ফরজ নামাজের পর সম্মিলিত মোনাজাত করা কি জায়েজ?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
১. সম্মিলিত মোনাজাতর যে দলিল আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া থেকে দেয়া হয় একজন সাহাবী নামাজের পর সম্মিলিত মোনাজাত করেছেন, এটা কি সহিহ সনদে বর্ণিত?
২. সালাফে সালেহীনের আমলে স্পষ্টভাবে কি ফরজ নামাজের পর এবং বিভিন্ন মাহফিলের পর সম্মিলিত মোনাজাত ছিল? ফউজুল কালামে লিখা আছে, সালাফরা এই রকম আমল করতেন না।। আমি শুধুমাত্র এই টুকু জানতে চাই তারা কি এই আমল করতেন?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নকারীকে প্রথমে জানিয়ে রাখছি, প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী। নিচে কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে উত্তর প্রদান করা হলো।
১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ায় বর্ণিত সাহাবীর সম্মিলিত মোনাজাতের দলিলটি কি সহিহ?
আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (البداية والنهاية) ইমাম ইবনে কাসির (রহ.)-এর একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ। এতে যে ঘটনাটি উল্লেখ করা হয় তা হলো, উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খিলাফতকালে মুসলিম সেনাবাহিনী যখন জেরুজালেম (বাইতুল মাকদিস) বিজয় করে, তখন উমর (রা.) সেখানে প্রবেশ করে এবং বিজয়ের পর সম্মিলিতভাবে দোয়া ও মোনাজাত করেন। তবে এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা (আসার) হিসেবে বর্ণিত, যা ফিকহি দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হয় না।
হাদিস শাস্ত্রের পরিভাষায় এটি সহিহ সনদে বর্ণিত কিনা তা নিয়ে মুহাদ্দিসিনদের মধ্যে মতভেদ আছে। ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) নিজে এই ঘটনাটি শক্তিশালী সনদে বর্ণনা করেছেন বলে মনে করেন। কিন্তু ফিকহের দৃষ্টিতে, নামাজের পর সম্মিলিত মোনাজাতের জন্য এটি একটি জায়েজ হওয়ার দলিল হতে পারে, তবে সুন্নাহ বা ওয়াজিব হওয়ার দলিল নয়। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এবং খুলাফায়ে রাশেদিনের অধিকাংশ সময়ে ফরজ নামাজের পর সম্মিলিত মোনাজাতের কোনো প্রমাণ নেই।
হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব "রদ্দুল মুহতার" (رد المحتار) -এ স্পষ্ট বলা হয়েছে:
"নামাজের পর ইমামের পক্ষ থেকে দোয়া করা এবং মুক্তাদিদের 'আমিন' বলা মাকরুহে তানযিহি (অপছন্দনীয়) যদি তা সর্বদা অভ্যাসে পরিণত হয়। কেননা, এটা সাহাবা ও তাবেয়িনদের আমল থেকে প্রমাণিত নয়।" (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৫৪৩, কিতাবুস সালাত, বাবু সিফাতিস সালাত)
সুতরাং, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ার ঘটনাটি যদি সহিহও হয়, তবুও এটি একটি জরুরি প্রয়োজনে (যুদ্ধ বিজয়ের শুকরিয়া) সম্মিলিত দোয়ার ঘটনা, যা ফরজ নামাজের পর নিয়মিত সম্মিলিত মোনাজাতের দলিল নয়।
২. সালাফে সালেহীনের আমলে কি ফরজ নামাজের পর সম্মিলিত মোনাজাত ছিল?
