বিয়ে বিচ্ছিন্নকরণ ও ইদ্দত সংক্রান্ত শরিয়াহ সমাধান।
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
শায়খ, আমি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়ে আপনার পরামর্শ চাই। অনুগ্রহ করে শরিয়াহ অনুযায়ী সঠিক দিকনির্দেশনা দিন।
আমার বাবা বহু বছর(১৮ বছর) আগে আমার মা এবং আমাকে ফেলে চলে গেছেন। এরপর থেকে তিনি আর কখনও যোগাযোগ করেননি, কোনো খোঁজ নেননি, এবং ভরণপোষণও দেননি। পরে তিনি অন্যত্র বিয়ে করেছেন বলে আমরা শুনেছি।
আমার মা ও বাবার বিয়ের কোনো লিখিত কাগজপত্র বা নিকাহনামা নেই। বিয়ের সাক্ষী ছিলেন আমার নানু ও পরিবারের কয়েকজন সদস্য। কিন্তু এখন প্রায় ২০–২২ বছর পার হয়ে গেছে — সেই কাজী সাহেব কোথায় আছেন তা জানা অসম্ভব, আর অনেক সাক্ষীর সঙ্গেও যোগাযোগ নেই।
এছাড়াও, আমার বাবার কোনো ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড), জন্মসনদ বা অন্য কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে নেই। তিনি কোথায় আছেন, জীবিত না মৃত কিছুই আমরা জানি না।তিনি যখন চলে যান শুধু এত টুকুই বলেন আমি ওর সাথে থাকবোনা,সংসার করবো না তবে ওরে ছেড়ে দিলাম তালাক দিলাম এসব কিছু বলেনি,আর তার সাথে আমার আম্মুর একবার কথা হয়েছিল যাওয়ার ৩-৪ বছর পর তখন তাকে দেখা গিয়েছে সে কখনোই ফিরে আসার নিয়ত করেন নাই+সে সুখেই আছেন।আমরা অনেক চেষ্টা করেছি খোঁজ নিয়েছি তবে সবাই বলছে জানি না তার সাথে দেখা হয়না বর্তমানে।
এখন আমার মায়ের বয়স আনুমানিক ৩৮–৪০ বছর। তিনি একা জীবনযাপন করছেন, কোনো সহায়তা নেই। আমি চাই তাঁকে হালাল ও সম্মানজনকভাবে নতুন করে বিয়ে দিতে।
বিগত কয়েক বছর ধরে আমি এবং আমার মা এই বিষয়ে অনেক আলেমের কাছে পরামর্শ নিয়েছি। কিন্তু প্রত্যেকেই বলেছেন, বিয়ে বৈধভাবে বিচ্ছিন্ন করতে হলে সেই সময়ের কাজী সাহেবকে খুঁজে বের করতে হবে। অথচ বাস্তবে তাঁকে খুঁজে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এই অবস্থায় আমার প্রশ্ন হলো —
1. ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী এই বিয়ে কীভাবে বিচ্ছিন্ন (ফাসখ বা তালাক) বলে গণ্য হবে, যখন তাঁর স্বামীর জীবিত বা মৃত হওয়া অজানা?
2. যদি ফাসখ করতে হয়, তাহলে কার মাধ্যমে বা কী প্রক্রিয়ায় তা করা যাবে?
3. এই পরিস্থিতিতে আমার মায়ের ইদ্দত কতদিন হবে?(যেহুতু তিনি চাকরিজীবী এবং অসুস্থ চাকরি ছেড়ে ইদ্দতের মাঝে থাকলে টানা ৩ মাস তাহলে তার চিকিৎসা চালানো ভরণপোষণ চালানোর মানুষ নেই)
দয়া করে এই জটিল অবস্থার একটি শরিয়াহসম্মত সমাধান দিন, যাতে আমার মা হালাল পথে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে পারেন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান।
Answer
বিয়ে বিচ্ছিন্নকরণ ও ইদ্দত সংক্রান্ত শরিয়াহ সমাধান
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। আপনার মায়ের অবস্থা অত্যন্ত কঠিন। আসুন আমরা শরিয়াহ অনুযায়ী এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করি।
১. স্বামীর জীবিত/মৃত হওয়া অজানা থাকলে বিয়ের বিচ্ছিন্নতা
যখন কোনো স্ত্রীর স্বামী নিখোঁজ হয়ে যায় এবং তার জীবিত বা মৃত হওয়া সম্পর্কে কোনো খবর না থাকে, তখন ইসলামী শরিয়াহতে এই অবস্থাকে "মাফকুদুল খবর" (নিখোঁজ স্বামী) বলা হয়।
হানাফি মাযহাবের নিয়ম:
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, যদি স্বামী দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকে এবং তার জীবিত বা মৃত হওয়া সম্পর্কে কোনো তথ্য না পাওয়া যায়, তাহলে নিম্নোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়:
১. অপেক্ষার সময়কাল: হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর সাধারণত ৯০ বছর (অথবা ৬০ বছর) অপেক্ষা করতে হবে। তবে ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, যদি স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর এত দীর্ঘ সময় পার হয়ে যায় যে তার বয়স সাধারণত ৯০ বছর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তাকে মৃত ধরা যাবে।
২. কাযীর রায়: তবে পরবর্তী যুগের ফুকাহায়ে কেরাম (বিশেষত ইমাম ইবনে আবিদীন শামী রহ.) এই মত দিয়েছেন যে, বর্তমান যুগে যখন স্বামীর জীবিত বা মৃত হওয়া সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না এবং স্ত্রী অত্যন্ত কষ্টে রয়েছেন, তখন কাযী (বিচারক) এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কাযী তদন্ত করে যদি নিশ্চিত হন যে স্বামীর সন্ধান পাওয়া অসম্ভব, তাহলে তিনি স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অনুমতি দিতে পারেন।
আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম:
যেহেতু আপনার বাবা ১৮ বছর ধরে নিখোঁজ এবং তার জীবিত বা মৃত হওয়া সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই, তাই শরিয়াহ অনুযায়ী:
-
প্রথমে আপনাকে আদালত,বিচারকের এর কাছে যেতে হবে।
-
বিচারক তদন্ত করে দেখবেন যে স্বামীর সন্ধান পাওয়া সত্যিই অসম্ভব কিনা। যদি তিনি নিশ্চিত হন, তাহলে তিনি ফাসখ (বিচ্ছেদ) করার রায় দিতে পারেন।
রদ্দুল মুহতার (৫ম খণ্ড, বিবাহ বিচ্ছেদ অধ্যায়) এ উল্লেখ আছে:
"إذا غاب الزوج غيبة منقطعة لا يدرى أين هو ولا خبره، ترفع المرأة أمرها إلى القاضي، فيبحث القاضي عن خبره، فإن لم يظهر له خبر، يفخخ بينهما بعد مضي المدة التي ذكرناها"
অর্থাৎ, "যখন স্বামী এমনভাবে নিখোঁজ হয় যে তার অবস্থান বা খবর কিছুই জানা যায় না, তখন স্ত্রী তার বিষয়টি কাযীর কাছে পেশ করবে। কাযী তার সন্ধান করবেন। যদি কোনো খবর না পাওয়া যায়, তাহলে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর কাযী তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাবেন।"
