ইসলামের আলোকে বিবাহিত কন্যার উপর মায়ের হক ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন।
Family Life · Hanafi
Question
Answer
মায়ের উপরে বিবাহিত কন্যার হক বা দায়িত্ব
ভূমিকা
ইসলামে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআন ও হাদীসে পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব সম্পর্কে বহু নির্দেশনা এসেছে। বিবাহিত কন্যার ক্ষেত্রে তার স্বামীর প্রতি দায়িত্ব এবং মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব—দুটোই পালন করতে হয়। প্রশ্ন হলো, বিবাহিত কন্যার উপর মায়ের হক বা দায়িত্ব কতটুকু?
কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا "তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩)
আরও বলেন:
وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا "আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি।" (সূরা আনকাবূত: ৮)
হাদীসের নির্দেশনা
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِ، وَسَخَطُ الرَّبِّ فِي سَخَطِ الْوَالِدِ "আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতা-মাতার অসন্তুষ্টির মধ্যে।" (তিরমিযী: ১৮৯৯)
বিবাহিত কন্যার উপর মায়ের হক
১. সদ্ব্যবহার ও সম্মান করা
বিবাহিত কন্যার উপর মায়ের সর্বপ্রথম হক হলো—মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করা, সম্মান করা এবং কখনো অসম্মানজনক আচরণ না করা। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ বিবাহিত অবস্থায়ও বহাল থাকে।
২. সেবা-শুশ্রূষা করা
মা অসুস্থ হলে বা বৃদ্ধ বয়সে সেবা-শুশ্রূষা করা কন্যার দায়িত্ব। তবে এ ক্ষেত্রে স্বামীর অনুমতি নেওয়া উত্তম। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, পিতা-মাতার সেবার জন্য কন্যা স্বামীর অনুমতি ছাড়া বের হতে পারবে যদি পিতা-মাতা এমন অবস্থায় থাকে যে, তাদের সেবা করার মতো কেউ নেই।
৩. আর্থিক সহায়তা
মা অভাবগ্রস্ত হলে এবং কন্যা সচ্ছল হলে, কন্যার উপর মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব রয়েছে। ফাতাওয়া আলমগীরীতে উল্লেখ আছে যে, সন্তান সচ্ছল হলে পিতা-মাতার ভরণপোষণ সন্তানের উপর ওয়াজিব। তবে কন্যার নিজস্ব সম্পদ থেকে এটি দিতে হবে, স্বামীর সম্পদ থেকে নয়।
৪. নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া
বিবাহিত কন্যার জন্য মায়ের খোঁজখবর নেওয়া এবং সময়ে সময়ে দেখা করা মুস্তাহাব ও উত্তম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ "যে ব্যক্তি তার রিজিক প্রশস্ত করতে এবং আয়ু বৃদ্ধি করতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।" (বুখারী: ২০৬৭)
৫. দোয়া করা
মায়ের জন্য দোয়া করা এবং মায়ের মৃত্যুর পর ইস্তিগফার করা কন্যার দায়িত্ব। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا "হে আমার রব, তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৪)
স্বামীর সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য
বিবাহিত কন্যার উপর স্বামীর হকও রয়েছে। ইসলামে স্বামীর হক ও মা-বাবার হকের মধ্যে সমন্বয় করতে বলা হয়েছে। ইমাম কাসানী (রহ.) বাদায়েউস সানায়ি-তে উল্লেখ করেছেন যে, স্ত্রীর উপর স্বামীর হক অগ্রাধিকার পায় মৌলিক প্রয়োজনের ক্ষেত্রে, কিন্তু পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার ও সম্পর্ক রক্ষা করা সর্বাবস্থায় আবশ্যক।
মা অসন্তুষ্ট হলে করণীয়
যদি মা কোনো বৈধ বিষয়ে অসন্তুষ্ট হন, তবে কন্যার উচিত মাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করা। কিন্তু যদি মা কোনো অবৈধ বা শরীয়ত-বিরোধী কাজের আদেশ দেন, তবে সেক্ষেত্রে মায়ের কথা মানা যাবে না, তবে মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার অব্যাহত রাখতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ الْخَالِقِ "সৃষ্টিকর্তার নাফরমানীর ক্ষেত্রে সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (মুসনাদ আহমাদ: ১০৯৮)
বিবাহিত কন্যার জন্য বিশেষ নির্দেশনা
১. স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে মায়ের সেবায় যাওয়া উত্তম, তবে জরুরি অবস্থায় (যেমন—মা গুরুতর অসুস্থ) স্বামীর অনুমতি ছাড়াও যাওয়া যাবে।
২. মায়ের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ নিয়মিত করা এবং ফোনে খোঁজ নেওয়া।
৩. মায়ের জন্য অর্থ ব্যয় করা—যদি কন্যার নিজস্ব আয় থাকে এবং মা অভাবগ্রস্ত হন।
৪. মায়ের সাথে কখনো রূঢ় আচরণ না করা, এমনকি মা রাগান্বিত হলেও।
উপসংহার
বিবাহিত কন্যার উপর মায়ের হক হলো—সম্মান, সেবা, ভালোবাসা, দোয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা। তবে ইসলাম বিবাহিত নারীর উপর স্বামীর হককেও গুরুত্ব দিয়েছে। তাই উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলা উত্তম। মা ও স্বামী উভয়ের সন্তুষ্টি অর্জন করা একজন বিবাহিত নারীর জন্য সৌভাগ্যের বিষয়।
رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا "হে আমার রব, তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৪)