কুফু সম্পর্কিত মাস'আলা এবং বিয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
শায়েখ, প্রথমত একটি ছেলে ও একটি মেয়ে—দুজনই মুসলিম। ছেলেটি মেয়েটির তুলনায় বেশি দ্বীনদার। দুজনের কেউই আরব বংশোদ্ভূত নয়। সামাজিক অবস্থানও প্রায় একই—উচ্চ মধ্যবিত্ত। যদিও মেয়েটির বাবার আয় ছেলেটির পরিবারের চেয়ে বেশি হতে পারে, তবুও সামাজিক মর্যাদা মোটামুটি সমপর্যায়ের। ছেলেটি বর্তমানে পুরোপুরি স্বাবলম্বী না হলেও, বিয়ের পর স্ত্রীকে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারবে ইনশাআল্লাহ। তার পরিবারেরও সেই সামর্থ্য রয়েছে।
এমতাবস্থায় তারা বিয়ে করে ফেলেছে। মেয়েটি ছেলেটিকে নিজের উকিল নিযুক্ত করে প্রস্তাব পাঠিয়েছে, এবং ছেলেটি তা দুইজন সাক্ষীর সামনে ৫ লাখ টাকা কাবিন নির্ধারণ করে গ্রহণ করেছে। তবে তাদের কোনো পরিবারই এ বিষয়ে জানে না।
দ্বিতীয়ত, উভয় পরিবারেরই এ ধরনের বিয়ের প্রতি আপত্তি রয়েছে। তাদের মতে, বিয়ে অবশ্যই পরিবারকে জানিয়ে করতে হবে। তারা যদি জানতে পারে যে এভাবে গোপনে বিয়ে হয়েছে, তাহলে মেয়ের পরিবার তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে।
এমতাবস্থায়, ভবিষ্যতে যখন ছেলে তার স্ত্রীর ভরণ-পোষণের পূর্ণ সামর্থ্য অর্জন করবে, বা পরিবার যখন বিয়ের জন্য যোগ্য মনে করবে, তখন কি উভয় পরিবারকে জানিয়ে নতুনভাবে আবার বিয়ে করা সম্ভব(প্রথম বিয়ের কথা না জানিয়ে,পরিবারের কাছে এইটাই হবে প্রথম বিয়ে)? নাকি তা প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত হবে? এ ক্ষেত্রে কোনো গুনাহ হবে কি?
এখন যদি তারা বিয়ে না করে অপেক্ষা করত, তাহলে আরও ৪–৫ বছর অপেক্ষা করতে হতো, যা তাদের হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করত। তাই পরিবারকে না জানিয়ে বিয়ে করেছে। পরবর্তীতে ৫–৬ বছর পর পরিবারকে আগের বিয়ের বিষয়টি না জানিয়ে নতুনভাবে কাজী, ইমাম ও ওয়ালির উপস্থিতিতে বিয়ে করা কি জায়েজ হবে?
এ ক্ষেত্রে যদি নতুন বিয়ের কাবিন বা অন্যান্য শর্ত প্রথম বিয়ের শর্ত থেকে ভিন্ন হয়, তাহলে করণীয় কী?
আর যদি তারা পরিবারকে জানানোর ৩–৪ মাস আগে মৌখিক তালাক দেয়, ইদ্দতের সময় শেষ হওয়ার পর পুনরায় বিয়ে করে, তাহলে তা জায়েজ হবে কি? নাকি তা মুতআ সদৃশ কোনো বিষয়ে পরিণত হবে?