২. ফাসখ করার প্রক্রিয়া
ফাসখ করার জন্য নিম্নোক্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে:
১. কাযীর কাছে আবেদন: আপনার মাকে স্থানীয় ইসলামী বিচারকের (কাযী/মুফতি) কাছে একটি লিখিত আবেদন করতে হবে, যেখানে উল্লেখ থাকবে যে তার স্বামী ১৮ বছর ধরে নিখোঁজ এবং তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
২. প্রমাণ উপস্থাপন: আপনার মাকে তার বিয়ের সাক্ষীদের (যারা এখনও জীবিত) সাক্ষ্য প্রদান করতে হবে। এছাড়াও, স্বামীর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে এলাকার লোকজনের সাক্ষ্যও গ্রহণ করা হবে।
৩. তদন্ত: কাযী এলাকায় তদন্ত করবেন যে স্বামীর সন্ধান পাওয়া যায় কিনা। যদি সত্যিই তার কোনো সন্ধান না পাওয়া যায় এবং তার জীবিত থাকার কোনো সম্ভাবনা না থাকে (বয়স ৯০ বছরের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা), তাহলে কাযী ফাসখের রায় দেবেন।
৪. ফাসখের রায়: কাযী যখন ফাসখের রায় দেবেন, তখন আপনার মা আর ঐ ব্যক্তির স্ত্রী থাকবেন না। এটি একটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে (বায়িন তালাক)।
গুরুত্বপূর্ণ নোট: আপনি উল্লেখ করেছেন যে আপনার বাবা চলে যাওয়ার সময় "তালাক দিলাম" বলেননি। তাই সেটি তালাক হিসেবে গণ্য হবে না। তবে যেহেতু তিনি ১৮ বছর ধরে নিখোঁজ এবং ফিরে আসার নিয়ত করেননি, তাই কাযীর মাধ্যমে ফাসখ করানোই সঠিক পথ।
৩. ইদ্দতের সময়কাল
ফাসখের পর আপনার মায়ের জন্য ইদ্দত পালন করা আবশ্যক। ইদ্দতের নিয়ম:
তালাকপ্রাপ্তা মহিলার ইদ্দত:
- যদি মহিলার মাসিক হয়, তাহলে ৩টি পবিত্রতা (তুহর) বা ৩ মাসিক চক্র পর্যন্ত ইদ্দত পালন করতে হবে।
- যদি মহিলার মাসিক না হয় (বয়সের কারণে বা অন্য কারণে), তাহলে ৩ মাস ইদ্দত পালন করতে হবে।
আপনার মায়ের ক্ষেত্রে:
- আপনার মায়ের বয়স ৩৮-৪০ বছর, তাই তার মাসিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে তার ইদ্দত হবে ৩টি মাসিক চক্র পর্যন্ত।
- যদি মাসিক না হয়, তাহলে ৩ মাস ইদ্দত পালন করতে হবে।
ইদ্দতের সময় চাকরি ও চিকিৎসা:
- ইদ্দতের সময় মহিলাকে ঘরে থাকতে হবে এবং বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। তবে প্রয়োজনীয় কাজে (যেমন: চিকিৎসা, ওষুধ কেনা, জরুরি প্রয়োজন) বের হওয়া যাবে।
- যদি আপনার মা চাকরি করেন এবং চাকরি না করলে তার চিকিৎসা ও ভরণপোষণ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী চাকরি করতে পারবেন। তবে চেষ্টা করবেন ইদ্দতের সময় যথাসম্ভব ঘরে থাকতে।
ফাতাওয়া উসমানি (২য় খণ্ড) তে উল্লেখ আছে:
"ইদ্দতের উদ্দেশ্য হলো গর্ভাশয় পবিত্র কিনা তা নিশ্চিত করা এবং স্বামীর মৃত্যু বা বিচ্ছেদের শোক প্রকাশ করা। প্রয়োজনের তাগিদে বাইরে যাওয়া বা কাজ করা ইদ্দতের পরিপন্থী নয়, তবে শোক প্রকাশের নিয়ম মেনে চলতে হবে।"
সংক্ষিপ্ত সমাধান:
১. আপনার মাকে বিচারকের এর কাছে নিয়ে যান। ২. কাযী তদন্ত করে ফাসখের রায় দেবেন। ৩. ফাসখের পর আপনার মা ৩টি মাসিক চক্র (বা ৩ মাস) ইদ্দত পালন করবেন। ৪. ইদ্দত শেষ হলে তিনি নতুন বিয়ে করতে পারবেন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আপনি যে সকল আলেমের কাছে গেছেন তারা বলেছেন কাজী সাহেবকে খুঁজে বের করতে হবে। এটি সঠিক নয়।
আল্লাহ তায়ালা আপনার মায়ের জন্য সহজ পথ তৈরি করে দিন এবং তাকে হালাল ও সম্মানজনক জীবন দান করুন। আমিন।
জাযাকাল্লাহু খাইরান