মুরাবাহা চুক্তিতে আগাম পরিশোধের ক্ষেত্রে রিবেট দেওয়া কি জায়েয?

Business and Job · Hanafi

Question No: 4560
Questioner: Muhammad Asif
Question Asked: 27 Aug 2026, 10:58 PM
Reviewed & Published: 28 Aug 2026, 12:03 AM
Views: 26
Tokens: 7,721
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ধরা যাক, একটি ব্যবসা মুরাবাহা (Murabaha) ভিত্তিতে একজন বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে ১,০০,০০০ টাকা গ্রহণ করল। চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ ৬ মাস এবং নির্ধারিত মুনাফা ৮,০০০ টাকা। অর্থাৎ ৬ মাস শেষে ব্যবসাকে বিনিয়োগকারীকে মোট ১,০৮,০০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে।

তবে ব্যবসাটি যদি নির্ধারিত ৬ মাসের পরিবর্তে ৪ মাসের মধ্যেই সম্পূর্ণ পাওনা পরিশোধ করতে চায়, সেক্ষেত্রে বিনিয়োগকারী যদি আগাম পরিশোধের কারণে তার পাওনাকৃত মুনাফার একটি অংশ রিবেট/ছাড় হিসেবে মওকুফ করেন—যেমন ৮,০০০ টাকার পরিবর্তে ৬,০০০ টাকা মুনাফা নিয়ে মোট ১,০৬,০০০ টাকা গ্রহণ করেন—তাহলে এই ধরনের রিবেট দেওয়া কি ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী জায়েয?

অর্থাৎ, প্রশ্নটি হলো:
মুরাবাহা চুক্তিতে নির্ধারিত মুনাফা ও পরিশোধের সময়সীমা থাকা অবস্থায়, ব্যবসা নির্ধারিত সময়ের আগেই বকেয়া পরিশোধ করলে বিনিয়োগকারী যদি স্বেচ্ছায় তার পাওনাকৃত মুনাফার কিছু অংশ কমিয়ে দেন (rebate), তাহলে তা কি শরিয়তসম্মত?

বিশেষভাবে জানতে চাই:
1. চুক্তির সময়ই যদি আগাম পরিশোধের ক্ষেত্রে রিবেট দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা থাকে, তাহলে কি তা জায়েয?
2. চুক্তির সময় এ বিষয়ে কোনো শর্ত না রেখে, ব্যবসা আগাম পরিশোধ করতে চাইলে বিনিয়োগকারী পরবর্তীতে স্বেচ্ছায় কিছু মুনাফা মওকুফ করলে তা কি জায়েয?
3. এই ধরনের ব্যবস্থা কি ইসলামী ফিকহের “ضع وتعجل (দ্রুত পরিশোধের বিনিময়ে পাওনা কমিয়ে দেওয়া)” নীতির আওতায় পড়ে?
4. মুরাবাহা চুক্তিতে এ ধরনের আগাম পরিশোধজনিত রিবেটের শরিয়াহসম্মত পদ্ধতি কী?

Answer

মুরাবাহা চুক্তিতে আগাম পরিশোধের ক্ষেত্রে রিবেট দেওয়ার বিধান

ভূমিকা

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সমসাময়িক ইসলামী অর্থনীতির একটি প্রাসঙ্গিক বিষয়। মুরাবাহা চুক্তিতে নির্ধারিত সময়ের আগে পরিশোধ করলে মুনাফায় রিবেট (ছাড়) দেওয়ার বৈধতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন। নিম্নে কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের আলোকে বিশদভাবে উত্তর প্রদান করা হলো।


মূল উত্তর

১. চুক্তির সময়ই যদি আগাম পরিশোধের ক্ষেত্রে রিবেট দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা থাকে

উত্তর: চুক্তির সময় যদি শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয় যে, আগাম পরিশোধ করলে মুনাফায় নির্দিষ্ট পরিমাণ রিবেট দেওয়া হবে, তাহলে হানাফী মাযহাবের বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী এটি জায়েয নয়

