সুদভিত্তিক ঋণ নেওয়া ব্যবসায় মুশারাকা বিনিয়োগ করা কি জায়েয?
Business and Job · Hanafi
Question
তবে ব্যবসাটির নিজস্ব মূলধনের পাশাপাশি প্রয়োজনে প্রচলিত (conventional) ব্যাংক থেকে সুদভিত্তিক ঋণ (interest-bearing loan) নেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ, ব্যবসাটি তার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এমন ঋণ গ্রহণ করবে যার ওপর সুদ পরিশোধ করতে হবে।
আমার প্রশ্ন হলো:
এমন একটি ব্যবসায় আমি মুশারাকা ভিত্তিতে বিনিয়োগ করে ব্যবসার লাভ-ক্ষতিতে অংশীদার হতে পারব কি?
আরও নির্দিষ্টভাবে, যদি—
আমার বিনিয়োগের টাকা সম্পূর্ণ হালাল উৎস থেকে আসে;
আমার বিনিয়োগের অর্থ শুধুমাত্র হালাল ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার করা হয়;
ব্যবসার মূল কার্যক্রম (যেমন পোশাক ক্রয়-বিক্রয়) নিজেই হালাল হয়;
কিন্তু একই ব্যবসা অন্য একটি উৎস হিসেবে সুদভিত্তিক ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করে এবং সেই ঋণের ওপর সুদ পরিশোধ করে;
তাহলে সেই ব্যবসায় মুশারাকা অংশীদার হিসেবে বিনিয়োগ করা এবং ব্যবসার লাভ গ্রহণ ও ক্ষতি বহন করা কি শরিয়তসম্মত হবে?
বিশেষভাবে জানতে চাই:
ব্যবসার মূল কার্যক্রম হালাল হলেও সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণ করলে মুশারাকা অংশীদার হিসেবে বিনিয়োগের হুকুম কী?
আমি যদি সুদভিত্তিক ঋণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকি এবং আমার বিনিয়োগের টাকা সুদ পরিশোধে ব্যবহার না করা হয়, তাহলে কি হুকুম পরিবর্তিত হবে?
ব্যবসার ঋণের পরিমাণ বা সুদভিত্তিক ঋণের ব্যবহার কতটুকু হলে শরিয়াহর দৃষ্টিতে সমস্যা তৈরি হয়?
একজন বিনিয়োগকারী হিসেবে এই ধরনের ব্যবসায় অংশীদার হওয়ার আগে কোন কোন শর্ত বা বিষয় যাচাই করা উচিত?
Answer
সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণকারী ব্যবসায় মুশারাকা বিনিয়োগের হুকুম
প্রশ্নের উত্তর: আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। আমি বিস্তারিতভাবে উত্তর প্রদান করছি।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
যে ব্যবসা সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণ করে, সেই ব্যবসায় মুশারাকা অংশীদার হিসেবে বিনিয়োগ করা এবং লাভ গ্রহণ করা শরিয়তসম্মত নয়। এমনকি আপনার বিনিয়োগের টাকা যদি সম্পূর্ণ হালাল হয় এবং সুদ পরিশোধে ব্যবহৃত না হয়, তবুও ব্যবসার সামগ্রিক কার্যক্রমে সুদের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে অংশীদারিত্ব জায়েয হবে না।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ:
১. সুদের মৌলিক নিষিদ্ধতা:
কুরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৮)
আরও বলেন:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا "অথচ আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয় হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
২. সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণকারী ব্যবসায় অংশীদারিত্বের হুকুম:
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.)《রাদ্দুল মুহতার》এ বলেন,
"এমন কোনো ব্যবসায় অংশগ্রহণ করা জায়েয নয় যেখানে সুদভিত্তিক লেনদেন হয়, এমনকি যদি অংশীদারের নিজস্ব মূলধন হালাল হয়। কারণ, অংশীদারিত্বের মাধ্যমে তিনি সেই হারাম লেনদেনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যান।"
(রাদ্দুল মুহতার, ৪/১৮৭)
৩. মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর বক্তব্য:
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তার বিখ্যাত তাফসীর মা'আরিফুল কুরআন-এ বলেন:
"যে ব্যবসা সুদভিত্তিক লেনদেনের সাথে জড়িত, সেই ব্যবসায় অংশগ্রহণ করা এবং তার লাভ গ্রহণ করা জায়েয নয়। কারণ, লাভের একটি অংশ হারাম উৎস থেকে আসে।"
