"সংসার করবো না, ৩ মাস পর তালাক দিব" বললে কি তালাক হবে?
Marriage and Divorce · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
উত্তর
প্রশ্নকারী বোনের প্রশ্নটি হলো: স্বামী রাগের মাথায় বলেছেন, "তোদের সাথে সংসার করবো না, কথা বন্ধ রাখ, ৩ মাস পর ফাইনাল হবে, অর্থাৎ তিন মাস পরে তালাক দিবে।" তাহলে কি কোনো সমস্যা হবে?
উত্তর:
এই ধরনের বক্তব্যকে ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় কিনায়া (ইঙ্গিতমূলক তালাক) বলা হয়। কিনায়া হলো এমন শব্দ যা দ্বারা তালাকের ইঙ্গিত পাওয়া যায় কিন্তু স্পষ্টভাবে তালাক বলা হয় না।
কিনায়া শব্দের বিধান:
কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ত (ইন্তention) শর্ত। অর্থাৎ, যদি স্বামী এই কথা বলার সময় তালাক দেওয়ার নিয়ত করে থাকেন, তাহলে তালাক পতিত হবে। আর যদি নিয়ত না করে থাকেন, তাহলে তালাক পতিত হবে না।
ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
"কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। যদি স্বামী নিয়ত করে, তাহলে তালাক পতিত হবে, আর যদি নিয়ত না করে, তাহলে পতিত হবে না।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ৩৩/২৮৩)
আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর:
১. "সংসার করবো না" - এটি কিনায়া শব্দ। এর দ্বারা তালাক পতিত হবে না যতক্ষণ না স্বামী তালাকের নিয়ত করেন।
২. "৩ মাস পর ফাইনাল হবে" বা "তিন মাস পরে তালাক দিবে" - এটি একটি ভবিষ্যতের হুমকি বা সতর্কবার্তা। এই মুহূর্তে তালাক পতিত হয়নি। তবে যদি স্বামী এই কথা বলার সময় তালাকের নিয়ত করে থাকেন, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে একটি তালাক পতিত হয়ে যাবে (যদি নিয়ত করেন)।
৩. "৩ মাস পর তালাক দিব" - এটি শর্তসাপেক্ষ বা ভবিষ্যতের তালাকের ওয়াদা। ইসলামি ফিকহে, কেউ যদি বলে "অমুক সময়ে তালাক দিব" তাহলে সেই সময়ে তালাক পতিত হবে। তবে এখানে স্বামী বলেছেন "৩ মাস পর ফাইনাল হবে" - এটি একটি হুমকি বা সতর্কবার্তা হিসেবে গণ্য হবে, যতক্ষণ না তিনি স্পষ্টভাবে তালাক দেন।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহিমাহুল্লাহ) এর মত:
তিনি বলেন:
"যদি কেউ বলে, 'আমি তোমাকে তালাক দিব' বা 'তালাক হবে' - এটি কিনায়া। যদি সে তালাকের নিয়ত করে, তাহলে তালাক পতিত হবে। আর যদি নিয়ত না করে, তাহলে পতিত হবে না।" (মাজমু' ফাতাওয়া, ৩৩/২৮৩)
শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ) এর মত:
তিনি বলেন:
"কিনায়া শব্দ দ্বারা তালাক পতিত হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। যেমন: 'তুমি আমার জন্য হারাম', 'তুমি আমার সাথে থাকো না', 'যাও তুমি তোমার পরিবারের কাছে' ইত্যাদি। যদি স্বামী তালাকের নিয়ত করে, তাহলে তালাক পতিত হবে।" (আশ-শারহুল মুমতি', ১৩/৮৫)
আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান:
১. যদি স্বামী তালাকের নিয়ত না করে থাকেন (যা সাধারণত রাগের মাথায় বলা হয়ে থাকে), তাহলে কোনো তালাক পতিত হয়নি। এটি শুধু একটি হুমকি বা সতর্কবার্তা।
২. যদি স্বামী তালাকের নিয়ত করে থাকেন, তাহলে একটি তালাক পতিত হয়ে গেছে (যদি এটি প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক হয়)।
৩. "৩ মাস পর তালাক দিব" - এটি ভবিষ্যতের ওয়াদা। যদি স্বামী সত্যিই ৩ মাস পর তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তখন তালাক পতিত হবে। তবে এই মুহূর্তে নয়।
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
১. আপনার স্বামীর সাথে শান্তিপূর্ণভাবে কথা বলুন এবং জানতে চান তিনি আসলেই তালাকের নিয়ত করেছেন কিনা।
২. যদি তিনি নিয়ত না করে থাকেন, তাহলে এটি কোনো তালাক হিসেবে গণ্য হবে না।
৩. রাগের মাথায় বলা কথা তালাকের নিয়তে না হলে তালাক পতিত হয় না।
৪. যদি তালাক পতিত হয়ে থাকে (নিয়তের কারণে), তাহলে এটি প্রথম বা দ্বিতীয় তালাক হলে রজয়ী তালাক (যে তালাকে ফিরে আসা যায়) হিসেবে গণ্য হবে এবং ইদ্দতের (৩ মাস) মধ্যে ফিরে আসার সুযোগ থাকবে।
দলিল:
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"তালাক দুইবার। এরপর হয় বিধিমতো রাখা, নয়তো সদয়ভাবে বিদায় দেওয়া।" (সূরা আল-বাকারা: ২২৯)
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
"তিনটি বিষয় গুরুত্ব সহকারে করলে তা কার্যকর হয় এবং ঠাট্টা করে করলেও তা কার্যকর হয়: বিবাহ, তালাক এবং রজয়ত (স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া)।" (আবু দাউদ: ২১৯৪, তিরমিজি: ১১৮৪, ইবনে মাজাহ: ২০৩৯ - শাইখ আলবানী সহিহ বলেছেন)
তবে এই হাদিসটি স্পষ্ট তালাকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিনায়া শব্দের ক্ষেত্রে নিয়ত শর্ত।
সারসংক্ষেপ: আপনার স্বামীর উক্তিটি কিনায়া হিসেবে গণ্য হবে। যদি তিনি তালাকের নিয়ত না করে থাকেন, তাহলে কোনো তালাক পতিত হয়নি। আর যদি নিয়ত করে থাকেন, তাহলে একটি তালাক পতিত হয়েছে। "৩ মাস পর তালাক দিব" বলা মানে এখনই তালাক পতিত হওয়া নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের একটি সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত।