প্রথম স্বামীর তালাকের নোটিশ প্রেরণের ৫ মাস পর স্ত্রী কি অন্যত্র বিয়ে করতে পারবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমি স্বামী এবং শশুর বাড়ির নির্যাতনের কারনে আমার এক আত্মীয়ার বাড়িতে আশ্রয় নেই। তখন দুই বছর যাবৎ তিনি আমি কোথায় আছি জানা সত্ত্বেও আমার খোঁজ খবর নেয় না এবং তালাক ও দেয় না।উনার দাবি আমাকে নিজে থেকে ফেরত যেয়ে সমাজে বলতে হবে উনি এবং উনার পরিবার নির্দোষ। অবশেষে তিনি নতুন বিয়ে করার প্রয়োজনে বাংলাদেশের আইনের ভয়ে আমাকে তালাকের নোটিশ পাঠায়। যেহেতু আমার বাবা ভাই এবং কোনো আত্মীয় থেকেও নেই তখন আমার মা আর ঝামেলা না বাড়িয়ে কাবিনের টাকা ব্যতীত ফয়সালা করে নেন এবং পাচ মাস পর আমাকে অন্যত্র বিয়ে দেন। এখন উনারা বলছে যে নোটিশ এর পর আরও দুইটা কাগজ নাকি পাঠাতে হয় এবং যেহেতু এই তিন বছরে আমাদের দেখা হয়নি তাই মুখে কোনো তালাক হয়নি আর পরবর্তী দুইটা কাগজ না দেয়ায় আমি সাইন করিনি কারণ যেটা আমাকে দেওয়া হয়েছে ঐখানে সাইন করার জায়গা ছিল না।আর উনি কাগজটা ছবির মাধ্যমে দিয়েছেন ফোনে যেহেতু আমাদের স্হায়ী ঠিকানা নেই তবে উনার বাড়ির পাশেই আমার খালার বাসা।এখন উনার আরেকটা বৌ থাকা সত্ত্বেও উনার দাবি আমার নাকি দ্বিতীয় স্বামীর সাথে বিয়েটা হয়নি এবং সমাজে সম্মানহানি করছে আমি একসাথে দুইজনকে বিয়ে করেছি। এখন আমার প্রশ্ন আমার কি দ্বিতীয় বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
উত্তর দেওয়ার আগে আপনার দীর্ঘ ও জটিল পরিস্থিতির জন্য আমরা সহানুভূতি প্রকাশ করছি। আপনার প্রশ্নটি মূলত দুটি বিষয়ের উপর ভিত্তি করে তৈরি:
১. প্রথম স্বামীর পক্ষ থেকে পাঠানো তালাকের নোটিশ (যা আপনি সাইন করেননি) দ্বারা তালাক সংঘটিত হয়েছে কি না? ২. এরপর আপনি যে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, তা ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক সহীহ (বৈধ) হয়েছে কি না?
আমরা হানাফি মাযহাবের আলোকে কুরআন, হাদিস এবং প্রামাণ্য কিতাবের ভিত্তিতে উত্তর দিচ্ছি।
প্রথম অংশ: তালাকের নোটিশ ও তালাক সংঘটিত হওয়ার বিধান
আপনি উল্লেখ করেছেন যে, আপনার স্বামী আপনাকে একটি তালাকের নোটিশ পাঠিয়েছেন, যা আপনি সাইন করেননি এবং এটি ছবির মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। তিনি দাবি করছেন, নোটিশের পর আরও দুটি কাগজ পাঠানোর প্রয়োজন ছিল, যা তিনি পাঠাননি।
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
১. তালাকের জন্য নির্দিষ্ট শব্দ বা ইঙ্গিত প্রয়োজন: ইসলামী আইনে তালাক শুধুমাত্র নির্দিষ্ট শব্দ (যেমন: "তালাক দিলাম", "আমি তোমাকে ত্যাগ করলাম") অথবা স্পষ্ট ইঙ্গিতের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। একটি নোটিশ বা কাগজপত্র নিজে নিজে তালাক নয়; এটি কেবল তালাক প্রদানের একটি প্রক্রিয়া বা ঘোষণা।
২. লিখিত তালাকের বিধান: হানাফি ফিকহে বলা হয়েছে, যদি স্বামী স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে লিখিতভাবে তালাক দেয় তাহলে তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে। তবে শর্ত হলো, লেখাটি স্পষ্টভাবে তালাকের উদ্দেশ্যে লিখিত হতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/৩৭৩)
৩. আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্যতা: আপনি বলেছেন, নোটিশটি আপনি সাইন করেননি এবং এতে সাইন করার জায়গাও ছিল না। তবে প্রশ্ন হলো, নোটিশের ভাষায় কি স্পষ্টভাবে তালাকের উল্লেখ ছিল? যদি নোটিশে স্পষ্টভাবে লেখা থাকে "আমি তোমাকে তালাক দিলাম" বা এর সমতুল্য শব্দ, তাহলে একটি তালাক (রাজ'ঈ) সংঘটিত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি নোটিশটি শুধুমাত্র আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হয় (যেমন: কোর্টে ডাকা বা নোটিশ দেওয়া) এবং তাতে তালাকের স্পষ্ট শব্দ না থাকে, তাহলে তা দ্বারা তালাক সংঘটিত হবে না।