(মা'আরিফুল কুরআন, ২/৩৮৫)
৪. মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম)-এর বক্তব্য:
মুফতি তাকি উসমানি তার ফতোয়ায়ে উসমানি-তে বলেন:
"একটি ব্যবসা যদি সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণ করে, তাহলে সেই ব্যবসার লাভ সম্পূর্ণরূপে পবিত্র নয়। কারণ, ব্যবসার মুনাফা থেকে সুদ পরিশোধ করা হয়, যা হারাম। ফলে অংশীদারদের জন্য সেই লাভ গ্রহণ করা জায়েয হবে না।"
(ফতোয়ায়ে উসমানি, ২/৩৪৫)
৫. ইমদাদুল ফতোয়া থেকে:
মুফতি রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি (রহ.) ইমদাদুল ফতোয়া-তে বলেন:
"যে ব্যবসায় সুদভিত্তিক লেনদেন হয়, তাতে অংশগ্রহণ করা এবং লাভ নেওয়া জায়েয নয়। যদিও অংশীদার নিজে সুদ না দেয়, তবুও ব্যবসার সামগ্রিক কার্যক্রমে সুদের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে অংশগ্রহণ জায়েয নয়।"
(ইমদাদুল ফতোয়া, ৩/২৪৫)
আপনার নির্দিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর:
প্রশ্ন ১: ব্যবসার মূল কার্যক্রম হালাল হলেও সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণ করলে মুশারাকা অংশীদার হিসেবে বিনিয়োগের হুকুম কী?
উত্তর: ব্যবসার মূল কার্যক্রম হালাল হলেও, সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণ করলে সেই ব্যবসায় মুশারাকা অংশীদারিত্ব জায়েয হবে না। কারণ:
- ইসলামী শরিয়তে শুধু মূল কার্যক্রমই নয়, বরং অর্থায়নের উৎসও হালাল হতে হবে।
- সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণ করা নিজেই একটি হারাম কাজ।
- অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আপনি সেই হারাম কাজের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যান।
- ব্যবসার লাভ থেকে সুদ পরিশোধ করা হয়, ফলে লাভের একটি অংশ হারাম উৎসে ব্যয় হয়।
প্রশ্ন ২: আমি যদি সুদভিত্তিক ঋণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকি এবং আমার বিনিয়োগের টাকা সুদ পরিশোধে ব্যবহার না করা হয়, তাহলে কি হুকুম পরিবর্তিত হবে?
উত্তর: না, হুকুম পরিবর্তিত হবে না। কারণ:
- মুশারাকা চুক্তিতে অংশীদারগণ একটি যৌথ ব্যবসায় অংশগ্রহণ করেন।
- ব্যবসার সকল কার্যক্রম যৌথভাবে পরিচালিত হয়।
- আপনার বিনিয়োগের টাকা সুদ পরিশোধে না গেলেও, ব্যবসার সামগ্রিক কার্যক্রমে সুদভিত্তিক লেনদেন হচ্ছে।
- ইসলামী নীতি অনুযায়ী, কোনো হারাম কাজে সহযোগিতা করা বা অংশগ্রহণ করা জায়েয নয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ "সৎকর্ম ও তাকওয়ায় পরস্পর সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরের সহযোগিতা করো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ২)
প্রশ্ন ৩: ব্যবসার ঋণের পরিমাণ বা সুদভিত্তিক ঋণের ব্যবহার কতটুকু হলে শরিয়াহর দৃষ্টিতে সমস্যা তৈরি হয়?
উত্তর: ইসলামী শরিয়তে এখানে কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ নেই। এমনকি সামান্য পরিমাণ সুদভিত্তিক ঋণ হলেও তা হারাম। কারণ:
- হারামের পরিমাণ কম হোক বা বেশি হোক, উভয়ই নিষিদ্ধ।
- রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "সুদের একটি দিরহামও গ্রহণ করা ৩৬টি ব্যভিচারের সমান পাপ।" (মুসনাদ আহমাদ)
- তবে কিছু ফকীহ মনে করেন যে, যদি সুদভিত্তিক ঋণের পরিমাণ এত নগণ্য হয় যে, ব্যবসার সামগ্রিক কার্যক্রমে তার প্রভাব নেই এবং তা সম্পূর্ণ পৃথকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে সেটি ভিন্ন বিষয়। কিন্তু সাধারণভাবে, যেকোনো পরিমাণ সুদভিত্তিক ঋণই সমস্যা সৃষ্টি করে।
প্রশ্ন ৪: একজন বিনিয়োগকারী হিসেবে এই ধরনের ব্যবসায় অংশীদার হওয়ার আগে কোন কোন শর্ত বা বিষয় যাচাই করা উচিত?