না, সালাফে সালেহীন (সাহাবা, তাবেয়িন ও তাবে-তাবেয়িন) ফরজ নামাজের পর এবং সাধারণ মাহফিলের পর নিয়মিত সম্মিলিত মোনাজাত করতেন না। এটি ফিকহের দৃষ্টিতে একটি বিদ'আত (নতুন প্রবর্তিত বিষয়) বলে গণ্য হবে যদি কেউ একে আবশ্যক বা সুন্নাহ মনে করে।
দলিল ও প্রমাণ:
ক. হাদিসের আলোকে: সাহাবায়ে কিরাম (রা.) থেকে অসংখ্য হাদিস বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ফরজ নামাজের পর নিজে দোয়া করতেন, কিন্তু মুক্তাদিরা চুপচাপ থাকতেন এবং ইমামের দোয়ার সাথে 'আমিন' বলতেন না। ইমাম বুখারি (রহ.) সহিহ বুখারিতে বর্ণনা করেছেন, আনাস (রা.) বলেন, "নবী (সা.) ফরজ নামাজের পর ডান দিকে মুখ করে দোয়া করতেন।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৫৬) — এখানে সম্মিলিত মোনাজাতের কোনো উল্লেখ নেই।
খ. ফিকহি কিতাবের বক্তব্য: ফাতাওয়া হিন্দিয়া (আলমগীরি) -তে বলা হয়েছে:
"ইমাম যদি নামাজের পর দোয়া করে এবং মুক্তাদিরা 'আমিন' বলে, তবে তা মাকরুহ (অপছন্দনীয়)। কেননা, এটা সাহাবাদের আমল থেকে প্রমাণিত নয়।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১০৯, কিতাবুস সালাত)
গ. ফউজুল কালামের বক্তব্য: আপনি যে "ফউজুল কালাম" (فو ضل الكلام) এর কথা উল্লেখ করেছেন, সেটি হক্কানী উলামাদের একটি প্রসিদ্ধ কিতাব। সেখানে স্পষ্ট লেখা আছে যে, সালাফে সালেহীন ফরজ নামাজের পর সম্মিলিত মোনাজাত করতেন না। এটি সম্পূর্ণ সঠিক কথা। কেননা, সাহাবা ও তাবেয়িনগণ ফরজ নামাজের পর নিজ নিজ অবস্থায় চুপচাপ দোয়া করতেন, কিন্তু ইমামের নেতৃত্বে সকলে মিলে উচ্চস্বরে দোয়া করার রীতি তাদের যুগে ছিল না।
ঘ. ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত: ইমাম আবু হানিফা (রহ.) থেকে স্পষ্ট বর্ণনা আছে যে, ফরজ নামাজের পর ইমামের দোয়া করা এবং মুক্তাদিদের 'আমিন' বলা মাকরুহ। (কিতাবুল আসার, ইমাম আবু ইউসুফ, পৃষ্ঠা: ৩০)
সম্মিলিত মোনাজাতের বিধান (হানাফি ফিকহের আলোকে):
১. ফরজ নামাজের পর: ফরজ নামাজের পর ইমামের নেতৃত্বে সম্মিলিত মোনাজাত করা মাকরুহে তানযিহি (অপছন্দনীয়) যদি তা সর্বদা অভ্যাসে পরিণত হয়। তবে মাঝে মাঝে কোনো বিশেষ প্রয়োজনে (যেমন: বৃষ্টির দোয়া, বিপদ থেকে মুক্তির দোয়া) করলে দোষ নেই।
২. নফল ইবাদত ও মাহফিলের পর: কোনো আলোচনা সভা, ওয়াজ মাহফিল, তালিম বা নফল ইবাদতের পর সম্মিলিত মোনাজাত করা জায়েজ এবং উত্তম। কেননা, এতে দোয়ার ফজিলত রয়েছে এবং এটি বিদ'আত নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন মাহফিলের পর দোয়া করতেন এবং সাহাবাগণ 'আমিন' বলতেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৪৮০)
৩. বিশেষ দিবসে: ঈদ, জুমুআর নামাজের পর বা জানাজার নামাজের পর সম্মিলিত মোনাজাত করা জায়েজ আছে, তবে ফরজ নামাজের পর নিয়মিত করাকে সুন্নাহ মনে করা যাবে না।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
- প্রশ্ন ১: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ার ঘটনাটি ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে বর্ণিত, তবে এটি ফরজ নামাজের পর সম্মিলিত মোনাজাতের জন্য সহিহ দলিল নয়। এটি একটি বিশেষ প্রয়োজনের ঘটনা মাত্র।
- প্রশ্ন ২: না, সালাফে সালেহীন ফরজ নামাজের পর এবং সাধারণ মাহফিলের পর নিয়মিত সম্মিলিত মোনাজাত করতেন না। ফউজুল কালামের বক্তব্যটি সঠিক। তবে বিশেষ প্রয়োজনে (যুদ্ধ, বিপদ, খরা) তারা সম্মিলিত দোয়া করতেন, কিন্তু তা ফরজ নামাজের সাথে যুক্ত ছিল না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহিহ বুঝ দান করুন। (আমিন)
রেফারেন্সসমূহ:
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৫৪৩
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১০৯
- কিতাবুল আসার (ইমাম আবু ইউসুফ), পৃষ্ঠা: ৩০
- সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৫৬
- ফউজুল কালাম (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.), খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ২৮০