৪. তিন তালাকের ভুল ধারণা: আপনার স্বামী বলছেন, "তিনটি কাগজ পাঠাতে হয়" — এটি সম্পূর্ণ ভুল। ইসলামী আইনে তালাকের জন্য তিনটি কাগজ বা তিনটি ধাপের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। একবার স্পষ্ট তালাক দিলেই তা কার্যকর হয়। তিন তালাকের নিয়ম হলো, তিনবার পৃথকভাবে তালাক দেওয়া (প্রত্যেকবার ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে আনা ছাড়া) অথবা একসাথে তিন তালাক দেওয়া। কাগজপত্রের সংখ্যা এর সাথে সম্পর্কিত নয়।
৫. দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্ক না থাকা: আপনি বলেছেন, তিন বছর ধরে আপনার দেখা হয়নি। শরিয়তে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিন সম্পর্ক না থাকা এবং স্বামী স্ত্রীর খোঁজ না নেওয়া নিজে নিজে তালাক সাব্যস্ত করে না। তালাক শুধুমাত্র স্বামীর স্পষ্ট ঘোষণার মাধ্যমে হয়। তবে এটি একটি গুরুতর সামাজিক ও নৈতিক অপরাধ, এবং স্ত্রী এ অবস্থায় খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাকের বিনিময়ে অর্থ প্রদান) বা আদালতের মাধ্যমে তালাক চাইতে পারেন।
সারসংক্ষেপ: আপনার ক্ষেত্রে, যদি নোটিশে স্পষ্ট তালাকের শব্দ না থাকে, তাহলে প্রথম স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক সংঘটিত হয়নি। যদি স্পষ্ট শব্দ থাকে, তাহলে একটি তালাক সংঘটিত হয়েছে। তবে আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, নোটিশটি আইনি প্রক্রিয়ার অংশ ছিল এবং আপনি সাইন করেননি — তাই এটি দ্বারা তালাক সংঘটিত হওয়া নিশ্চিত নয়।
দ্বিতীয় অংশ: দ্বিতীয় বিয়ের বৈধতা
আপনি বলেছেন, প্রথম স্বামীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর (মা ও আত্মীয়দের মাধ্যমে ফয়সালা করে) পাঁচ মাস পর আপনি অন্যত্র বিয়ে করেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, এই দ্বিতীয় বিয়ে কি শরিয়তসম্মত?
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
১. ** স্ত্রী থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে:** আপনার প্রথম বিয়ে কি এখনও বিদ্যমান? যদি প্রথম তালাক সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে আপনার প্রথম বিয়ে বিদ্যমান নয়। তাই দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ হয়েছে।
২. ইদ্দতের বিধান: তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে ইদ্দত (নির্দিষ্ট সময়) পালন করতে হয়। তালাকের পর ইদ্দত হলো তিন মাসিক (তিন হায়েজ) বা তিন মাস। আপনি বলেছেন, ফয়সালার পাঁচ মাস পর বিয়ে করেছেন। যদি তালাক সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ। কিন্তু যদি তালাক সংঘটিত না হয়, তাহলে দ্বিতীয় বিয়ে সহীহ হবে না।
৩. আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্যতা: আপনি উল্লেখ করেছেন, "মা আর ঝামেলা না বাড়িয়ে কাবিনের টাকা ব্যতীত ফয়সালা করে নেন" — এটি ইঙ্গিত করে যে, তারা একটি আপস-নিষ্পত্তি করেছেন, যা সম্ভবত খুলা (স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাকের বিনিময়ে অর্থ প্রদান) হিসেবে গণ্য হতে পারে। যদি এটি খুলা হয়ে থাকে, তাহলে তালাক সংঘটিত হয়েছে এবং ইদ্দত পালন করা আবশ্যক ছিল যা হয়তো হয়েছে। আপনি পাঁচ মাস পর বিয়ে করেছেন — যদি এই সময়ের মধ্যে আপনার তিনটি হায়েজ হয়ে থাকে, তাহলে ইদ্দত সম্পন্ন হয়েছে এবং দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ।
তবে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: যদি প্রথম তালাক আদৌ সংঘটিত না হয়ে থাকে (যেমন: নোটিশে স্পষ্ট তালাকের শব্দ না থাকা), তাহলে আপনি তখনও প্রথম স্বামীর স্ত্রী ছিলেন। এই অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করা সম্পূর্ণ অবৈধ । এই অবস্থায় আপনাকে অবশ্যই প্রথম স্বামী থেকে তালাক নিতে হবে।
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর:
"আমার কি দ্বিতীয় বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে?"
