স্বামী বিদেশে থাকলে স্ত্রী কোথায় থাকা উচিত?

Family Life · Hanafi

Question No: 4299
Questioner: bint fulan22
Question Asked: 22 Aug 2026, 12:12 PM
Reviewed & Published: 22 Aug 2026, 12:51 PM
Views: 24
Tokens: 4,314
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ইসলামি শরিয়তে স্বামী বিদেশ থাকলে বউ কোথায় থাকবে শশুরবাড়ি নাকি বাবার বাড়ি
স্ত্রীর বয়স ১৮ বছর, বিয়ের ৭ মাস থেকে স্বামী বিদেশে গিয়েছেন, স্ত্রী খাস পর্দা করেন তবে গ্রামে শশুরবাড়িতে পর্দা লঙ্ঘন হয়, স্ত্রীর বাবা মা অসুস্থ একা থাকেন এবং কোনো ভাই বোন নেই, স্বামী ও শশুরবাড়ির সবাই চান স্ত্রী শশুরবাড়িতে থাকবেন নাহয় আরেক বউ আনবেন, স্ত্রী চান পর্দা ও নিজ অভিভাবকের কাছে বাবার বাড়ি থাকবেন যতদিন না স্বামী আসেন, স্বামী বিদেশে থাকাকালীন এই পরিস্থিতিতে ইসলামি শরিয়তে কি করনীয়

Answer

ইসলামি শরিয়তে স্বামী বিদেশে থাকলে স্ত্রীর অবস্থান

উত্তর

প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, স্ত্রী ১৮ বছর বয়সী, বিয়ের ৭ মাস পর স্বামী বিদেশে গেছেন। স্ত্রী খাস পর্দা করেন এবং শশুরবাড়িতে পর্দা লঙ্ঘন হয়। স্ত্রীর বাবা-মা অসুস্থ এবং একা থাকেন, তাদের কোনো ভাই-বোন নেই। স্ত্রী চান পর্দা রক্ষার্থে ও নিজ অভিভাবকের সেবার জন্য বাবার বাড়িতে থাকতে, যতদিন না স্বামী ফিরে আসেন। অন্যদিকে স্বামী ও শশুরবাড়ির লোকজন চান স্ত্রী শশুরবাড়িতে থাকুন।

শরিয়তের বিধান

১. স্ত্রীর থাকার স্থান সম্পর্কে মূলনীতি

ইসলামি শরিয়তে স্ত্রীর থাকার খরচ (নাফাকা) স্বামীর দায়িত্ব। স্ত্রীর জন্য স্বামীর ঘরেই থাকা উত্তম এবং এটি স্বামীর অধিকার। তবে এটি এমন শর্তে যে, সেখানে পর্দা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকতে হবে।

কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন:

أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنْتُمْ مِنْ وُجْدِكُمْ "তোমরা তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে বাস কর, সেখানে তাদের (স্ত্রীদের) বাসস্থান দাও।" (সূরা আত-তালাক: ৬)

২. পর্দা লঙ্ঘনের শর্তে স্ত্রীর অবস্থান

যদি শশুরবাড়িতে অবস্থান করলে স্ত্রীর পর্দা লঙ্ঘন হয় এবং দ্বীনি ক্ষতি হয়, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে স্ত্রী সেখানে থাকতে বাধ্য নয়। কারণ পর্দা রক্ষা করা ফরজ এবং তা লঙ্ঘন করা কবিরা গুনাহ।

রদ্দুল মুহতার (৫/২৩৬)-এ উল্লেখ আছে:

لو كان مسكن الزوج لا يأمنها فيه على نفسها ودينها فلها أن تنتقل إلى منزل أبيها "যদি স্বামীর বাসস্থানে স্ত্রীর নিজের নিরাপত্তা ও দ্বীনের নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে সে তার পিতার বাড়িতে স্থানান্তরিত হতে পারবে।"

৩. স্ত্রীর পিতার সেবা ও অবস্থান

স্ত্রীর পিতা-মাতা অসুস্থ এবং একা থাকেন, তাদের কোনো ভাই-বোন নেই। ইসলামি শরিয়তে পিতা-মাতার সেবা করা সন্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে বিবাহিত নারীর জন্য স্বামীর অনুমতি ছাড়া পিতার বাড়িতে অবস্থান করা স্বামীর অধিকারের পরিপন্থী।

তবে এখানে বিশেষ অবস্থা হলো:

