অল্প সময়ের ব্যবধানে পুনরায় গর্ভধারণ, শারীরিক দুর্বলতা ও দাম্পত্য পরিস্থিতির কারণে গর্ভপাতের শরয়ি বিধান জানতে চাই
Family Life · Hanafi
Question
আমি একজন বিবাহিত নারী। আমার একটি ছোট সন্তান আছে, নাম সাফওয়ান। বর্তমানে তার বয়স প্রায় ২১ মাস। সে এখনো বুকের দুধ পান করে এবং আমাকে ছাড়া ঘুমাতেও পারে না।
আমার ওপর তার নির্ভরতা অনেক বেশি।
আমার প্রথম সন্তান সিজারের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করেছে। সেই সময় আমার স্বামীও প্রয়োজন অনুযায়ী আমার পাশে ছিলেন না। ফলে আগের গর্ভাবস্থা, সিজার এবং সন্তান জন্মের পরের সময়ের শারীরিক ও মানসিক কষ্টের অভিজ্ঞতা আমার জন্য এখনো অনেক কঠিন।
বর্তমানে আমি আবার গর্ভবতী হয়েছি। আমার শেষ মাসিকের প্রথম দিন আনুমানিক ১ জুলাই ২০২৬। আগস্ট মাসে মাসিক না হওয়ায় প্রেগন্যান্সি টেস্ট করি এবং ফল পজিটিভ আসে। হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে গর্ভধারণের বয়স আনুমানিক ৭ সপ্তাহের মতো।
এই গর্ভধারণের জন্য আমি মানসিকভাবে ও বাস্তব পরিস্থিতির দিক থেকে একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। আমার বর্তমান পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরছি—
১. প্রথম সন্তান এখনো খুব ছোট
আমার ছেলে সাফওয়ানের বয়স প্রায় ২১ মাস।
সে এখনো বুকের দুধ পান করে।
আমাকে ছাড়া ঘুমাতে পারে না।
দিনের অধিকাংশ সময় আমার ওপর নির্ভরশীল।
২. আমার শারীরিক অবস্থা
আমি নিজেও বর্তমানে অনেক শারীরিক দুর্বলতা অনুভব করি। পর্যাপ্ত ঘুম হয় না এবং অনেক সময় ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করাও সম্ভব হয় না। প্রায়ই আমার রক্তচাপ কম থাকে এবং মাথা ঘোরা ও দুর্বল লাগার মতো সমস্যা হয়।
এর আগে একটি সিজার হয়েছে। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে আবার গর্ভধারণ করায় নিজের শারীরিক সক্ষমতা নিয়েও আমি খুব চিন্তিত।
৩. পারিবারিক সহযোগিতার অভাব
আমার শাশুড়ি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে তিনি আর কোনো সন্তান পালনে আমাকে সাহায্য করতে পারবেন না। আমার নিজের মাও সম্ভবত এই সময়ে আমার পাশে থাকতে পারবেন না।
আগের সিজারের সময়ও আমার স্বামীকে পাশে পাইনি। তাই আবার গর্ভাবস্থা, প্রসব/সিজার এবং পরবর্তী সময়ে দুইটি ছোট সন্তান সামলানোর বিষয়টি নিয়ে আমি খুব ভয় পাচ্ছি।
৪. স্বামীর নেশা ও দায়িত্বহীনতা
আমার স্বামী নেশা করেন। তিনি আগে বিদেশে থাকতেন এবং তখনও নেশা করতেন, কিন্তু দেশে আসার পর নেশার পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে।
তিনি বর্তমানে বেকার। বিদেশে যাওয়ার জন্য কাগজপত্র জমা দেওয়া আছে, কিন্তু কবে যেতে পারবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সংসার, সন্তান এবং আমার প্রতি তাঁর তেমন দায়িত্বশীলতা বা গুরুত্ব নেই। তিনি সন্তানকে ভালোবাসেন, কিন্তু আমার অসুস্থতা বা শারীরিক কষ্টের বিষয়ে প্রায় কোনো খোঁজ নেন না বা মাথা ঘামান না।
আমার প্রথম সন্তানের বেশিরভাগ খরচও আমি নিজে বাচ্চাদের আরবি পড়িয়ে উপার্জন করে চালাই।
৫. দাম্পত্য সম্পর্কের অবস্থা
আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বর্তমানে ভালোবাসা ও মানসিক সম্পর্ক প্রায় নেই বললেই চলে।
তিনি একবার আমার গায়ে হাতও তুলেছেন।
এছাড়া তিনি অন্য মেয়েদের প্রতি আসক্ত। নিয়মিত পর্ন ভিডিও দেখেন। এমনকি আমার পাশে বসে থেকেও লুকিয়ে অন্য মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতেন।
এসব বিষয় নিয়ে আমি কথা বললে বা প্রতিবাদ করলে তিনি অনেক সময় বলেন, “চলে যাও”, “তুমি থাকো বা না থাকো তাতে আমার কিছু যায় আসে না।”
এই কারণে আমি অনেকবার স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার কথাও ভেবেছি। কিন্তু আমার ছোট সন্তানের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি।
৬. আমার ভয় ও বর্তমান মানসিক অবস্থা
এই সমস্ত পরিস্থিতির কারণে আমি আবার একটি সন্তান নেওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত নই। আমার ভয় হচ্ছে—
সাফওয়ানকে কীভাবে সামলাব?
নিজের শারীরিক দুর্বলতার মধ্যে কীভাবে নতুন গর্ভাবস্থা ও প্রসব সামলাব?
স্বামী যদি পাশে না থাকেন, তাহলে দুইটি ছোট সন্তানকে কীভাবে দেখাশোনা করব?
আমার শাশুড়ি সাহায্য করবেন না এবং আমার মাও হয়তো পাশে থাকতে পারবেন না।
স্বামী বর্তমানে বেকার এবং সংসারের দায়িত্বও ঠিকভাবে পালন করছেন না।
ভবিষ্যতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আরও খারাপ হলে দুইটি সন্তান নিয়ে আমার অবস্থা কী হবে—এ নিয়েও আমি খুব চিন্তিত।
আমি আল্লাহকে ভয় করি এবং কোনো হারাম কাজ করতে চাই না। কিন্তু একই সঙ্গে আমি নিজেকে অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় মনে করছি।
আমি অনুগ্রহ করে আমার পরিস্থিতিকে শুধু “আরেকটি সন্তান পালতে কষ্ট হবে” হিসেবে না দেখে, আমার শারীরিক দুর্বলতা, আগের সিজার, প্রথম সন্তানের বয়স ও নির্ভরশীলতা, পারিবারিক সহযোগিতার অভাব, স্বামীর নেশা ও দায়িত্বহীনতা, দাম্পত্য জীবনের অস্থিরতা এবং আমার নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করে শরিয়তের আলোকে উত্তর দেওয়ার অনুরোধ করছি।
আমি কোনো হারাম কাজ করতে চাই না এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির ভয় করি। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন যোগ্য মুফতির কাছ থেকে আমার নির্দিষ্ট পরিস্থিতির জন্য পরিষ্কার শরয়ি নির্দেশনা নিতে চাই।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নকারিণীর পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল। আপনার দুঃখ-কষ্ট ও অসহায়ত্ব আমরা অনুভব করতে পারছি। আল্লাহ তাআলা আপনার ধৈর্যের উত্তম প্রতিদান দিন এবং আপনার অবস্থা সহজ করুন। আমিন।
ইসলামী শরিয়তে গর্ভপাতের বিধান সম্পর্কে ফুকাহায়ে কেরামের মতামত নিম্নরূপ:
ক. গর্ভধারণের ৪০ দিনের মধ্যে (১২০ দিনের পূর্বে): হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, গর্ভধারণের ৪০ দিনের মধ্যে (কেউ কেউ ১২০ দিন বলেছেন) বৈধ কারণে গর্ভপাত করা জায়েয রয়েছে। তবে কোনো কারণ ছাড়া গর্ভপাত করা হারাম।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ১২০ দিনের পূর্বে গর্ভপাত করানো জায়েয, যদি বৈধ কারণ থাকে। (রদ্দুল মুহতার, ৬তম খণ্ড, ৪১৬ পৃষ্ঠা)