-
যদি প্রথম তালাক সংঘটিত হয়ে থাকে (অর্থাৎ, নোটিশে স্পষ্ট তালাকের শব্দ ছিল এবং আপনি তা জেনেছেন, অথবা খুলার মাধ্যমে তালাক হয়েছে) এবং ইদ্দত পালন হয়ে থাকে, তাহলে আপনার দ্বিতীয় বিয়ে সহীহ এবং বৈধ। এক্ষেত্রে প্রথম স্বামীর দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
-
যদি প্রথম তালাক সংঘটিত না হয়ে থাকে (অর্থাৎ, নোটিশটি শুধুমাত্র আইনি প্রক্রিয়া ছিল এবং তাতে তালাকের স্পষ্ট শব্দ ছিল না, অথবা খুলা সঠিকভাবে সম্পন্ন না হয়ে থাকে), তাহলে আপনার দ্বিতীয় বিয়ে বৈধ হয়নি। এই অবস্থায় প্রথম স্বামীর থেকে তালাক নিতে হবে।
ব্যবহারিক সমাধান ও পরামর্শ:
১. প্রথমে নিশ্চিত হোন: আপনার কাছে থাকা তালাকের নোটিশটি কোনো আলেম বা মুফতিকে দেখান। তারা নোটিশের ভাষা দেখে বলতে পারবেন, এতে তালাক সংঘটিত হয়েছে কি না?
২. স্থানীয় মুফতি বা ইসলামিক স্কলারের পরামর্শ নিন: যেহেতু বিষয়টি অত্যন্ত জটিল এবং আপনার জীবনের সাথে জড়িত, তাই সরাসরি কোনো বিশ্বস্ত মুফতির কাছে গিয়ে বিস্তারিত বলুন। তারা আপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবেন।
৩. আইনি সহায়তা: বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, তালাকের নোটিশের পর ৯০ দিনের মধ্যে দ্বিতীয় নোটিশ (তালাক নামা) দিতে হয় এবং তা স্ত্রীর কাছে পৌঁছাতে হয়। আপনার স্বামী এটি না করে থাকলে, আইনত তালাক কার্যকর হয়নি। তবে শরিয়তের বিধান আলাদা — শরিয়তে তালাকের জন্য আইনি প্রক্রিয়া আবশ্যক নয়, বরং স্বামীর কথা বা ঘোষণাই যথেষ্ট।
৪. সামাজিক সম্মানহানি: আপনার প্রথম স্বামী যদি সমাজে মিথ্যা প্রচার করে যে, আপনি একসাথে দুইজনকে বিয়ে করেছেন, তাহলে এটি একটি গুরুতর অপবাদ। আপনি চাইলে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। তবে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, আপনি যদি নিষ্পাপ হন, তাহলে আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং ধৈর্য ধারণ করুন।
দলিল ও রেফারেন্স:
১. কুরআন: সূরা বাকারা (২:২২৮-২৩২) — তালাক ও ইদ্দতের বিধান। ২. হাদিস: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫২৫৮ — তালাকের শর্ত ও পদ্ধতি। ৩. রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): ৩/২৪৩ — লিখিত তালাকের বিধান। ৪. ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/৩৭৩ — তালাকের শর্তাবলী। ৫. ফাতাওয়া উসমানি: ২/৩৪৫ — তালাকের নোটিশ ও আইনি প্রক্রিয়া। ৬. বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী): তালাক অধ্যায়।
আল্লাহ তায়ালা আপনার সমস্যার সমাধান করুন এবং আপনাকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফিক দিন। আমিন।