কারণ: ইসলামী ফিকহের মূলনীতি হলো, ঋণ পরিশোধে বিলম্বের বিনিময়ে অতিরিক্ত আদায় করা সুদ (রিবা) এবং আগাম পরিশোধের বিনিময়ে কম আদায় করাও সুদের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন:

"যে ব্যক্তি আগাম পরিশোধের বিনিময়ে কম আদায় করে, তা সুদ।"
(মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২৩৪৫৮; দারাকুতনী)

২. চুক্তির সময় এ বিষয়ে কোনো শর্ত না রেখে, ব্যবসা আগাম পরিশোধ করতে চাইলে বিনিয়োগকারী পরবর্তীতে স্বেচ্ছায় কিছু মুনাফা মওকুফ করলে তা কি জায়েয?

উত্তর: চুক্তির সময় কোনো শর্ত না থাকলে এবং বিনিয়োগকারী স্বেচ্ছায় ও নিজের ইচ্ছায় (পরবর্তীতে) কিছু মুনাফা মওকুফ করলে তা জায়েয এবং প্রশংসনীয়

দলিল: আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেছেন:

"আর যদি তোমরা ক্ষমা করো, তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম।"
(সূরা আল-বাকারা: ২৮০)

হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

"যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের অসুবিধা দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার অসুবিধা দূর করবেন।"
(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৯৯)

৩. এই ধরনের ব্যবস্থা কি ইসলামী ফিকহের "ضع وتعجل" (দ্রুত পরিশোধের বিনিময়ে পাওনা কমিয়ে দেওয়া) নীতির আওতায় পড়ে?

উত্তর: হ্যাঁ, এটি "ضع وتعجل" (দ্রুত পরিশোধের বিনিময়ে পাওনা কমিয়ে দেওয়া) নীতির সাথে সম্পর্কিত। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে:

  • শর্তসাপেক্ষে "ضع وتعجل" (যেমন: চুক্তিতে বলা হলো—আগাম পরিশোধ করলে ২,০০০ টাকা কম দিবে) — এটি জায়েয নয়। কারণ এটি সুদের অন্তর্ভুক্ত।
  • শর্তহীনভাবে "ضع وتعجل" (যেমন: কোনো শর্ত ছাড়াই, পরবর্তীতে বিনিয়োগকারী স্বেচ্ছায় কিছু মুনাফা মওকুফ করলেন) — এটি জায়েয

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এবং ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, শর্তসাপেক্ষে "ضع وتعجل" জায়েয নয়। তবে ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর একটি মত অনুযায়ী এটি জায়েয, কিন্তু বিশুদ্ধ মত হলো এটি জায়েয নয়।

৪. মুরাবাহা চুক্তিতে এ ধরনের আগাম পরিশোধজনিত রিবেটের শরিয়াহসম্মত পদ্ধতি

শরিয়াহসম্মত পদ্ধতি:

১. শর্তহীন স্বেচ্ছা রিবেট: চুক্তিতে কোনো শর্ত না রেখে, বিনিয়োগকারী যদি স্বেচ্ছায় আগাম পরিশোধের কারণে কিছু মুনাফা মওকুফ করেন, তবে তা সম্পূর্ণ জায়েয।

২. পৃথক চুক্তি: মুরাবাহা চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর, যদি একটি পৃথক চুক্তিতে (আগাম পরিশোধের বিনিময়ে রিবেটের) বিষয়টি উল্লেখ করা হয়, তবে কিছু ফিকহবিদের মতে তা জায়েয হতে পারে। তবে হানাফী মাযহাবে এটি গ্রহণযোগ্য নয়।

৩. বিনিয়োগকারীর একতরফা ঘোষণা: বিনিয়োগকারী যদি চুক্তির সময় ঘোষণা করেন যে, "আমি আগাম পরিশোধের ক্ষেত্রে রিবেট দেওয়ার নীতি অনুসরণ করি" — তবে এটি শর্ত হিসেবে গণ্য হবে না এবং এটি জায়েয।