দয়া করে এ বিষয়ে একটু বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিলে উপকৃত হব।
জাযাকাল্লাহু খাইরান।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। আমি কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করছি।
১. গোপনে বিয়ের বৈধতা (Shar'ee Hukm of Secret Nikah)
ইসলামী ফিকহের নিয়ম অনুযায়ী, গোপনে বিয়ে করা জায়েজ যদি এর প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ হয়। বিয়ের মূল শর্ত হলো:
- ইজাব (Proposal) ও কবুল (Acceptance) - যা স্পষ্টভাবে সম্পন্ন হতে হবে।
- দুইজন পুরুষ সাক্ষী বা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে (সূরা আল-বাকারা: ২৮২)।
- মহর (Dower) নির্ধারণ করা (যদিও মহর নির্ধারণ না করলেও বিয়ে শুদ্ধ হয়, তবে তা নির্ধারণ করা উত্তম)।
আপনাদের ক্ষেত্রে, মেয়েটি ছেলেটিকে উকিল নিযুক্ত করে প্রস্তাব পাঠিয়েছে এবং ছেলেটি দুইজন সাক্ষীর সামনে ৫ লাখ টাকা কাবিন (মহর) নির্ধারণ করে গ্রহণ করেছে। এতে বিয়েটি ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বৈধ ও শুদ্ধ হয়েছে।
তবে, পরিবারের সম্মতি (Wali's consent) সম্পর্কে হানাফি মাযহাবের নিয়ম হলো:
- প্রাপ্তবয়স্ক (Baligh) ও সুস্থ মস্তিষ্কের (Aaqil) মেয়ে নিজে বিয়ে করলে তা বৈধ, এমনকি অভিভাবকের (Wali) অনুমতি ছাড়া হলেও। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ১/৪০; রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৬)
- তবে, অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা মাকরুহে তানযিহি (নিন্দনীয়)। অর্থাৎ, বিয়েটি বৈধ হলেও এটি উত্তম পদ্ধতি নয়। কারণ, পরিবারের সম্মতি ও সমর্থন দাম্পত্য জীবনে বরকত ও স্থিতিশীলতা আনে। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩০০)
সুতরাং, প্রথম বিয়েটি শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হয়েছে। এতে কোনো গুনাহ নেই, তবে পরিবারের অজান্তে করায় এটি মাকরুহ (অপছন্দনীয়) হয়েছে।
২. নতুন করে বিয়ে করা ও প্রতারণার প্রশ্ন
আপনি জিজ্ঞেস করেছেন, ভবিষ্যতে পরিবারকে জানিয়ে নতুন করে বিয়ে করা যাবে কি না, যা পরিবারের কাছে প্রথম বিয়ে হিসেবে গণ্য হবে?
উত্তর: শরিয়তের দৃষ্টিতে, ইতিমধ্যে সম্পন্ন হওয়া বৈধ বিয়েকে আবার নতুন করে বিয়ে করা জায়েজ নয়। কারণ, একজন নারী একই সাথে দুই স্বামী রাখতে পারে না এবং একই দম্পতির মধ্যে দ্বিতীয়বার বিয়ে করা অর্থহীন। এটি প্রতারণা (Fraud) হিসেবে গণ্য হবে, যা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।
- কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: "আল্লাহ তায়ালা তো তোমাদের জন্য এমন ব্যবস্থা রাখেননি যে, একই সাথে দুই স্বামী থাকবে..." (সূরা আল-আহযাব: ৪)
- হাদিসে আছে: "যে ব্যক্তি প্রতারণা করল, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সহিহ মুসলিম: ১০১)
সুতরাং, পরিবারকে না জানিয়ে নতুন করে বিয়ে করা সম্পূর্ণ হারাম ও প্রতারণা। এটি করলে গুনাহ হবে। বরং, সত্য প্রকাশ করে পরিবারের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করা উচিত।
৩. তালাক দিয়ে পুনরায় বিয়ে করার প্রশ্ন
আপনি জিজ্ঞেস করেছেন, পরিবারকে জানানোর ৩-৪ মাস আগে মৌখিক তালাক দিয়ে ইদ্দত শেষে পুনরায় বিয়ে করলে তা জায়েজ হবে কি?
