মিলাদুন্নবী উপলক্ষে জুলুসে (মিছিলে) যাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেসার প্রতিউত্তরে হারাম বলা কি সঠিক হয়েছে?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
এভাবে হারাম বলা কি গুনাহ এর কাজ হলো?
Answer
জুলুসে যাওয়া হারাম বলা প্রসঙ্গে
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ: একজন ব্যক্তি মিলাদুন্নবী উপলক্ষে জুলুসে (মিছিলে) যাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে উত্তরে বলা হয়েছে "জুলুসে যাওয়া হারাম" এবং একে বিদ'আত বলা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এভাবে হারাম বলা কি গুনাহের কাজ?
উত্তর:
১. অহংকারবশত দ্বীনি কথা বলার শরয়ী বিধান
দ্বীনের কোনো সঠিক কথা বা নসীহতও যদি নিজের মাঝে অহংকার, বড়ত্ব প্রকাশ করা এবং অপরকে তুচ্ছজ্ঞান করার উদ্দেশ্যে বলা হয়, তবে তা একটি মারাত্মক আত্মিক ব্যাধি ও কবীরা গুনাহ। অহংকার অন্তরের একটি অত্যন্ত গোপন রোগ, যা অনেক সময় মানুষ নিজেও বুঝতে পারে না ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ দম্ভভরে কথা বলা বা নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করাকে কঠোরভাবে নিন্দা করেছেন। অতএব, আপনার মনে যে অনুভূতি হয়েছে যে আপনি অহংকারবশত কথাটি বলেছেন, এই অহংকারী মনোভাব বা নিয়তের কারণে আপনি অবশ্যই গুনাহগার হয়েছেন । এজন্য আল্লাহর নিকট আন্তরিকভাবে তওবা ও ইস্তিগফার করা ওয়াজিব।
- কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর: দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা ৪১০-৪১২ (অহংকার ও পোশাকের হুকুম পরিচ্ছেদ)।
২. আলেম বা মুফতী ছাড়া সরাসরি "হারাম" ফতোয়া দেওয়ার হুকুম
ইসলামি শরীয়তের একটি অকাট্য নিয়ম হলো, কোনো আলেম বা যোগ্য মুফতী ছাড়া সাধারণ মানুষের জন্য নিজের পক্ষ থেকে কোনো বিষয়কে চূড়ান্তভাবে "হারাম" বা "হালাল" ফতোয়া দেওয়া সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ এবং আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করার শামিল।
- ফাতাওয়া খানিয়াহ ও দরসুল ফিকহ-এর সিদ্ধান্ত:
"অনুমান করে হালালকে হারাম বলে বা হারামকে হালাল বলে আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যা আরোপের দুঃসাহস যেন না দেখায়।" ।
- হাদীস শরীফের কঠোর হুঁশিয়ারি:
"তোমাদের মাঝে ফাতওয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে দুঃসাহসী সেই যে জাহান্নামের ব্যাপারে সবচেয়ে দুঃসাহসী।" (সুনানে দারেমী) ।
অতএব, মাসআলাগতভাবে জুলুসের কর্মকাণ্ড যদি গুনাহের কাজও হয়ে থাকে, তবুও আপনার মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে চূড়ান্তভাবে নিজের পক্ষ থেকে "হারাম" ফতোয়া দেওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে অনধিকার চর্চা ও গুনাহের কাজ হয়েছে । সাধারণ মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের পক্ষ থেকে ফতোয়া না দিয়ে বিজ্ঞ মুফতী বা নির্ভরযোগ্য কিতাবের সমাধানটি নম্রতার সাথে উপস্থাপন করা ।
- কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা ৪১-৪২ (ফাতওয়া প্রদানের যোগ্যতা ও সতর্কতা পরিচ্ছেদ)।
- ফাতাওয়া খানিয়্যা (ফাতাওয়া হিন্দিয়ার মার্জিনে), ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১।
৩. প্রচলিত জুলুস ও মীলাদুন্নবীর শরয়ী হুকুম
-
প্রচলিত জুলুসের ত্রুটিসমূহ: প্রচলিত মীলাদুন্নবী উপলক্ষে যে জুলুস বা শোভাযাত্রা বের করা হয়, তাতে যদি বাদ্যযন্ত্র বাজানো, গান-বাজনা, অপব্যয়, নারী-পুরুষের মেলামেশা, রাস্তা বন্ধ করে মানুষের কষ্ট দেওয়া বা বানোয়াট ও জাল হাদীসের বর্ণনা থাকে, তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েয বা মাকরূহে তাহরীমী (ক্ষেত্রবিশেষে হারাম)।
-
বিদআতের হুকুম: যেহেতু রাসূলুল্লাহ ﷺ, সাহাবায়ে কেরাম বা তাবেয়ীদের যুগে ঘটা করে সওয়াবের কাজ বা ইবাদত মনে করে এভাবে জুলুস বা শোভাযাত্রার কোনো প্রমাণ নেই, তাই একে দ্বীনের অংশ মনে করা একটি বিদআত।
-
তবে শরীয়তসম্মত সীমার ভেতরে থেকে, কোনো নির্দিষ্ট দিন-তারিখের বাধ্যবাধকতা ছাড়া এবং যাবতীয় কুসংস্কার বর্জন করে যদি নবীজী ﷺ-এর আলোচনা ও সওয়াবের কাজ করা হয়, তবে তা প্রশংসনীয় ও সওয়াবের কারণ ।
-
কিতাব ও পৃষ্ঠা নম্বর: ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০০ এবং পৃষ্ঠা ১৮১-১৮৩ (বিদআত ও রসুম অধ্যায়) ।
চূড়ান্ত ফয়সালা:
আপনার দেওয়া মাসআলাটি (রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে প্রচলিত জুলুসের অস্তিত্ব না থাকা এবং তা বিদআত হওয়া) সঠিক হলেও, তা অহংকারবশত এবং ফতোয়া দেওয়ার যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও নিজের পক্ষ থেকে সরাসরি "হারাম" শব্দ চূড়ান্তভাবে ব্যবহার করার কারণে আপনি গুনাহগার হয়েছেন।
এজন্য আল্লাহর নিকট অহংকারের ব্যাধি থেকে মুক্তির জন্য এবং ফতোয়া দেওয়ার দুঃসাহস দেখানোর জন্য অনুতপ্ত হয়ে আন্তরিকভাবে ইস্তিগফার (ক্ষমাপ্রার্থনা) করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।