খ. ১২০ দিনের পর: গর্ভধারণের ১২০ দিন পর গর্ভপাত করা সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েয। কেননা ১২০ দিনে রূহ ফুঁকানো হয়। হাদিসে এসেছে— রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি মায়ের পেটে ৪০ দিন নুতফা হিসেবে, তারপর ৪০ দিন আলাকা হিসেবে, তারপর ৪০ দিন মুদগা হিসেবে একত্রিত হয়। এরপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা পাঠান এবং তাকে চারটি বিষয়ের আদেশ দেন...।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২০৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৪৩)
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
আপনার বর্তমান গর্ভধারণের বয়স ৭ সপ্তাহ (৪৯ দিন)। আপনি ১২০ দিনের মধ্যে আছেন। তাই:
১. যদি বিশ্বস্ত মুসলিম ডাক্তার বলেন যে, আপনার শারীরিক অবস্থার কারণে গর্ভধারণ চালিয়ে যাওয়া আপনার জীবন বা গর্ভের সন্তানের জীবন মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ, তাহলে গর্ভপাত করা জায়েয হবে।
২. যদি ডাক্তার বলেন যে, আপনার জীবন ও গর্ভের সন্তানের জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে নেই, তাহলে গর্ভপাত করা হারাম। এ থেকে বিরত থাকুন। সন্তান আল্লাহর রিজিকসহ আসে।
৩. কোনো অবস্থাতেই আপনার বা গর্ভের সন্তানের জবনের মারাত্মক ঝুকি ব্যাতিত শুধুমাত্র আর্থিক সমস্যা, পারিবারিক চাপ বা সন্তান না চাওয়ার কারণে গর্ভপাত করা জায়েয নয়।
পরামর্শঃ ১. স্বামীর সাথে আলোচনা: আপনার স্বামীর সাথে বিষয়টি নিয়ে শান্তভাবে আলোচনা করুন। তাকে জানান আপনার শারীরিক অবস্থা ও মানসিক চাপের কথা। যদি তিনি সহযোগিতা না করেন, তাহলে পরিবারের বড়দের (যেমন—আপনার বাবা বা ভাই) মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করুন।
২. পারিবারিক সহযোগিতা: আপনার মা বা শাশুড়ি যদি সাহায্য না করতে পারেন, তাহলে অন্য কোনো আত্মীয় বা প্রতিবেশীর সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে একজন গৃহকর্মী রাখার ব্যবস্থা করুন।
৩. দাম্পত্য সমস্যা: আপনার স্বামীর নেশা, পর্নোগ্রাফি দেখা, অন্য মেয়েদের সাথে কথা বলা—এগুলো মারাত্মক গুনাহের কাজ। আপনি তাকে নসীহত করুন। যদি তিনি না মানেন, তাহলে পরিবারের বড়দের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন। প্রয়োজনে একজন আলেম বা কাউন্সেলরের সাহায্য নিন।
৪. তালাকের বিষয়ে: আপনি যদি তালাক নেওয়ার কথা ভাবেন, তাহলে প্রথমে একজন আলেম বা মুফতির সাথে পরামর্শ করুন। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিন। তবে মনে রাখবেন, তালাক আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল কাজ। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১৭৮)
৫. আল্লাহর উপর ভরসা: আপনার উচিত আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখা। আল্লাহ তাআলা বলেন: "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।" (সূরা তালাক: ২-৩)
আল্লাহ তাআলা আপনার অবস্থা সহজ করুন, আপনাকে ধৈর্য ও সাহস দিন এবং আপনার সন্তানদেরকে আপনার জন্য শান্তির কারণ করুন। আমিন।