Breaking the marriage proposal
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
এখন পাত্রের কি করা উচিত? যেহেতু বিয়ে এগিয়ে নেওয়ার চেয়ে ভেঙে দেওয়া সহজ মনে হচ্ছে আর পাত্রীর মধ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে সেহেতু বিয়ে ভেঙে দেওয়ার জন্য পাত্রীর অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করবে? নাকি চুপচাপ আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে থাকবে। স্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। জাজাকাল্লাহ খাইরান।
Answer
বিয়ে ভাঙার সিদ্ধান্ত ও ইস্তেখারার ফলাফল সম্পর্কে শরয়ী নির্দেশনা
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন:
১. ইস্তেখারার প্রকৃতি ও ফলাফল
ইস্তেখারা কোনো ভবিষ্যদ্বাণী বা গায়েব জানার মাধ্যম নয়। এটি আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনার একটি দোয়া। ইস্তেখারার ফলাফল সাধারণত মনে শান্তি বা অশান্তির মাধ্যমে প্রকাশ পায়, তবে এটি সর্বদা নির্ভরযোগ্য নয়। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, ইস্তেখারার পর যে বিষয়ে মনে প্রশান্তি আসে, তা-ই করা উচিত। তবে মনে অস্থিরতা আসার অর্থ এই নয় যে, বিষয়টি অবশ্যই অকল্যাণকর।
রদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৭
قال العلامة ابن عابدين: "والمستحب أن يفعل ما ينشرح له صدره بعد الاستخارة"
২. বিয়ে ভাঙার বিধান
বিয়ে চূড়ান্ত হওয়ার পর (প্রস্তাব ও সম্মতির পর) তা ভাঙা ইসলামে অপছন্দনীয়। হাদিসে এসেছে:
সুনানে আবু দাউদ, ২১৭৩
قال رسول الله ﷺ: "لَا يَخْطُبِ الرَّجُلُ عَلَى خِطْبَةِ أَخِيهِ حَتَّى يَنْكِحَ أَوْ يَتْرُكَ"
"কোনো ব্যক্তি তার ভাইয়ের বাগদানের উপর বাগদান করবে না, যতক্ষণ না সে বিবাহ করে বা ছেড়ে দেয়।"
তবে যদি স্পষ্ট কোনো শরয়ী কারণ থাকে (যেমন: দীনদারির অভাব, চরিত্রগত ত্রুটি, গুরুতর সমস্যা), তাহলে বিয়ে ভাঙা জায়েজ হতে পারে।
৩. পাত্রের করণীয়
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:
- পাত্রের মনে পাত্রীর ব্যাপারে কোনো অস্থিরতা নেই
- পাত্রী মানসিক অস্থিরতায় ভুগছেন এবং পাত্রকে সন্দেহ করছেন
- পাত্রের পারিবারিক ও আর্থিক সমস্যা রয়েছে
- পাত্রের পিতার গাফলতি রয়েছে
এক্ষেত্রে আমার পরামর্শ:
ক. তাওয়াক্কুল ও ধৈর্য:
আল্লাহর উপর ভরসা রেখে терпение ধরা উচিত। পাত্রের উচিত বেশি বেশি ইস্তেখারা করা এবং আল্লাহর কাছে হিদায়াত চাওয়া। মহান আল্লাহ বলেন:
সূরা আত-তালাক, ৬৫:২-৩
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
"যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।"
খ. পাত্রীর সাথে যোগাযোগ:
পাত্রের উচিত পাত্রীর সাথে খোলামেলা আলোচনা করা, তার উদ্বেগ দূর করা এবং তাকে আশ্বস্ত করা। পাত্রীর সন্দেহ দূর করার চেষ্টা করা উচিত।
গ. অভিভাবকদের সাথে আলোচনা:
পাত্রের উচিত নিজের পিতা ও পাত্রীর অভিভাবকদের সাথে বসে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করা। পাত্রের পিতার গাফলতি সম্পর্কে তাকে বোঝানো এবং পরিস্থিতি উন্নতির চেষ্টা করা।
ঘ. বিয়ে ভাঙার সিদ্ধান্ত:
যেহেতু পাত্রের মনে পাত্রীর ব্যাপারে কোনো অস্থিরতা নেই এবং পাত্রী সম্পর্কে পাত্রের আস্থা আছে, তাই শুধুমাত্র পাত্রীর মানসিক অস্থিরতা বা পারিবারিক সমস্যার কারণে বিয়ে ভাঙা উচিত নয়। বরং এগুলো সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।
ঙ. ইস্তেখারার ভুল ব্যাখ্যা:
পাত্রীর মানসিক অস্থিরতাকে ইস্তেখারার ফলাফল হিসেবে ধরা ঠিক হবে না। এটি স্বাভাবিক মানসিক চাপ বা উদ্বেগের কারণে হতে পারে। ইস্তেখারার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
৪. ফাতাওয়া উসমানি ও ইমদাদুল ফাতাওয়া থেকে নির্দেশনা
ফাতাওয়া উসমানি, ২/৩৮৬
মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) লিখেছেন:
"ইস্তেখারা করার পর মনে যে অবস্থা সৃষ্টি হয়, তা সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়। বরং ইস্তেখারার পর বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়, তাতে বরকত থাকে।"
ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৮৪
মুফতি রশিদ আহমদ লুধিয়ানভি (রহ.) লিখেছেন:
"বিয়ে ভাঙার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়। যদি পাত্র-পাত্রী উভয়ে রাজি থাকে এবং শরয়ী কোনো বাধা না থাকে, তাহলে বিয়ে এগিয়ে নেওয়াই উত্তম।"
৫. চূড়ান্ত পরামর্শ
১. পাত্রের উচিত বিয়ে ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরও কিছুদিন ধৈর্য্য ধরা এবং আল্লাহর কাছে হিদায়াত চাওয়া। ২. পাত্রীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে তার উদ্বেগ দূর করার চেষ্টা করা। ৩. পাত্রীর অভিভাবকদের সাথে বসে সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করা এবং সমাধানের চেষ্টা করা। ৪. পাত্রের পিতার গাফলতি সম্পর্কে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করা, তবে পিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা বা আলাদা থাকার পরিকল্পনা সঠিক নয়। ৫. যদি সত্যিই বিয়ে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব না হয় এবং পাত্রীর অভিভাবকরাও রাজি না হন, তাহলে সৌজন্যের সাথে বিয়ে ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে পাত্রের উচিত পাত্রীর অভিভাবকদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করা, চুপচাপ না থাকা।
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন:
সূরা আল-বাকারা, ২:২১৬
وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
"তোমাদের জন্য অকল্যাণকর মনে হতে পারে এমন বিষয়েও তোমাদের কল্যাণ থাকতে পারে, আর তোমাদের জন্য কল্যাণকর মনে হতে পারে এমন বিষয়েও তোমাদের অকল্যাণ থাকতে পারে। আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।"
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।