আহলে হাদীস মতানুসারে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে জুলুসে (মিছিলে) যাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেসার প্রতিউত্তরে হারাম বলা কি সঠিক হয়েছে?
Sunnah and Bid'ah · Ahle Hadith / Salafi
Question
এভাবে হারাম বলা কি গুনাহ এর কাজ হলো? বর্তমানে আমার করনীয় কি হবে যাতে আমি আল্লাহ্ তা'আলার কাছে দায়ি না থাকি এরজন্য।
Answer
মিলাদুন্নবী উপলক্ষে জুলুসে যাওয়া এবং "হারাম" বলার বিধান
প্রশ্নের উত্তর
আপনার প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত: ১. মিলাদুন্নবী উপলক্ষে জুলুস/মিছিলে যাওয়া কি হারাম? ২. কাউকে "হারাম" বলার পর করণীয় কী?
১. মিলাদুন্নবী উদযাপন ও জুলুসের বিধান
কুরআন ও হাদীসের আলোকে মূলনীতি
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে মনোনীত করলাম।" (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আমাদের এই দীনে নতুন কিছু উদ্ভাবন করল যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।" (সহীহ বুখারী: ২৬৯৭, সহীহ মুসলিম: ১৭১৮)
"তোমরা নব-উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকো। কারণ প্রতিটি নব-উদ্ভাবিত বিষয় হলো বিদ'আত, এবং প্রতিটি বিদ'আত হলো পথভ্রষ্টতা।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৬০৭, তিরমিযী: ২৬৭৬ - সহীহ)
মিলাদুন্নবী উদযাপন সম্পর্কে সালাফে সালেহীনের মতামত
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"মিলাদুন্নবী উদযাপন করা মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত একটি বিষয়। যারা এটি পালন করে, তারা এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে চায়। তবে এটি বিদ'আত, কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ, খুলাফায়ে রাশেদীন এবং সাহাবায়ে কেরাম কেউই এটি পালন করেননি।"
শায়খ ইবনে বায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"মিলাদুন্নবী উদযাপন করা একটি বিদ'আত। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবদ্দশায়, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন এবং ইমামগণ কেউই এটি পালন করেননি। বরং এটি পরবর্তী যুগে উদ্ভাবিত হয়েছে।"
শায়খ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"মিলাদুন্নবী উদযাপন একটি বিদ'আত, যা দীনে প্রবেশ করানো হয়েছে। প্রতিটি বিদ'আতই পথভ্রষ্টতা।"
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"মিলাদুন্নবী উদযাপন করা হারাম এবং বিদ'আত। কারণ এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে ছিল না, সাহাবাদের যুগে ছিল না, তাবেয়ীদের যুগেও ছিল না।"
শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:
"মিলাদুন্নবী উদযাপন একটি বিদ'আত। রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং সাহাবায়ে কেরাম কেউই এটি পালন করেননি। বরং এটি ফাতেমীয় শাসকদের সময় থেকে শুরু হয়েছে।"
জুলুস/মিছিলের বিধান
যেহেতু মিলাদুন্নবী উদযাপন নিজেই একটি বিদ'আত, তাই এর অংশ হিসেবে জুলুস/মিছিল করাও বিদ'আত। তবে একে "হারাম" বলার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, কারণ:
- বিদ'আতের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে (বিদ'আত মুকাফফিরা বা কুফরী, বিদ'আত মুহাররিমা বা হারাম, বিদ'আত মাকরূহা ইত্যাদি)
- সকল বিদ'আতকে একই পর্যায়ের বলা যাবে না
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ বিদ'আতকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন: ১. বিদ'আত যা কুফরী (যেমন: কবর পূজা, আল্লাহর সাথে শিরক) ২. বিদ'আত যা গুনাহ (যেমন: মিলাদুন্নবী উদযাপন, জুলুস বের করা)
