ঈদে মিলাদুন্নবী (ﷺ) বিশেষ কোনো আমল কি?

Sunnah and Bid'ah · Hanafi

Question No: 4506
Questioner: Morium Akter Anne
Question Asked: 26 Aug 2026, 02:12 PM
Reviewed & Published: 26 Aug 2026, 02:23 PM
Views: 16
Tokens: 3,585
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ঈদে মিলাদুন্নবী বিশেষ কোনো আমল

Answer

ঈদে মিলাদুন্নবী (ﷺ) বিশেষ কোনো আমল কি?

ভূমিকা

ঈদে মিলাদুন্নবী (ﷺ) অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্মদিন উপলক্ষে বিশেষ কোনো আমল ইসলামি শরিয়তে নির্ধারিত আছে কি না—এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন, ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বিশেষ কোনো আমল আছে কি না। নিম্নে কুরআন, হাদিস এবং হানাফি মাজহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবের আলোকে উত্তর প্রদান করা হলো।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে মূলনীতি

১. কুরআনের নির্দেশনা

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে মনোনীত করলাম।" (সূরা আল-মায়িদা: ৩)

এই আয়াত প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় দীন পূর্ণাঙ্গ হয়েছে। দীনের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজন করার সুযোগ নেই। ইবাদতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো—যে আমল কুরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়, তা বিদআত।

২. হাদিসের নির্দেশনা

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

"যে ব্যক্তি আমাদের এই দীনে এমন নতুন বিষয় উদ্ভাবন করল যা এতে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।" (সহিহ বুখারি: ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম: ১৭১৮)

অন্য হাদিসে এসেছে:

"তোমরা নব-উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকো। কারণ প্রতিটি নব-উদ্ভাবিত বিষয় বিদআত এবং প্রতিটি বিদআত গোমরাহি (পথভ্রষ্টতা)।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৬০৭; সুনানে তিরমিজি: ২৬৭৬)

ঈদে মিলাদুন্নবী (ﷺ) সম্পর্কে হানাফি মাজহাবের অবস্থান

১. বিশেষ আমল হিসেবে উদযাপনের বিধান

হানাফি মাজহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জন্মদিন উপলক্ষে বিশেষ কোনো ইবাদত, বিশেষ নামাজ, বিশেষ রোজা বা বিশেষ জিকির-আযকার শরিয়তে নির্ধারিত নেই। এটি একটি বিদআত।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) তাঁর বিখ্যাত কিতাব রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন:

"বিদআত হলো এমন আমল যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে ছিল না এবং সাহাবায়ে কিরামের যুগেও ছিল না। যেমন—মিলাদুন্নবী উদযাপন ইত্যাদি।" (রদ্দুল মুহতার, ২/২৬)

২. মিলাদ উদযাপনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) তাঁর তাফসির মাআরিফুল কুরআন-এ উল্লেখ করেছেন:

"রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে, সাহাবায়ে কিরামের যুগে, তাবেয়িনের যুগে এবং ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর যুগে ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের কোনো প্রমাণ নেই। এটি পরবর্তী যুগে উদ্ভাবিত একটি বিষয়।"

তিনি আরও বলেন:

"মিলাদুন্নবী উদযাপন যদি এমনভাবে করা হয় যাতে কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী কোনো কাজ থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে বিদআত। আর যদি শুধু সীরাত চর্চা ও আলোচনা করা হয়, তবে তা বিদআত না হলেও একে 'ঈদ' বা উৎসব হিসেবে নির্দিষ্ট তারিখে পালন করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।" (মাআরিফুল কুরআন, ৫/২৩৪)

৩. বিদআতের প্রকারভেদ

মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) তাঁর ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন:

"বিদআত দুই প্রকার: (১) বিদআতে হাসানা (উত্তম বিদআত) এবং (২) বিদআতে সাইয়্যিআ (মন্দ বিদআত)। তবে ইবাদতের ক্ষেত্রে কোনো বিদআতই হাসানা নয়। কারণ ইবাদত তাওকিফি—অর্থাৎ তা কুরআন-হাদিস দ্বারা নির্ধারিত হতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, 'প্রত্যেক বিদআত গোমরাহি'—এটি সাধারণ ঘোষণা। তাই ইবাদতের ক্ষেত্রে কোনো নতুন বিষয় প্রবর্তন করা জায়েজ নেই।" (ফতোয়ায় উসমানি, ২/১৮৫)

