আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়ার দোয়া ও বদদোয়া দেওয়ার ইসলামী বিধান।
Faith and Belief · Hanafi
Question
Answer
আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়া দোয়া ও বদদোয়া প্রসঙ্গে
প্রশ্নের উত্তর
আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়ার দোয়া (যেমন: "হে আল্লাহ! আপনি আমার এবং অমুকের মধ্যে বিচার করুন") কাউকে বদদোয়া হিসেবে দেওয়া যাবে কি না—এ বিষয়ে ইসলামী বিধান হলো:
নিজের ওপর অত্যাচার করা হলে আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়ার দোয়া করা জায়েয আছে। তবে সরাসরি বদদোয়া (অভিশাপ) দেওয়া থেকে বিরত থাকা উত্তম।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে
১. কুরআনের নির্দেশনা:
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ "তোমরা তাদেরকে গালি দিও না, যারা আল্লাহকে ছাড়া অন্যকে ডাকে, তাহলে তারা অজ্ঞতাবশতঃ শত্রুতাবশতঃ আল্লাহকে গালি দেবে।" (সূরা আল-আনআম: ১০৮)
২. হাদীসের নির্দেশনা:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لَا تَدْعُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ وَلَا عَلَى أَوْلَادِكُمْ وَلَا عَلَى أَمْوَالِكُمْ "তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে, নিজেদের সন্তানদের বিরুদ্ধে এবং নিজেদের সম্পদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করো না।" (সহীহ মুসলিম: ৩০০৯)
হানাফী ফিকহের আলোকে
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মত:
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, কারো প্রতি বদদোয়া করা মাকরূহ (অপছন্দনীয়)। তবে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বিচার প্রার্থনা করা জায়েয।
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত:
তাঁদের মতে, অত্যাচারিত ব্যক্তি অত্যাচারীর বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করতে পারে, তবে সরাসরি অভিশাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।
রদ্দুল মুহতার (শামী)-এর বক্তব্য:
"অত্যাচারীর বিরুদ্ধে বদদোয়া করা জায়েয, কিন্তু ধৈর্য ধারণ করা উত্তম। কারণ, বদদোয়ার কারণে নিজেরও ক্ষতি হতে পারে।" (রদ্দুল মুহতার, ৬:৪১৭)
ফতোয়ায়ে উসমানী ও ইমদাদুল ফতোয়ার আলোকে
ফতোয়ায়ে উসমানী:
"অত্যাচারীর বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়া জায়েয। তবে উত্তম হলো ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করা। কারণ, আল্লাহ বলেন: 'যারা ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাদের সাথে আছেন।'" (ফতোয়ায়ে উসমানী, ১:২৮০)
ইমদাদুল ফতোয়া:
"কাউকে বদদোয়া দেওয়া উচিত নয়। তবে যদি কেউ অত্যাচার করে, তাহলে আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সরাসরি অভিশাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।" (ইমদাদুল ফতোয়া, ২:১৫০)
বাহিশতী জেওয়ারের আলোকে
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) তাঁর বাহিশতী জেওয়ার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:
"অত্যাচারীর বিরুদ্ধে বদদোয়া করা জায়েয আছে, কিন্তু তা না করা উত্তম। কারণ, বদদোয়ার ফলে নিজেরও ক্ষতি হতে পারে। বরং আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়া এবং ধৈর্য ধারণ করা উত্তম।" (বাহিশতী জেওয়ার, ২:৩০)
গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা
১. জায়েয অবস্থা:
- কারো দ্বারা অত্যাচারিত হলে আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়া জায়েয
- অত্যাচারীর বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করা জায়েয
- নিজের হক আদায়ের জন্য দোয়া করা জায়েয
২. অনুত্তম অবস্থা:
- সরাসরি অভিশাপ দেওয়া মাকরূহ
- অমুসলিমদের বিরুদ্ধে বদদোয়া দেওয়া অনুত্তম
- ক্ষমা করার চেয়ে বদদোয়া দেওয়া অনুত্তম
৩. নিষিদ্ধ অবস্থা:
- নিরপরাধ ব্যক্তিকে বদদোয়া দেওয়া হারাম
- মুসলিম ভাইকে গালি দেওয়া হারাম
- নিজের সন্তান বা পরিবারের সদস্যদের বদদোয়া দেওয়া নিষিদ্ধ
উত্তম পদ্ধতি
অত্যাচারিত হলে উত্তম পদ্ধতি হলো:
১. ধৈর্য ধারণ করা - আল্লাহ বলেন: "যারা ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাদের সাথে আছেন" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৫৩)
২. ক্ষমা করে দেওয়া - আল্লাহ বলেন: "তারা ক্ষমা করে দেয় এবং উদারতা দেখায়" (সূরা আন-নূর: ২২)
৩. আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়া - "হে আল্লাহ! আপনি আমার এবং অমুকের মধ্যে ন্যায়বিচার করুন"
৪. দোয়া করা - "হে আল্লাহ! আপনি অত্যাচারীর হাত থেকে আমাকে রক্ষা করুন"
উপসংহার
আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়ার দোয়া কাউকে বদদোয়া হিসেবে দেওয়া জায়েয আছে, যখন কেউ অত্যাচারিত হয়। তবে উত্তম হলো ধৈর্য ধারণ করা, ক্ষমা করে দেওয়া এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করা। সরাসরি অভিশাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِيَّاكُمْ وَالدُّعَاءَ عَلَى النَّفْسِ "তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করা থেকে বিরত থাকো।" (সুনানে আবু দাউদ: ১৫৩২)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।