২. "হারাম" বলার পর করণীয়
"হারাম" শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা
ইসলামী আইনগত পরিভাষায় "হারাম" বলা হয় এমন বিষয়কে যা কুরআন বা সহীহ হাদীস দ্বারা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। বিদ'আত সম্পর্কে বলা যায় যে এটি "বিদ'আত" বা "পথভ্রষ্টতা", তবে সকল বিদ'আতকে "হারাম" বলা সঠিক নাও হতে পারে, কারণ কিছু বিদ'আত মাকরূহ (অপছন্দনীয়) হতে পারে।
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"বিদ'আত দুই প্রকার: বিদ'আত যা হারাম এবং বিদ'আত যা মাকরূহ। তবে অধিকাংশ বিদ'আতই হারামের অন্তর্ভুক্ত।"
শায়খ সালেহ আল-ফাওযান (হাফিজাহুল্লাহ) বলেন:
"বিদ'আতের ব্যাপারে মূলনীতি হলো, সকল বিদ'আত পথভ্রষ্টতা। তবে কিছু বিদ'আত কুফরী পর্যায়ের, কিছু হারাম পর্যায়ের, আর কিছু মাকরূহ পর্যায়ের।"
আপনার করণীয়
যেহেতু আপনি মনে করছেন যে "হারাম" বলা অহংকারবশত হয়েছে, তাই আপনার করণীয়:
১. তাওবাহ করা: আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর যারা তাওবাহ করে এবং সৎকর্ম করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের গুনাহ মাফ করে দেন এবং তাদেরকে ক্ষমা করেন।" (সূরা আল-ফুরকান: ৭০)
২. দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা: বিদ'আত সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা এবং সঠিক পরিভাষা ব্যবহার করা।
৩. হিকমাহ (প্রজ্ঞা) সহকারে দাওয়াত দেওয়া: আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তুমি মানুষকে তোমার রবের পথে হিকমত এবং উত্তম উপদেশ দ্বারা আহ্বান করো।" (সূরা আন-নাহল: ১২৫)
৪. উত্তম পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করা: যাকে আপনি "হারাম" বলেছেন, তাকে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলুন যে মিলাদুন্নবী উদযাপন বিদ'আত, এবং বিদ'আত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সতর্কবাণী উল্লেখ করুন।
৫. নিজের জ্ঞানকে পরিশুদ্ধ করা: বিদ'আতের বিভিন্ন প্রকার ও মাত্রা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা, যাতে ভবিষ্যতে সঠিক পরিভাষা ব্যবহার করতে পারেন।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
১. মিলাদুন্নবী উপলক্ষে জুলুসে যাওয়া বিদ'আত - এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ, সাহাবায়ে কেরাম এবং সালাফে সালেহীনের যুগে ছিল না। তবে একে "হারাম" বলার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন, কারণ সকল বিদ'আত এক পর্যায়ের নয়।
২. "হারাম" বলা গুনাহের কাজ নয় যদি আপনার নিয়ত সঠিক হয় এবং আপনি দ্বীনের সঠিক জ্ঞানের ভিত্তিতে এটি বলে থাকেন। তবে অহংকারবশত বললে তা গুনাহ হতে পারে।
৩. আপনার করণীয়:
- আল্লাহর কাছে তাওবাহ করুন
- দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করুন
- হিকমাহ সহকারে দাওয়াত দিন
- যাকে বলেছেন, তাকে সুন্দরভাবে বুঝান
৪. মূলনীতি: বিদ'আত সম্পর্কে বলার সময় "বিদ'আত" এবং "পথভ্রষ্টতা" শব্দ ব্যবহার করা অধিক নিরাপদ, কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই এই শব্দ ব্যবহার করেছেন।
"রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: 'যে ব্যক্তি আমার উপর দরুদ পাঠাবে, আল্লাহ তার উপর রহমত বর্ষণ করবেন।' (সহীহ মুসলিম: ৪০৮)"
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক জ্ঞান দান করুন এবং বিদ'আত থেকে হেফাজত করুন। আমীন।