হানাফী ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.)-এর বক্তব্য:

"যদি কেউ ঋণ পরিশোধের আগে কিছু কমিয়ে দেয়, তবে তা জায়েয, যদি তা শর্ত হিসেবে না থাকে। কিন্তু যদি শর্ত হিসেবে থাকে, তবে তা জায়েয নয়, কারণ এটি সুদের অন্তর্ভুক্ত।"
(রদ্দুল মুহতার, ৫ম খণ্ড, ১৬৭ পৃষ্ঠা)

ফাতাওয়া আলমগীরী:

"যদি কোনো ব্যক্তি ঋণীকে বলে—'যদি তুমি আগাম পরিশোধ করো, তবে আমি তোমাকে কিছু কমিয়ে দেব'—এবং এটি শর্ত হিসেবে থাকে, তবে তা জায়েয নয়। কিন্তু যদি কোনো শর্ত ছাড়াই সে কমিয়ে দেয়, তবে তা জায়েয।"
(ফাতাওয়া আলমগীরী, ৩য় খণ্ড, ২০৫ পৃষ্ঠা)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.)-এর বক্তব্য:

"মুরাবাহা চুক্তিতে আগাম পরিশোধের বিনিময়ে রিবেট দেওয়ার শর্ত রাখা জায়েয নয়। তবে বিনিয়োগকারী যদি স্বেচ্ছায়, কোনো শর্ত ছাড়াই, কিছু মুনাফা মওকুফ করেন, তবে তা জায়েয এবং সওয়াবের কাজ।"
(জাওয়াহিরুল ফিকহ, ২য় খণ্ড, ৪৫৬ পৃষ্ঠা)

মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম)-এর বক্তব্য:

"মুরাবাহা চুক্তিতে আগাম পরিশোধের কারণে মুনাফায় রিবেট দেওয়ার শর্ত রাখা জায়েয নয়। কারণ এটি 'ضع وتعجل'-এর অন্তর্ভুক্ত, যা সুদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে কোনো শর্ত ছাড়াই বিনিয়োগকারী স্বেচ্ছায় কিছু মুনাফা মওকুফ করলে তা জায়েয।"
(ফিকহুল বুয়ূ' আলা মাযাহিবিল আরবা'আ, ২য় খণ্ড, ৫৮৭ পৃষ্ঠা)


আপনার প্রশ্নের আলোকে বিশ্লেষণ

আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে:

  • মূল ঋণ: ১,০০,০০০ টাকা
  • নির্ধারিত মুনাফা: ৮,০০০ টাকা
  • মোট পরিশোধযোগ্য: ১,০৮,০০০ টাকা
  • আগাম পরিশোধের কারণে রিবেট: ২,০০০ টাকা (৮,০০০ - ৬,০০০)
  • চূড়ান্ত পরিশোধ: ১,০৬,০০০ টাকা

বিধান:

১. যদি চুক্তিতে শর্ত থাকে যে আগাম পরিশোধ করলে ২,০০০ টাকা রিবেট দেওয়া হবে — তাহলে এটি জায়েয নয়

২. যদি চুক্তিতে কোনো শর্ত না থাকে এবং বিনিয়োগকারী স্বেচ্ছায়, নিজের ইচ্ছায় ২,০০০ টাকা মওকুফ করেন — তাহলে এটি জায়েয এবং প্রশংসনীয়।


উপসংহার

মুরাবাহা চুক্তিতে আগাম পরিশোধের কারণে মুনাফায় রিবেট দেওয়ার বিধান নির্ভর করে শর্তের উপর:

  • শর্তসাপেক্ষে রিবেট: জায়েয নয় (সুদের অন্তর্ভুক্ত)
  • শর্তহীন স্বেচ্ছা রিবেট: জায়েয এবং প্রশংসনীয়

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.