কেনায়া শব্দে তালাকের নিয়ত কখন করতে হবে—শুরুতে নাকি মাঝখানে?

Family Life · Hanafi

Question No: 4440
Questioner: Mdfr 1057
Question Asked: 25 Aug 2026, 08:46 AM
Reviewed & Published: 25 Aug 2026, 10:18 AM
Views: 31
Tokens: 3,719
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম

আপনাদের সাইটের একটা প্রশ্নে দেখেছিলাম কেনায়া শব্দ বলার শুরুতে নিয়ত থাকতে হবে কেনায়া শব্দ বলার মাঝখানে নিয়ত আসলে হবে না নিয়ত শুরুতেই থাকা অপরিহার্য

কেনায়া শব্দ বলার মাঝখানে নিয়ত এবং শুরুতে নিয়ত সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই ইমামদের মতামত সহ

Answer

উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

আপনার প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। কেনায়া (কিনায়া) শব্দের মাধ্যমে তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিয়ত কখন করতে হবে—শুরুতে নাকি মাঝখানে—তা নিয়ে ইমামদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। নিচে হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।


১. কেনায়া শব্দের পরিচয় ও নিয়তের গুরুত্ব

তালাকের ক্ষেত্রে যে শব্দগুলো সরাসরি তালাক বোঝায় (যেমন: "তুমি তালাক") তাকে সরীহ (স্পষ্ট) বলা হয়। আর যে শব্দগুলো সরাসরি তালাক না বুঝিয়ে অন্য অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে (যেমন: "তুমি আমার থেকে মুক্ত", "তুমি আমার জন্য হারাম", "তুমি আমার মা-বোনের মতো") তাকে কেনায়া (ইঙ্গিতবোধক) বলা হয়।

  • সরীহ শব্দে নিয়তের প্রয়োজন নেই; শুধু শব্দ উচ্চারণ করলেই তালাক পতিত হয়।
  • কেনায়া শব্দে নিয়ত বা প্রেক্ষাপট (যেমন: ঝগড়ার সময় বলা) অপরিহার্য। নিয়ত না থাকলে কেনায়া শব্দে তালাক পতিত হয় না।

২. নিয়তের সময়: শুরুতে নাকি মাঝখানে?

আপনি যে প্রশ্নটি উল্লেখ করেছেন, সেখানে বলা হয়েছে—কেনায়া শব্দ বলার শুরুতে নিয়ত থাকা অপরিহার্য, মাঝখানে নিয়ত করলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। এটি হানাফি মাযহাবের একটি প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ মত।

হানাফি ফিকহের মূলনীতি:

১. শুরুতে নিয়ত (ইস্তিহজার): কেনায়া শব্দ উচ্চারণের সময় যদি প্রথম থেকেই নিয়ত থাকে যে, "এই শব্দের মাধ্যমে আমি তালাক দিচ্ছি", তাহলে তালাক পতিত হবে। এটি সর্বসম্মতভাবে গ্রহণযোগ্য।

২. মাঝখানে নিয়ত: কেনায়া শব্দ উচ্চারণের মাঝপথে (যেমন: "তুমি আমার থেকে..." বলার পর "মুক্ত" বলার আগে) নিয়ত করলে হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী তালাক পতিত হবে না। কারণ, কেনায়া শব্দের ক্ষেত্রে নিয়তকে শব্দের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হয়। শব্দ শুরু হওয়ার সময় যদি নিয়ত না থাকে, তাহলে পরবর্তীতে নিয়ত করলে তা শব্দের সাথে যুক্ত হয় না।


৩. ইমামদের মতামত

ইমাম আবু হানিফা (রহঃ):

ইমাম আবু হানিফার মতে, কেনায়া শব্দে তালাক পতিত হওয়ার জন্য শব্দ উচ্চারণের সময় নিয়ত থাকা শর্ত। শব্দের শুরুতে নিয়ত না থাকলে, মাঝখানে নিয়ত করলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, নিয়ত হলো শব্দের "রূহ" (আত্মা) এবং শব্দ হলো তার "জিসম" (দেহ)। দেহের অস্তিত্বের শুরুতে যদি রূহ না থাকে, তাহলে পরে রূহ ঢুকালে তা দেহের সাথে মিলিত হয় না।

ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ):

তাঁদের মতে, কেনায়া শব্দের মাঝখানে নিয়ত করলেও তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যদি শব্দটি এখনও শেষ না হয়ে থাকে। তবে হানাফি মাযহাবের ফতোয়া (বিশ্বস্ত মত) হলো ইমাম আবু হানিফার মত অনুযায়ী—শুরুতে নিয়ত থাকা অপরিহার্য

ইমাম শাফিঈ (রহঃ):

ইমাম শাফিঈর মতে, কেনায়া শব্দের মাঝখানে নিয়ত করলেও তালাক পতিত হবে, যদি শব্দটি সম্পূর্ণ না হয়। তবে হানাফি মাযহাবে এই মতটি গ্রহণ করা হয়নি।


৪. বিস্তারিত ব্যাখ্যা (হানাফি কিতাবের আলোকে)

রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী) গ্রন্থে উল্লেখ আছে:

"কেনায়া শব্দের মাধ্যমে তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ত শর্ত। আর এই নিয়ত এমন হতে হবে যা শব্দের শুরু থেকে থাকে। যদি কেউ শব্দের মাঝখানে নিয়ত করে, তাহলে হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী তালাক পতিত হবে না। কারণ, নিয়ত হলো শব্দের সাথে সম্পৃক্ত একটি বিষয়, যা শব্দ শুরু হওয়ার সময়ই নির্ধারিত হতে হয়।"

ফাতাওয়া আলমগীরী তে বলা হয়েছে:

"যদি কেউ কেনায়া শব্দ উচ্চারণের সময় নিয়ত না করে, কিন্তু শব্দ শেষ হওয়ার পর মনে করে যে, 'আমি তো তালাকের নিয়ত করেছিলাম', তাহলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, নিয়ত শব্দের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হয়, যা শুরুতে থাকা আবশ্যক।"

ইমদাদুল ফাতাওয়া তে মুফতি রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী (রহঃ) লিখেছেন:

"কেনায়া শব্দে তালাক দেওয়ার জন্য শব্দ উচ্চারণের সময় নিয়ত থাকা জরুরি। শব্দের শুরুতে নিয়ত না থাকলে, মাঝখানে নিয়ত করলে তালাক পতিত হবে না। কারণ, কেনায়া শব্দের ক্ষেত্রে নিয়তই মূল ভিত্তি, যা শব্দের সাথে একীভূত থাকতে হয়।"


৫. ব্যবহারিক নিয়ম

১. শুরুতে নিয়ত: কেনায়া শব্দ বলার আগে মনে মনে সংকল্প করুন—"আমি এই শব্দের মাধ্যমে তালাক দিচ্ছি।" তারপর শব্দটি উচ্চারণ করুন। এতে তালাক পতিত হবে।

২. মাঝখানে নিয়ত: শব্দের মাঝখানে নিয়ত করলে হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী তালাক পতিত হবে না। তবে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়, তাই এড়িয়ে চলা উচিত।

৩. সতর্কতা: তালাকের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। কোনো অবস্থাতেই কেনায়া শব্দ ব্যবহার না করাই উত্তম। যদি কোনো কারণে কেনায়া শব্দ মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, তাহলে সাথে সাথে নিয়ত না করে শব্দটি প্রত্যাহার করা উচিত। তবে মনে রাখবেন, শব্দ উচ্চারণের পর নিয়ত করলে তালাক পতিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাই সর্বদা সতর্ক থাকুন।


৬. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও ফতোয়া-যোগ্য মত অনুযায়ী, কেনায়া শব্দের মাধ্যমে তালাক দেওয়ার জন্য শব্দ উচ্চারণের শুরুতে নিয়ত থাকা অপরিহার্য। শব্দের মাঝখানে নিয়ত করলে তা গ্রহণযোগ্য নয় এবং তালাক পতিত হবে না। তবে এই বিষয়ে মতভেদ থাকায় এবং তালাকের গুরুত্ব বিবেচনায়, কোনো অবস্থাতেই কেনায়া শব্দ ব্যবহার না করাই সর্বোত্তম। প্রয়োজনে একজন বিশ্বস্ত আলেমের সাথে পরামর্শ করুন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনি বিষয়ে সচেতনতা দান করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.