখবে এবং সম্ভব হলে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করবে।