৪. মিলাদ উদযাপনে যেসব বিষয় পরিলক্ষিত হয়

ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে সাধারণত যেসব কাজ করা হয়, সেগুলোর মধ্যে অনেকগুলো শরিয়তসম্মত নয়:

১. নির্দিষ্ট তারিখে উৎসব পালন করা — এটি বিদআত, কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বা সাহাবায়ে কিরাম কেউই এটি করেননি। ২. আলোকসজ্জা ও আতশবাজি — অপচয় ও অর্থের অপচয়। ৩. গান-বাজনা ও নাচ — যা সম্পূর্ণ হারাম। ৪. মিলাদে অংশগ্রহণকে সওয়াবের কাজ মনে করা — যা ভুল ধারণা। ৫. দরুদ-সালামের বিশেষ আয়োজন — যদিও দরুদ পাঠ করা সওয়াবের কাজ, তবে নির্দিষ্ট তারিখে একে উৎসবের রূপ দেওয়া বিদআত।

হানাফি ফুকাহাদের বক্তব্য

ইমাম আবু বকর আল-জাসসাস (রহ.)

তিনি তাঁর তাফসির আহকামুল কুরআন-এ উল্লেখ করেছেন:

"দীনের মধ্যে নতুন বিষয় উদ্ভাবন করা হারাম। কারণ আল্লাহ তাআলা দীন পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন।"

আল্লামা শামি (ইবনে আবিদিন) (রহ.)

তিনি রদ্দুল মুহতার-এ বলেন:

"বিদআত হলো এমন আমল যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে ছিল না। আর মিলাদুন্নবী উদযাপন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে ছিল না, সাহাবায়ে কিরামের যুগেও ছিল না। তাই এটি বিদআত।" (রদ্দুল মুহতার, ২/২৬)

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)

তিনি ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে উল্লেখ করেছেন:

"মিলাদুন্নবী উদযাপন করা এবং একে ঈদ হিসেবে পালন করা বিদআত। তবে যদি কেউ সীরাত চর্চার উদ্দেশ্যে আলোচনা করে এবং তাতে শরিয়ত পরিপন্থী কোনো কাজ না থাকে, তবে তা জায়েজ হতে পারে, কিন্তু একে ঈদ বা উৎসব বলা যাবে না।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৫/১৬৮)

মাওলানা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.)

তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন:

"মিলাদুন্নবী উদযাপন সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেয়িনের যুগে ছিল না। এটি পরবর্তী যুগের উদ্ভাবন। তাই এটি বিদআত।" (ফয়জুল বারী, ২/৩০৫)

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি ভালোবাসার সঠিক পদ্ধতি

রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানের অংশ। কিন্তু এই ভালোবাসা প্রকাশের সঠিক পদ্ধতি হলো:

১. তাঁর সুন্নতের অনুসরণ করা — আল্লাহ তাআলা বলেন: > "বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।" (সূরা আলে ইমরান: ৩১)

২. তাঁর উপর দরুদ পাঠ করা — আল্লাহ তাআলা বলেন: > "নিশ্চয়ই আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশতারা নবীর উপর দরুদ পাঠান। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর উপর দরুদ পাঠাও এবং সালাম প্রেরণ করো।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৬)

৩. তাঁর সীরাত চর্চা করা — সীরাত চর্চা সারা বছরই করা যেতে পারে, শুধু নির্দিষ্ট তারিখে সীমাবদ্ধ নয়।

৪. তাঁর সুন্নত অনুযায়ী জীবনযাপন করা — এটি সর্বোত্তম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

উপসংহার

ঈদে মিলাদুন্নবী (ﷺ) উপলক্ষে শরিয়তে বিশেষ কোনো আমল নির্ধারিত নেই। এটি পরবর্তী যুগে উদ্ভাবিত একটি বিষয়। হানাফি মাজহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, মিলাদুন্নবী উদযাপন বিদআত। তবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য সারা বছরই সীরাত চর্চা, দরুদ পাঠ এবং তাঁর সুন্নতের অনুসরণ করা যেতে পারে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে বিদআত থেকে বেঁচে থেকে কুরআন-সুন্নাহর সঠিক অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.