উত্তর: এটি সম্পূর্ণ হারাম ও ধোঁকাবাজি। ইসলামে তালাক একটি গুরুতর বিষয়। তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্য যদি হয় পরিবারের কাছে নতুন করে বিয়ে দেখানো, তাহলে এটি মুতআ (Mut'ah) বা সাময়িক বিয়ের সদৃশ হবে, যা ইসলামে হারাম।
- হাদিসে আছে: "তিনটি বিষয় গুরুতর: তালাক, আযাদ করা এবং নিয়ত।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৯৪)
- রদ্দুল মুহতার (৩/২৮০) এ বলা হয়েছে, তালাকের মাধ্যমে যদি কোনো শরিয়ত-বিরোধী উদ্দেশ্য (যেমন: প্রতারণা) থাকে, তাহলে তা হারাম।
সুতরাং, এই পদ্ধতি অবলম্বন করা সম্পূর্ণ হারাম। এটি করলে গুনাহ হবে এবং এটি মুতআ সদৃশ হবে।
৪. করণীয় কী?
এখন আপনাদের করণীয় হলো:
১. সত্য প্রকাশ করা: পরিবারকে জানানো উচিত যে, ইতিমধ্যে শরিয়তসম্মতভাবে বিয়ে হয়েছে। এটি সাহসের সাথে করতে হবে এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হবে। পরিবারের রাগ বা আপত্তি সাময়িক হতে পারে, কিন্তু সত্য গোপন করা চিরস্থায়ী সমস্যা তৈরি করবে।
২. পরিবারের সম্মতি অর্জনের চেষ্টা: পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, বিয়েটি বৈধ ও শুদ্ধভাবে সম্পন্ন হয়েছে। দ্বীনদার ছেলেটির সাথে সম্পর্ক স্থাপনে পরিবারকে উৎসাহিত করুন।
৩. ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা: ছেলেটি যেন তার স্ত্রীর ভরণ-পোষণের (Nafaqah) দায়িত্ব পালন করে। এটি তার উপর ফরজ।
৪. ইস্তিগফার ও তওবা: গোপনে বিয়ে করার কারণে মাকরুহ কাজ হয়েছে, তাই আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ থেকে বিরত থাকুন।
৫. নতুন বিয়ের শর্ত ভিন্ন হলে করণীয়
যেহেতু নতুন করে বিয়ে করা জায়েজ নয়, তাই নতুন বিয়ের শর্ত ভিন্ন হওয়ার প্রশ্নই আসে না। প্রথম বিয়েটিই চূড়ান্ত। মহর (৫ লাখ টাকা) যা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা স্ত্রীর প্রাপ্য। এটি আদায় করা স্বামীর উপর ফরজ।
৬. কুফু (Kufu) সম্পর্কে
আপনি উল্লেখ করেছেন যে, ছেলে ও মেয়ে উভয়েই মুসলিম, আরব বংশোদ্ভূত নয়, সামাজিক অবস্থান প্রায় সমান। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, কুফু (সমতা) বিয়ের বৈধতার শর্ত নয়, বরং এটি একটি উত্তম বিষয়।
- রদ্দুল মুহতার (৩/৮৯) এ বলা হয়েছে, কুফু শুধুমাত্র বিবাহের স্থায়িত্ব ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার জন্য বিবেচিত হয়, তবে এর অভাবে বিয়ে বাতিল হয় না।
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, কুফু বিবেচনার বিষয় হলো: ধর্ম, বংশ, স্বাধীনতা, পেশা ও দ্বীনদারি। যেহেতু ছেলেটি দ্বীনদার এবং সামাজিক অবস্থান সমান, তাই কুফু বিদ্যমান রয়েছে।
৭. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সংক্ষেপে উত্তর:
১. প্রথম বিয়েটি বৈধ ও শুদ্ধ হয়েছে। এতে কোনো গুনাহ নেই, তবে পরিবারের অজান্তে করায় এটি মাকরুহ হয়েছে। ২. নতুন করে বিয়ে করা জায়েজ নয় এবং এটি প্রতারণা হিসেবে গণ্য হবে, যা হারাম। ৩. **তালাক দিয়ে পুনরায় বিয়ে করা ঠিক হবেনা। ৪. করণীয় হলো: সত্য প্রকাশ করা, পরিবারের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করা এবং আল্লাহর কাছে তওবা করা।
চাইলে এমনটিও করতে পারেন, তা হল কোন প্রকারের তালাক না দিয়ে শুধুমাত্র অভিনয় হিসেবে পারিবারিকভাবে পুনরায় বিবাহ করিয়ে নেয়া।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান।