পরপর গর্ভধারণের ক্ষেত্রে ১২০ দিনের আগে গর্ভপাতের শরয়ি বিধান
Family Life · Hanafi
Question
আমি একজন বাংলাদেশি এবং বর্তমানে তুরস্কে PhD করছি। আমি আমার স্ত্রী ও দুইটি ছোট সন্তান নিয়ে তুরস্কে বসবাস করছি। আমাদের একটি সন্তান ৪ বছরের এবং অন্য সন্তানটি মাত্র ৬ মাসের। এখানে আমাদের কোনো আত্মীয়স্বজন বা পরিবারের অন্য কেউ নেই, যারা সন্তানদের দেখাশোনায় আমাদের সাহায্য করতে পারেন। দুইটি ছোট সন্তানকে সামলানোই বর্তমানে আমাদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
আমার স্ত্রী বর্তমানে আবার গর্ভবতী হয়েছেন। হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে গর্ভকাল প্রায় **৬ সপ্তাহ**।
আমরা এই সময়ে আরেকটি সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করিনি। বিশেষ করে আমাদের ৬ মাসের শিশুর যত্ন, পরপর গর্ভধারণ, তুরস্কে একা থাকা এবং আমার PhD-এর কারণে আমাদের ওপর শারীরিক, মানসিক ও পারিবারিক চাপ অনেক বেশি।
আমরা জানতে চাই:
1. এই পরিস্থিতিতে **১২০ দিনের আগে**, বিশেষ করে বর্তমান প্রায় ৬ সপ্তাহের গর্ভাবস্থায়, গর্ভপাত করা কি শরিয়তসম্মত?
2. দুইটি ছোট সন্তান থাকা, তাদের দেখাশোনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাওয়া, পরপর গর্ভধারণ এবং বিদেশে কোনো পারিবারিক সহযোগিতা না থাকা—এসব কি শরিয়তের দৃষ্টিতে **গ্রহণযোগ্য ওজর** হিসেবে বিবেচিত হতে পারে?
আমরা শরিয়তের বিধান মেনে চলতে চাই এবং নিজেদের ইচ্ছামতো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাই না। তাই আমাদের পরিস্থিতি বিবেচনা করে **কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা** দিলে আমরা অত্যন্ত উপকৃত হব।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
উত্তর: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল বিষয়ে শরিয়তের সিদ্ধান্ত জানতে চেয়েছেন। আমরা কুরআন, সুন্নাহ এবং হানাফি ফিকহের আলোকে আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি।
১. ১২০ দিনের আগে গর্ভপাতের শরয়ী বিধান:
আপনার প্রশ্নের প্রথম অংশের উত্তর হলো, ১২০ দিনের আগে গর্ভপাত করা সাধারণভাবে জায়েয নয়। যদিও কিছু পুরাতন ফিকহি মতামতে (যেমন: ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর একটি মত) ১২০ দিনের আগে গর্ভপাতকে কিছু শর্তে জায়েধ বলা হয়েছে, কিন্তু পরবর্তীকালে প্রায় সকল হানাফি ফকিহ (বিশেষ করে ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এবং ইমাম মুহাম্মদ রহ.) এবং আধুনিক যুগের অধিকাংশ আলেমগণ এই মতকে শক্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
কারণ: ১. গর্ভধারণের পর থেকেই ভ্রূণে জীবন সঞ্চার হয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সা.) বলেছেন, "তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি তার মায়ের পেটে ৪০ দিন নুতফা (শুক্রবিন্দু) হিসেবে, তারপর ৪০ দিন আলাকা (জমাট রক্ত) হিসেবে, তারপর ৪০ দিন মুদগা (মাংসপিণ্ড) হিসেবে থাকে। এরপর আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতা পাঠান এবং তাকে চারটি বিষয় (রিজিক, বয়স, আমল ও হতভাগ্য/সৌভাগ্য) লেখার আদেশ দেন..." (সহিহ বুখারি: ৩০৩৬, সহিহ মুসলিম: ২৬৪৫)। এই হাদিস দ্বারা বোঝা যায় যে, ১২০ দিন পর রূহ (আত্মা) ফুঁকানো হয়। কিন্তু এর আগেও ভ্রূণ একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে গণ্য। তাই ১২০ দিনের আগে গর্ভপাত করানোকে ফুকাহায়ে কেরাম "জীবন নাশের" (জীবন বিনাশের) পর্যায়ভুক্ত বলেছেন।
২. হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহের বক্তব্য:
- রদ্দুল মুহতার (আল-হাসকাফী ও ইবনে আবিদীন): ইবনে আবিদীন রহ. তার বিখ্যাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, "গর্ভধারণের পর কোনো অবস্থাতেই গর্ভপাত করা জায়েয নয়, যদি না কোনো বৈধ শরয়ী ওজর থাকে (যেমন: মায়ের জীবন রক্ষার প্রয়োজন)।" (রদ্দুল মুহতার, ৬তম খণ্ড, ৪১৬ পৃষ্ঠা)
- ফাতাওয়া আলমগীরি: এই গ্রন্থে বলা হয়েছে, "যদি কোনো মহিলা গর্ভবতী হয় এবং সে গর্ভপাতের ওষুধ সেবন করে, তবে তা মাকরূহ (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) হবে।" (ফাতাওয়া আলমগীরি, ৫ম খণ্ড, ৩৫৮ পৃষ্ঠা)
- ফাতাওয়া উসমানি: মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি দামাত বারাকাতুহুম তার ফতোয়ায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, "গর্ভধারণের পর ১২০ দিনের আগে গর্ভপাত করা জায়েয নয়। এমনকি যদি গর্ভধারণের পর মাত্র কয়েক দিনও হয়ে থাকে, তবুও তা জায়েয নয়। কারণ, গর্ভধারণের পর থেকেই ভ্রূণ একটি সম্ভাবনাময় জীবন।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২য় খণ্ড, ৩৮৫ পৃষ্ঠা)
তবে ব্যতিক্রম: যদি কোনো কারণে মায়ের জীবন রক্ষার জন্য গর্ভপাত করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় না থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে গর্ভপাত করা জায়েয হতে পারে। কিন্তু এটি শুধুমাত্র একজন অভিজ্ঞ ও ধর্মভীরু মুসলিম ডাক্তারের পরামর্শে এবং স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলে করা যাবে। আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে (যেমন: সন্তানদের দেখাশোনার চাপ, বিদেশে একা থাকা, PhD-এর চাপ) এটি মায়ের জীবনের জন্য সরাসরি হুমকি নয়, তাই এই ওজরে গর্ভপাত করা জায়েয হবে না।
২. গ্রহণযোগ্য ওজর হিসেবে বিবেচিত হওয়া:
আপনার প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশের উত্তর হলো, আপনার বর্ণিত ওজরগুলো (দুইটি ছোট সন্তান থাকা, তাদের দেখাশোনার চাপ, পরপর গর্ভধারণ, বিদেশে পারিবারিক সহযোগিতার অভাব) শরিয়তের দৃষ্টিতে গর্ভপাতের জন্য গ্রহণযোগ্য ওজর হিসেবে বিবেচিত হবে না।
কারণ: ১. শরিয়তে গর্ভপাতের অনুমতি শুধুমাত্র তখনই দেওয়া হয়েছে যখন মায়ের জীবন রক্ষার জন্য এটি অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সন্তান লালন-পালনের কষ্ট, আর্থিক সমস্যা, বা পারিবারিক চাপ—এগুলো গর্ভপাতের বৈধ কারণ নয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন, "তোমাদের সন্তানদেরকে দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা করো না। তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমিই রিজিক দিই।" (সূরা আল-ইসরা: ৩১) এই আয়াতে সন্তান হত্যার একটি কারণ হিসেবে দারিদ্র্যের ভয়কে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে, সন্তান লালন-পালনের কষ্ট বা চাপকেও গর্ভপাতের বৈধ কারণ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
২. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি:
- ইমাম আবু হানিফা রহ. এবং তার অনুসারী ফকিহগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন, "গর্ভপাত করা হারাম, যদি না মায়ের জীবন রক্ষার প্রয়োজন হয়।" (আল-মাবসুত, সারাখসী, ৯ম খণ্ড, ১৩২ পৃষ্ঠা)
- মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ. তার ফতোয়ায় উল্লেখ করেছেন, "সন্তান লালন-পালনের কষ্ট বা পারিবারিক চাপ গর্ভপাতের বৈধ ওজর নয়। কারণ, আল্লাহ তাআলা প্রতিটি সন্তানের সাথে তার রিজিকও পাঠান।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪র্থ খণ্ড, ৩৪৫ পৃষ্ঠা)
- মুফতি তাকি উসমানি তার ফতোয়ায় বলেছেন, "গর্ভপাতের অনুমতি শুধুমাত্র তখনই, যখন ডাক্তারি পরামর্শে প্রমাণিত হয় যে, গর্ভাবস্থা চলতে থাকলে মায়ের জীবন বিপন্ন হবে। অন্যথায়, যেকোনো অবস্থায় গর্ভপাত করা হারাম।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২য় খণ্ড, ৩৮৬ পৃষ্ঠা)
৩. আধুনিক যুগের ফতোয়া: আধুনিক যুগের অধিকাংশ ইসলামি স্কলার এবং ফিকহ একাডেমিগুলো (যেমন: ইসলামিক ফিকহ একাডেমি, জেদ্দা) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, গর্ভধারণের পর কোনো অবস্থাতেই গর্ভপাত করা জায়েয নয়, যদি না মায়ের জীবন রক্ষার প্রয়োজন হয়। এমনকি ১২০ দিনের আগেও গর্ভপাত করা হারাম। কারণ, গর্ভধারণের পর থেকেই ভ্রূণ একটি সম্ভাবনাময় জীবন।
আপনার জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ:
১. ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল: আল্লাহ তাআলা বলেন, "আল্লাহ কারো ওপর তার সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেন না।" (সূরা আল-বাকারা: ২৮৬) আপনি এবং আপনার স্ত্রী বর্তমানে যে চাপের মধ্যে আছেন, তা অবশ্যই কঠিন। কিন্তু এই সন্তানটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত। আল্লাহ তাআলা অবশ্যই এর রিজিকের ব্যবস্থা করবেন। আপনার উচিত ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করা।
২. পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা:
- আপনি এবং আপনার স্ত্রী মিলে সন্তানদের দেখাশোনার জন্য একটি রুটিন তৈরি করুন।
- সম্ভব হলে তুরস্কে কোনো মুসলিম কমিউনিটি বা মসজিদের সাথে যোগাযোগ করে সাহায্য চাইতে পারেন। অনেক সময় স্থানীয় মুসলিম পরিবারগুলো এমন পরিস্থিতিতে সহযোগিতা করে।
- আপনার PhD-এর কাজের সময়সূচি এমনভাবে সাজান যাতে পরিবারের জন্য সময় বের করা যায়।
৩. ডাক্তারের পরামর্শ: আপনার স্ত্রীর গর্ভাবস্থা সম্পর্কে একজন ভালো ডাক্তারের পরামর্শ নিন। যদি ডাক্তারি দৃষ্টিতে গর্ভাবস্থা চলতে থাকলে মায়ের বা সন্তানের জীবনের জন্য কোনো ঝুঁকি থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে আপনি একজন ধর্মভীরু মুসলিম ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু শুধুমাত্র পারিবারিক চাপ বা কষ্টের কারণে গর্ভপাত করা সম্পূর্ণ হারাম।
৪. ইস্তিগফার ও দোয়া: এই সময়ে বেশি বেশি ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) এবং দোয়া করুন। আল্লাহ তাআলা আপনার ও আপনার পরিবারের ওপর থেকে এই চাপ দূর করবেন, ইনশাআল্লাহ।
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
১. ১২০ দিনের আগে, বিশেষ করে ৬ সপ্তাহের গর্ভাবস্থায় গর্ভপাত করা শরিয়তসম্মত নয়। এটি হারাম। শুধুমাত্র মায়ের জীবন রক্ষার জন্য ডাক্তারি পরামর্শে এটি জায়েয হতে পারে, কিন্তু আপনার বর্ণিত পরিস্থিতিতে তা প্রযোজ্য নয়।
২. আপনার বর্ণিত ওজরগুলো (সন্তানদের দেখাশোনার চাপ, পরপর গর্ভধারণ, বিদেশে পারিবারিক সহযোগিতার অভাব) শরিয়তের দৃষ্টিতে গর্ভপাতের জন্য গ্রহণযোগ্য ওজর হিসেবে বিবেচিত হবে না। কারণ, শরিয়তে গর্ভপাতের অনুমতি শুধুমাত্র মায়ের জীবন রক্ষার প্রয়োজনে দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের ধৈর্য ও সাহায্য দান করুন এবং এই সন্তানকে আপনার জন্য রহমত ও বরকতের উৎস করুন। আমিন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।