উত্তর: একজন বিনিয়োগকারী হিসেবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো যাচাই করা উচিত:
১. ব্যবসার মূল কার্যক্রম হালাল কিনা - ব্যবসাটি কী পণ্য বা সেবা নিয়ে কাজ করে তা যাচাই করুন।
২. অর্থায়নের উৎস - ব্যবসাটি কীভাবে অর্থায়ন করে? কোনো সুদভিত্তিক ঋণ আছে কিনা?
৩. ব্যাংক লেনদেন - ব্যবসাটি প্রচলিত ব্যাংকের সাথে সুদভিত্তিক লেনদেন করে কিনা?
৪. বীমা - ব্যবসাটি প্রচলিত সুদভিত্তিক বীমা ব্যবহার করে কিনা?
৫. বিক্রয় পদ্ধতি - ব্যবসার বিক্রয় পদ্ধতি শরিয়তসম্মত কিনা (যেমন: ঘরার (অনিশ্চয়তা) আছে কিনা)?
৬. চুক্তির শর্তাবলী - মুশারাকা চুক্তির শর্তাবলী শরিয়তসম্মত কিনা?
৭. লাভ-ক্ষতির অনুপাত - লাভ-ক্ষতির অনুপাত পূর্বনির্ধারিত এবং ন্যায্য কিনা?
গুরুত্বপূর্ণ নোট:
১. তওবার সুযোগ: যদি আপনি ইতিমধ্যে এমন ব্যবসায় বিনিয়োগ করে থাকেন, তাহলে তওবা করুন এবং ভবিষ্যতে এমন ব্যবসা থেকে বিরত থাকুন।
২. ইতিমধ্যে অর্জিত লাভ: যদি আপনি এমন ব্যবসায় বিনিয়োগ করে লাভ পেয়ে থাকেন, তাহলে সেই লাভ থেকে সুদের পরিমাণ বাদ দিয়ে বাকি অংশ গ্রহণ করতে পারেন। সুদের পরিমাণ গরীবদের দান করে দিন।
৩. বিকল্প ব্যবস্থা: ইসলামী ব্যাংক বা ইসলামী অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করুন।
দলিলসমূহ:
কুরআন থেকে:
فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ "যদি তোমরা (সুদ) ত্যাগ না কর, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা জেনে নাও।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৯)
হাদীস থেকে:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ وَقَالَ هُمْ سَوَاءٌ "রাসূলুল্লাহ (সা.) সুদখোর, সুদদাতা, সুদের সাক্ষী এবং সুদের লেখককে অভিশাপ দিয়েছেন এবং বলেছেন তারা সবাই সমান।" (সহীহ মুসলিম: ১৫৯৮)
ফিকহের কিতাব থেকে:
আল-হিদায়া-তে বলা হয়েছে:
"যে ব্যবসায় সুদভিত্তিক লেনদেন হয়, তাতে অংশগ্রহণ করা জায়েয নয়। কারণ, অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অংশীদার সেই হারাম লেনদেনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায়।"
(আল-হিদায়া, ৩/১৮৫)
ফতোয়ায়ে আলমগীরী-তে বলা হয়েছে:
"যদি কোনো ব্যবসায়ী সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণ করে, তাহলে তার সাথে অংশীদারিত্ব করা জায়েয নয়। কারণ, অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অংশীদার সেই হারাম কাজে সহযোগী হয়ে যায়।"
(ফতোয়ায়ে আলমগীরী, ২/৩৪৫)
উপসংহার:
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো - যে ব্যবসা সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণ করে, সেই ব্যবসায় মুশারাকা অংশীদার হিসেবে বিনিয়োগ করা এবং লাভ গ্রহণ করা শরিয়তসম্মত নয়। এমনকি আপনার বিনিয়োগের টাকা হালাল হলেও এবং সুদ পরিশোধে ব্যবহৃত না হলেও, ব্যবসার সামগ্রিক কার্যক্রমে সুদের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে অংশীদারিত্ব জায়েয হবে না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হালাল রিজিকের তাওফিক দান করুন এবং হারাম থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।