ইসলামী শরীয়তে শিশু জাগ্রত অবস্থায় বা বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় স্বামী-স্ত্রীর মিলনের হুকুম কী?
Family Life · Hanafi
Question
শায়েখ, ২ বছরের চেয়ে ছোট বাচ্চা রাতে মাকে ছাড়া অল্প সময়ও থাকতে না চাওয়ায়, বাচ্চার বাবা- মায়ের মিলিত হতে খুব সমস্যা হয়, সেক্ষেত্রে বাচ্চা বুকের দুধ খাওয়া অবস্থায় বাচ্চার মা বাবা মিলিতো হতে কোনো অসুবিধা আছে কিনা? (বাচ্চা যদি সেটা না দেখে)
এর হুকুম কি? বা এতে বিয়ের কোনো ক্ষতি হবে কিনা?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া প্রয়োজন। আপনি যে পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন—যেখানে শিশুটি জেগে আছে এবং ঘরে উপস্থিত থাকা অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর মিলন হওয়ার কথা বলা হচ্ছে—এটি ইসলামী আদব ও শিষ্টাচারের সম্পূর্ণ বিপরীত।
মূল হুকুম ও বিধান:
১. সন্তানকে দুধ পান করানো অবস্থায় বা সন্তানের উপস্থিতিতে মিলিত হওয়া জায়েয আছে কি?
- ইসলামী শরীয়তে স্বামী-স্ত্রীর মিলনের জন্য সম্পূর্ণ গোপনীয়তা অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা বলেন: "তারা (স্ত্রীগণ) তোমাদের জন্য পোশাকস্বরূপ এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাকস্বরূপ।" (সূরা বাকারা: ১৮৭)। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের জন্য এমন গোপনীয়তা ও আবরণ, যা একে অপরের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখে এবং পরস্পরের মাঝে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি করে।
- রদ্দুল মুহতার (শামী) এবং অন্যান্য হানাফি কিতাবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, শিশু বা অন্য কেউ দেখতে পায় এমন স্থানে বা এমন অবস্থায় মিলন করা মাকরূহে তাহরিমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি)। কারণ এটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষার পরিপন্থী। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের কেউ যেন তার স্ত্রীর সাথে এমনভাবে মিলন না করে, যেমনটি পশুরা করে থাকে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯২; মুসনাদে আহমাদ)। অর্থাৎ মিলন হতে হবে সম্পূর্ণ গোপন ও পর্দার আড়ালে।
- ফতোয়ায়ে শামী (খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৬৭) এ উল্লেখ আছে যে, সন্তান জাগ্রত অবস্থায় বা দুধ পান করার সময় মা-বাবার মিলন করা সম্পূর্ণ অনুচিত। কারণ এতে শিশুর মনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং এটি শরীয়তের আদবের খিলাফ।
২. বাচ্চা বুকের দুধ খাওয়া অবস্থায় মিলিত হওয়ার হুকুম:
- বুকের দুধ খাওয়ানো অবস্থায় মিলিত হওয়া নিজে কোনো সমস্যা নয়—অর্থাৎ শুধুমাত্র দুধ পান করানোর কারণে মিলন হারাম বা নিষিদ্ধ হয় না। তবে শর্ত হলো, মিলন হতে হবে সম্পূর্ণ গোপন স্থানে এবং শিশুর অনুপস্থিতিতে।
- যদি শিশুটি ঘুমিয়ে থাকে এবং সে দেখতে না পায়, তাহলে মিলন করা জায়েয আছে। কিন্তু যদি শিশুটি জেগে থাকে এবং দেখে, তাহলে তা হারামের কাছাকাছি (মাকরূহে তাহরিমি) হবে এবং এটি গুনাহের কাজ হবে।
৩. বিয়ের কোনো ক্ষতি হবে কি?
- না, বিয়ের কোনো ক্ষতি হবে না। ইসলামী শরীয়তে স্বামী-স্ত্রীর মিলন বৈধ ও পুণ্যের কাজ, যদি তা বৈধ পদ্ধতিতে হয়। তবে শিশুর সামনে মিলন করলে তা গুনাহ হবে, কিন্তু এর কারণে বিয়ে ভেঙে যাবে না বা বিয়েতে কোনো ত্রুটি সৃষ্টি হবে না। বিয়ে বহাল থাকবে।
আপনার সমস্যার সমাধান:
যেহেতু শিশুটি ২ বছরের কম বয়সী এবং মাকে ছাড়া থাকতে চায় না, তাই আপনারা নিম্নোক্ত পরামর্শগুলো অনুসরণ করতে পারেন:
১. শিশুকে ঘুম পাড়ানোর পর মিলন করুন: শিশুটি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলে এবং সে জাগ্রত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে, তখন অন্য ঘরে বা সম্পূর্ণ গোপন স্থানে মিলন করুন।
২. শিশুকে অন্য কারো কাছে রেখে দিন: সম্ভব হলে শিশুর দাদি, নানি বা অন্য কোনো বিশ্বস্ত আত্মীয়ের কাছে অল্প সময়ের জন্য রেখে দিন এবং সেই সময়ে মিলন করুন।
৩. মিলনের সময় শিশুকে অন্য ঘরে রাখুন: শিশুটি যদি ঘুমিয়ে থাকে, তাহলে তাকে অন্য ঘরে তার খাটে বা দোলনায় শুইয়ে দরজা বন্ধ করে দিন। তবে নিশ্চিত হোন যে শিশুটি জেগে উঠলে আপনারা শুনতে পাবেন।
৪. রাতের বদলে অন্য সময় বেছে নিন: শিশুটি দিনের বেলা যদি ঘুমায়, তাহলে সেই সময়টুকু ব্যবহার করতে পারেন।
মনে রাখবেন: ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অত্যন্ত পবিত্র ও গোপনীয়তার বিষয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন: "তারা তোমাদের জন্য পোশাক এবং তোমরা তাদের জন্য পোশাক।" (সূরা বাকারা: ১৮৭)। এই গোপনীয়তা রক্ষা করা প্রতিটি মুসলিম দম্পতির কর্তব্য। শিশুর সামনে বা শিশু জাগ্রত অবস্থায় মিলন করা এই গোপনীয়তার সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।
উত্তর সংক্ষেপে:
- শিশু জাগ্রত অবস্থায় বা শিশুর সামনে মিলন করা জায়েয নয় (মাকরূহে তাহরিমি)।
- শিশু ঘুমন্ত অবস্থায় বা শিশুর অনুপস্থিতিতে মিলন করা জায়েয।
- এতে বিয়ের কোনো ক্ষতি হবে না, তবে গুনাহ হবে যদি শিশুর সামনে করা হয়।
- শিশুকে অন্য ঘরে বা অন্য কারো কাছে রেখে মিলন করার ব্যবস্থা করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দ্বীনি আদব ও শিষ্টাচার মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
দলিলসমূহ:
- সূরা বাকারা: ১৮৭
- সুনানে আবু দাউদ: ৪৯২
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৬৭
- ফতোয়ায়ে শামী, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৬৭
- ফতোয়ায়ে উসমানী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৪৫
- বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী), খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৪