অভিভাবক ছাড়া বিবাহ ও পরবর্তী জোড়পূর্বক তালাকের বিধান কি?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
বিবাহ ও তালাক সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
- রাকিব ও রহিমার বিবাহ হয়েছে, কিন্তু মেয়ের মা-বাবা উপস্থিত ছিলেন না
- অন্য লোকেরা সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন
- সাক্ষীদের সামনে তিনবার কবুল বলা হয়েছে
- বিবাহের ৭ দিন পর মেয়েটি অনিচ্ছায় ডিভোর্স পেপারে স্বাক্ষর করে
- ছেলেটিকে মারধর করে জোরপূর্বক ডিভোর্স পেপারে স্বাক্ষর করানো হয়
উত্তর
১. বিবাহের বৈধতা প্রসঙ্গে
হানাফি মাযহাবের আলোকে বিবাহের শর্তাবলী:
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী বিবাহের জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ হওয়া আবশ্যক:
১. প্রস্তাব (ইজাব) ও গ্রহণ (কবুল) - উভয় পক্ষের সম্মতি ২. সাক্ষী - দুইজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা মুসলিম সাক্ষী ৩. অভিভাবক - হানাফি মাযহাবে বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) মেয়ের নিজের বিবাহের জন্য অভিভাবকের অনুমতি আবশ্যক নয়, তবে উত্তম হল অভিভাবকের উপস্থিতি
হানাফি ফিকহের দলিল:
রদ্দুল মুহতার (রাদ্দুল মুহতার) গ্রন্থে উল্লেখ আছে:
"وَلَا يَجُوزُ نِكَاحُ الْمُسْلِمَةِ إلَّا بِشُهُودٍ حُرُورٍ مُسْلِمِينَ" "মুসলিম নারীর বিবাহ মুসলিম স্বাধীন সাক্ষী ছাড়া বৈধ নয়।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫)
আল-হিদায়ায় উল্লেখ আছে:
"ولا نكاح إلا بشاهدين" "দুইজন সাক্ষী ছাড়া বিবাহ বৈধ নয়।" (আল-হিদায়া, ২/৩০০)
আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে:
- মেয়ের মা-বাবা উপস্থিত ছিলেন না, কিন্তু অন্য লোকেরা সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন
- সাক্ষীদের সামনে তিনবার কবুল বলা হয়েছে
হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) মেয়ের ক্ষেত্রে অভিভাবকের উপস্থিতি বিবাহের শর্ত নয়, তবে উত্তম। যদি সাক্ষীগণ বৈধ হন (দুইজন মুসলিম পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা), এবং ইজাব-কবুল সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে, তবে বিবাহটি বৈধ হবে।
তবে যদি মেয়েটি বালেগ না হয়ে থাকে (নাবালেগ), তাহলে অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া বিবাহ বৈধ হবে না।
২. তালাকের বৈধতা প্রসঙ্গে
জোরপূর্বক তালাকের বিধান:
হানাফি মাযহাবের মূলনীতি অনুযায়ী:
"لَا يَقَعُ طَلَاقُ الْمُكْرَهِ" "জোরপূর্বক তালাক পতিত হয় না।" (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৩৫)
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে:
মেয়েটির স্বাক্ষর: মেয়েটি অনিচ্ছায় ডিভোর্স পেপারে স্বাক্ষর করেছে। ইসলামী আইনে স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাকের আবেদনকে "খুলা" বলা হয়। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো, মেয়েটি কি সত্যিই তালাক চেয়েছিল?
- যদি মেয়েটি সত্যিই তালাক না চেয়ে থাকে এবং জোরপূর্বক স্বাক্ষর করানো হয়েছে, তাহলে তা বৈধ হবে না
- তবে মেয়েটি নিজে স্বাক্ষর করেছে বলে যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে তা খুলা হিসেবে গণ্য হতে পারে
ছেলেটির স্বাক্ষর: ছেলেটিকে মারধর করে জোরপূর্বক ডিভোর্স পেপারে স্বাক্ষর করানো হয়েছে।
হাদিসে এসেছে:
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الْمُبْتَلَى حَتَّى يَبْرَأَ، وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ» "তিন ব্যক্তি থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে (অর্থাৎ তাদের কাজের হিসাব নেওয়া হবে না): ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না জাগে, মুসিবতগ্রস্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না সুস্থ হয়, এবং পাগল ব্যক্তি যতক্ষণ না সুস্থ হয়।" (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৪০৩; তিরমিজি, হাদিস: ১৪২৩)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, জোরপূর্বক তালাক পতিত হয় না। তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, জোরপূর্বক তালাক পতিত হয়, কিন্তু তা বর্তমান সময়ে ফতোয়া দেওয়া হয় না।
ফতোয়ায়ে উসমানি এবং ইমদাদুল ফতোয়া-তেও এই নীতিই অনুসৃত হয়েছে যে, জোরপূর্বক তালাক পতিত হয় না।
৩. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
বিবাহের বৈধতা: যদি সাক্ষীগণ বৈধ হন এবং ইজাব-কবুল সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে, তবে বিবাহটি বৈধ হয়েছে।
তালাকের বৈধতা:
- ছেলেটির উপর জোরপূর্বক স্বাক্ষর করানো হয়েছে এবং সে অনিচ্ছায় স্বাক্ষর করেছে
- মেয়েটিও অনিচ্ছায় স্বাক্ষর করেছে
উপরোক্ত পরিস্থিতিতে, তালাক পতিত হয়নি বলে হানাফি মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেওয়া যেতে পারে।
মেয়েটিকে পুনরায় গ্রহণ: যেহেতু তালাক পতিত হয়নি, তাই তারা এখনও স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বিবাহিত। মেয়েটিকে পুনরায় গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই, কারণ তারা এখনও বিবাহিত।
তবে, এই বিষয়ে স্থানীয় দারুল ইফতায় গিয়ে ইসলামী স্কলারের সাথে পরামর্শ করা উত্তম, কারণ বাস্তব প্রমাণ ও সাক্ষ্যগুলো যাচাই করা প্রয়োজন।