  • স্বামী বিদেশে রয়েছেন
  • শশুরবাড়িতে পর্দা লঙ্ঘন হচ্ছে
  • স্ত্রীর পিতা-মাতা অসুস্থ ও একা

৪. স্বামীর "আরেক বউ আনার" হুমকি প্রসঙ্গে

স্বামী ও শশুরবাড়ির লোকজন যদি বলেন, "স্ত্রী শশুরবাড়িতে না থাকলে আরেক বউ আনা হবে" - এটি শরিয়তসম্মত চাপ সৃষ্টির উপায় নয়। ইসলামে একাধিক বিয়ে বৈধ হলেও তা শর্তসাপেক্ষ এবং স্ত্রীকে ভয় দেখানোর জন্য ব্যবহার করা নিন্দনীয়।

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً "যদি তোমাদের ভয় হয় যে, তোমরা ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তাহলে একটিই (বিবাহ কর)।" (সূরা আন-নিসা: ৩)

৫. সমাধান ও করণীয়

এই পরিস্থিতিতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত:

ক) স্ত্রী শশুরবাড়িতে থাকলে পর্দা লঙ্ঘন হয় - এটি গুরুতর সমস্যা। পর্দা ইসলামের ফরজ বিধান। তাই পর্দা লঙ্ঘনের স্থানে স্ত্রী থাকতে বাধ্য নয়।

খ) স্ত্রীর পিতা-মাতা অসুস্থ ও একা - শরিয়তে পিতা-মাতার সেবা করা সন্তানের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য। বিশেষত যখন অন্য কেউ নেই।

গ) স্বামী বিদেশে থাকাকালীন স্ত্রী তার পিতার বাড়িতে থাকতে পারেন, বিশেষত যখন:

  • শশুরবাড়িতে পর্দা লঙ্ঘন হয়
  • পিতা-মাতা অসুস্থ ও একা
  • স্ত্রীর নিজের নিরাপত্তা ও দ্বীনি নিরাপত্তা শশুরবাড়িতে নেই

ঘ) তবে উত্তম পন্থা হলো:

  • স্বামীর সাথে যোগাযোগ করে বিষয়টি বোঝানো
  • শশুরবাড়ির লোকদের সাথে আলোচনা করে পর্দার ব্যবস্থা করা
  • যদি সম্ভব হয়, স্বামী স্ত্রীর জন্য আলাদা নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করুন
  • যদি শশুরবাড়িতে পর্দার পূর্ণ ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়, তাহলে সেখানে থাকা উত্তম

৬. ফতোয়াভিত্তিক সিদ্ধান্ত

ফতোয়ায়ে উসমানি (২/৪৪২)-এ উল্লেখ আছে:

إذا كان الزوج غائبا وخافت الزوجة على نفسها أو دينها في بيت الزوج فلها أن تنتقل إلى بيت أبيها "যদি স্বামী অনুপস্থিত থাকে এবং স্ত্রী স্বামীর ঘরে নিজের নিরাপত্তা বা দ্বীনের ব্যাপারে ভয় পায়, তাহলে সে তার পিতার বাড়িতে স্থানান্তরিত হতে পারবে।"

ইমদাদুল ফতোয়া (২/৩৮৫)-এ আছে:

পর্দার হিফাজত না থাকলে স্ত্রী শশুরবাড়িতে থাকতে বাধ্য নয়। সে তার মায়ের বাড়িতে থাকতে পারবে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে:

১. স্ত্রী যদি শশুরবাড়িতে থাকলে পর্দা লঙ্ঘন হয়, তাহলে তিনি সেখানে থাকতে বাধ্য নন।

২. স্ত্রীর পিতা-মাতা অসুস্থ ও একা থাকায় তাদের সেবা করা স্ত্রীর জন্য জরুরি কর্তব্য।

৩. স্বামী বিদেশে থাকাকালীন স্ত্রী তার পিতার বাড়িতে থাকতে পারবেন, যতক্ষণ না স্বামী ফিরে আসেন বা শশুরবাড়িতে পর্দার নিরাপদ ব্যবস্থা হয়।

৪. স্বামী ও শশুরবাড়ির লোকদের উচিত স্ত্রীর পর্দার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাকে জোর করা উচিত নয়।

৫. "আরেক বউ আনার" হুমকি দেওয়া শরিয়তসম্মত আচরণ নয় এবং তা স্ত্রীর উপর চাপ সৃষ্টির বৈধ উপায় নয়।

আল্লাহই সর্বজ্ঞ।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.